প্রযুক্তি বিশ্ব

রেকর্ড ৬৩০ কোটি ডলার চুরির শুরু একটি চাকরির বিজ্ঞাপন আর ভুয়া ইন্টারভিউয়ের অ্যাসাইনমেন্টে

বাইন্যান্স বলছে, ব্যক্তিগত ছবিসহ সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট দেখিয়ে আস্থা তৈরি করা হয়, এরপর ওই প্রকৌশলীর কম্পিউটার ও একটি এআই টুল দিয়ে আরও দুটি ল্যাপটপে পৌঁছায় তারা।

রেকর্ড ৬৩০ কোটি ডলার চুরির শুরু একটি চাকরির বিজ্ঞাপন আর ভুয়া ইন্টারভিউয়ের অ্যাসাইনমেন্টে

বাইন্যান্স থেকে রেকর্ড ৬৩০ কোটি ডলার (৪৭০ কোটি পাউন্ড) চুরি করা হ্যাকাররা ভেতরে ঢুকেছিল ভুয়া চাকরির ইন্টারভিউ আর একটি অভ্যন্তরীণ এআই টুল দখলের মধ্য দিয়ে—এক্সচেঞ্জটির প্রকাশিত প্রাথমিক অনুসন্ধান এ কথা বলছে।

বাইন্যান্স একে বলেছে ‘সুপরিকল্পিত, বহুস্তরের অভিযান’, যেখানে ক্ষতিকর সফটওয়্যার নামিয়ে প্রকৌশলীদের কম্পিউটার দখল করা হয় এবং ওয়ালেট খালি করার সক্ষমতা আছে এমন টুলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি একে ‘গুরুতর ও অত্যন্ত জটিল নিরাপত্তা ঘটনা’ বলে দুঃখ প্রকাশ করেছে: ‘এটি ঘটা উচিত হয়নি।’

প্রথম প্রকৌশলীর কাছে যেভাবে পৌঁছানো হলো

এই অংশটি মন দিয়ে পড়ার মতো, কারণ এখানে কারও বোকামির দরকার হয়নি।

বাইন্যান্সের এক প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় একটি সত্যিকারের চাকরির প্ল্যাটফর্মে—নকল সাইট নয়, মানুষ যেখানে সত্যিই চাকরি খোঁজে। এরপর কোম্পানির প্রতিনিধি সেজে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে ইন্টারভিউয়ে ডাকা হয়।

বাইন্যান্স জানিয়েছে, আস্থা তৈরি করতে আক্রমণকারীরা ‘আরও উন্নত ও প্রতারণামূলক’ পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, যেমন ব্যক্তিগত ছবিসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট দেখানো। অর্থাৎ তারা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ছদ্মবেশ নেয়নি; অতীতসহ আস্ত মানুষ বানিয়েছে।

দ্বিতীয় ইন্টারভিউয়ে ওই প্রকৌশলীকে অ্যাসাইনমেন্ট বলে একটি ফাইল নামাতে বলা হয়। সেটি ছিল ম্যালওয়্যার, যাতে শনাক্তকরণ এড়ানোর কৌশল যুক্ত ছিল।

একটি চাকরির বিজ্ঞাপন, তারপর ৬৩০ কোটি ডলার
বাইন্যান্স বলছে, রেকর্ড এই চুরির শুরু হয়েছিল সত্যিকারের একটি চাকরির প্ল্যাটফর্মে এক প্রকৌশলীর সাড়া দেওয়া দিয়ে। গ্রাফিক: টেক বিডি।

এক ল্যাপটপ থেকে তিন

ওই যন্ত্রটি দখলে আসার পর আক্রমণকারীরা পাশে ছড়ায়। বাইন্যান্স বলছে, অক্টোবরে তারা ওই প্রকৌশলীর কম্পিউটার ও দখল করা একটি অভ্যন্তরীণ এআই টুল কাজে লাগিয়ে আরও দুজন প্রকৌশলীর ল্যাপটপের নিয়ন্ত্রণ নেয়।

অভ্যন্তরীণ এআই টুলটিই এই ঘটনাকে প্রচলিত হ্যাকিং থেকে আলাদা করে। এ ধরনের টুলের নকশাগতভাবেই প্রতিষ্ঠানজুড়ে বিস্তৃত প্রবেশাধিকার থাকে, আর কর্মীরা অভ্যাসবশত এর আউটপুটকে বিশ্বাস করেন।

চাকরির বিজ্ঞাপন কেন এত ভালো টোপ

নিয়োগের প্রস্তাব সেই প্রবৃত্তিগুলোকেই অকেজো করে দেয়, যেগুলো অন্য সব ক্ষেত্রে মানুষকে বাঁচায়। এটি না চাইতেই আসবে—এটাই স্বাভাবিক। অচেনা কারও কাছ থেকে আসবে—এটাই স্বাভাবিক। ফাইল থাকবে—কোনো কাজ, কারিগরি পরীক্ষা বা বাড়িতে করার অ্যাসাইনমেন্ট—আর সেটি চালানোই তো উদ্দেশ্য।

সবচেয়ে বড় কথা, চাকরিপ্রার্থীর সহযোগিতাপূর্ণ ও দ্রুত হওয়ার জোরালো কারণ থাকে। সাধারণ সব বিপদসংকেত নিয়োগের প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিক আচরণ।

এ কারণেই ঘটনাটি ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জের বাইরেও প্রাসঙ্গিক। সফটওয়্যারে কাজ করা যে কাউকে চাকরির প্রস্তাব এলে নিরাপদ নিয়মটি সহজ: ইন্টারভিউয়ের অ্যাসাইনমেন্ট কখনো এমন যন্ত্রে চালাবেন না, যেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছুতে পৌঁছানো যায়। আলাদা একটি ভার্চ্যুয়াল মেশিনে খরচ নেই।

এরপর যা হলো

ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে উত্তোলন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় বাইন্যান্স, রোববার সেবা ফেরে, এরপর গ্রাহকেরা কোটি কোটি ডলারের সম্পদ তুলে নেন। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, ক্ষতি পোষাতে প্রয়োজনীয় অর্থের শতভাগের বেশি আলাদা করে রাখা হয়েছে, আর শনিবার পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত টোকেন সম্পদের ৯৮ শতাংশ পূরণ করা হয়েছে।

সম্পদ শনাক্ত ও জব্দ করতে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কাজ করছে এবং জানিয়েছে, হুমকি শনাক্তে এআই টুলে বিনিয়োগ বাড়ানো হবে, তৃতীয় পক্ষের বিশেষজ্ঞ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা হবে, একটি নিরাপত্তা গবেষণা তহবিল গড়া হবে।

দায় নিয়ে বিরোধ

এফবিআই ও সিক্রেট সার্ভিস অর্থ শনাক্তে সহায়তা করছে এবং বলেছে, হামলায় উত্তর কোরিয়ার পরিকল্পনার ছাপ আছে। বাইন্যান্স এক্স–এ লিখেছে, ‘এফবিআইয়ের সর্বশেষ তথ্য বলছে, এই ঘটনার জন্য দায়ী গণতান্ত্রিক গণপ্রজাতন্ত্রী কোরিয়া।’

মঙ্গলবার পিয়ংইয়ং তা অস্বীকার করে। নেতা কিম জং উনের বোন, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কিম ইয়ো জং বলেন, অভিযোগটি দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি ‘অসৎ চেষ্টা’। বড় সাইবার হামলার দায় উত্তর কোরিয়া বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।

২০২৫ সালে এক্সচেঞ্জ বাইবিট থেকে তৎকালীন রেকর্ড ১৫০ কোটি ডলার চুরির জন্য দায়ী করা হয়েছিল ট্রেডারট্রেইটর ইউনিটকে, যারা লাজারাস গ্রুপ নামেও পরিচিত।

সূত্র: বিবিসি

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি ঢাকাভিত্তিক একটি স্বাধীন প্রযুক্তি প্রকাশনা, প্রকাশিত হয় বাংলা ও ইংরেজিতে। লেখাগুলো আলাদা লেখকের নামে নয়, প্রকাশনার নামেই প্রকাশিত হয়; সংশোধন বা সূত্র নিয়ে প্রশ্ন পাঠানো যায় info@tech-bd.com ঠিকানায়।