বিশ্ব স্বাস্থ্য

রক্তের নমুনা রাখা ছিল মাইনাস ৩০ ডিগ্রিতে, হামলাকারীরা নিয়ন্ত্রণ ঠেলে দিল ১১০ ডিগ্রির দিকে

ইউরোপের হিমায়ন হামলা কেবল সুপারমার্কেটের তাকেই থামেনি, পৌঁছেছিল চিকিৎসাসংক্রান্ত সংরক্ষণব্যবস্থাতেও। ফ্রান্সের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, তাপমাত্রার পরিবর্তন সময়মতো চোখে পড়ায় রক্ত সঞ্চালনের সরবরাহে কোনো প্রভাব পড়েনি।

রক্তের নমুনা রাখা ছিল মাইনাস ৩০ ডিগ্রিতে, হামলাকারীরা নিয়ন্ত্রণ ঠেলে দিল ১১০ ডিগ্রির দিকে

ইউরোপজুড়ে সুপারমার্কেটের হিমায়ন ব্যবস্থার তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া হামলা কেবল খাবারেই থেমে থাকেনি। ফ্রান্সের জাতীয় রক্ত সেবা সংস্থা এতাবলিসমঁ ফ্রঁসে দ্যু সঁ (ইএফএস)-এর ব্যবহৃত সংরক্ষণব্যবস্থাও এর নাগালে এসেছিল—আর নিয়ন্ত্রক ইউনিটগুলোকে মাইনাস ৩০ ডিগ্রি থেকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল ১১০ ডিগ্রির দিকে।

তবে সেটি ধরা পড়েছে। ফ্রান্সের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাপমাত্রার পরিবর্তন কাজ করে ফেলার আগেই চোখে পড়ায় রক্ত সঞ্চালনের সরবরাহে কোনো প্রভাব পড়েনি।

কোন প্রতিষ্ঠান, আর সেখানে কী ছিল

ফরাসি সাপ্তাহিক ল্য কানার ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে নাম করেছে কুলওয়ার্ল্ড-এর, যারা রক্ত সঞ্চালনসংক্রান্ত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ইএফএসের কনটেইনার সংরক্ষণ করে। এখানে যে সংরক্ষণব্যবস্থার কথা হচ্ছে, সেখানে থাকে পর্যবেক্ষণের জন্য রাখা নমুনা—জরুরি অবস্থায় হাসপাতাল যে মজুত থেকে নেয়, সেটি নয়। পার্থক্যটি মনে রাখা দরকার, কারণ ক্ষতি যে এখানেই থেমেছে তার একটি কারণ এটিই।

মাইনাস ৩০ থেকে ১১০ ডিগ্রির দিকে
ফ্রান্সের রক্তের নমুনা রাখা ইউনিটগুলো যে তাপমাত্রায় ছিল, আর হামলাকারীরা যেদিকে সেগুলোকে ঠেলতে চেয়েছিল। গ্রাফিক: টেক বিডি।

মাইনাস ৩০ কেউ খেয়ালখুশিতে বেছে নেয়নি

রক্ত সেবা মানে এক তাপমাত্রার একটিমাত্র শীতলকক্ষ নয়। আলাদা উপাদান থাকে আলাদা তাপমাত্রায়, আর সীমারেখা সংকীর্ণ। প্লাজমা রাখা হয় হিমায়িত অবস্থায়, শূন্যের অনেক নিচে, আর সেভাবে তা মাসের পর মাস টেকে। লোহিত কণিকা রাখা হয় ঠান্ডায়, কিন্তু কখনোই জমিয়ে নয়—মাত্র কয়েক ডিগ্রির মধ্যে। অণুচক্রিকা সবচেয়ে ঝামেলার: সেগুলো রাখতে হয় ঘরের তাপমাত্রার কাছাকাছি, হালকা নাড়াচাড়ার মধ্যে, আর কয়েক দিনেই মেয়াদ ফুরায়।

প্রতিটি নিয়মের পেছনেই কারণ আছে, আর প্রতিটি নিয়ম মানে এমন একটি যন্ত্র, যাকে বলে দেওয়া হয়েছে কত তাপমাত্রা ধরে রাখতে হবে। নির্দেশটি বদলে দিলে কেউ দরজা খোলার অনেক আগেই উপাদান নষ্ট হয়ে যায়।

নিয়ন্ত্রক কেন এত কার্যকর লক্ষ্যবস্তু

হিমায়ন নিয়ন্ত্রকে হামলা করতে গেলে ভবনে ঢুকতে হয় না, তালা ভাঙতে হয় না, এমনকি ক্যাবিনেটে কী আছে তা জানারও দরকার হয় না। যন্ত্রটিই নিঃশব্দে, রাতের মধ্যে ক্ষতিটা করে ফেলে। আরও খারাপ ব্যাপার হলো, সে জানান দেয় যে সব ঠিক আছে—কারণ তার নিজের হিসাবে ঠিকই আছে। তাকে একটি তাপমাত্রা ধরে রাখতে বলা হয়েছিল, সে সেটিই ধরে রেখেছে।

ফ্রান্সের ক্ষেত্রে একে থামিয়েছে কোনো নিরাপত্তা পণ্য নয়। কেউ একজন তাকিয়েছিলেন, এমন একটি সংখ্যা দেখেছিলেন যা হতে পারে না, আর সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছিলেন।

অল্পের জন্য বেঁচে যাওয়াও একটি তথ্য

কিছু খোয়া যায়নি, আর এর ওপর অন্য কিছু দাঁড় করানোর আগে কথাটি স্পষ্ট করে বলা দরকার। এড়ানো গেছে এমন ঘটনা বিপর্যয় নয়, একে বিপর্যয় হিসেবে লেখাও উচিত নয়।

তবু অল্পের জন্য বেঁচে যাওয়ার কাজের দিকটি হলো, এটি দেখিয়ে দেয় হামলা আর ক্ষতির মধ্যে দূরত্ব কতটুকু। এখানে সেই দূরত্ব ছিল একটিমাত্র পর্যবেক্ষণ। কোনো ব্যাকআপ ব্যবস্থা নয়, আলাদা করা নেটওয়ার্ক নয়, এয়ার গ্যাপও নয়—সময়মতো চোখে পড়া একটি অসম্ভব পাঠ। একটি জাতীয় রক্ত সেবার জন্য ব্যবধানটি পাতলা, আর যেখানে রাত তিনটায় কেউ ড্যাশবোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকেন না, সেখানে আরও পাতলা।

ফ্রান্সের বাইরে

চিকিৎসার শীতল শৃঙ্খল কেবল ফ্রান্সের ব্যাপার নয়। টিকা, রি-এজেন্ট, প্লাজমা, টিস্যু আর নমুনা প্রতিটি স্বাস্থ্যব্যবস্থাতেই থাকে তাপনিয়ন্ত্রিত সংরক্ষণে, আর সেগুলোর ওপর নজরদারি ক্রমেই দূর থেকে হচ্ছে—অর্থাৎ ক্রমেই নাগালের মধ্যে আসছে। ইউরোপের সুপারমার্কেট হামলায় জড়িত যন্ত্র ছিল সাধারণ বাণিজ্যিক হিমায়ন নিয়ন্ত্রক, হাজারে হাজারে বিক্রি ও বসানো—আর একই শ্রেণির পণ্য ঠান্ডা রাখে গবেষণাগার ও হাসপাতালের সংরক্ষণব্যবস্থাও।

সুপারমার্কেট হারিয়েছে খাবার। রক্ত সেবা হারায়নি কিছুই। দুটি ফলই এসেছে একই দুর্বলতা থেকে, আর এর মধ্যে কেবল একটি ঠিক করেছে হামলাকারী।

সূত্র: দ্য ন্যাশনাল

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি ঢাকাভিত্তিক একটি স্বাধীন প্রযুক্তি প্রকাশনা, প্রকাশিত হয় বাংলা ও ইংরেজিতে। লেখাগুলো আলাদা লেখকের নামে নয়, প্রকাশনার নামেই প্রকাশিত হয়; সংশোধন বা সূত্র নিয়ে প্রশ্ন পাঠানো যায় info@tech-bd.com ঠিকানায়।