বিশ্ব

শাওমির ফোন ব্যবহারকারীদের তথ্য সিঙ্গাপুরে পাঠানোর অভিযোগ

চীনা স্মার্টফোন কেনা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছে ইউরোপের দেশ লিথুয়ানিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। কারও কাছে থাকলে সেটিও ছুড়ে ফেলতে বলা হয়েছে। দেশটির এক সরকারি প্রতিবেদনে ডিভাইসগুলোতে আগে থেকেই (বিল্ট-ইন) নজরদারির উপাদান থাকে বলে জানানোর পর এমন সুপারিশ করা হলো।

শাওমির ফোন ব্যবহারকারীদের তথ্য সিঙ্গাপুরে পাঠানোর অভিযোগ

হালনাগাদ, অক্টোবর ২০২৬ — ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি অপরিবর্তিত। শাওমি অভিযোগ অস্বীকার করেছিল, আর বিতর্কটি মীমাংসিত হয়নি—তবে এর কারিগরি দিকটিই আজ বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেটি শাওমির একার বিষয় নয়। এরপর যা হলো, তা মূল প্রতিবেদনের নিচে।

লিথুয়ানিয়ার রাষ্ট্র পরিচালিত সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা গত মঙ্গলবার জানিয়েছে, চীনা স্মার্টফোন তৈরির প্রতিষ্ঠান শাওমি করপোরেশনের ইউরোপে বাজারজাত করা প্রথম সারির স্মার্টফোনগুলোতে নির্দিষ্ট কিছু শব্দ বা শব্দগুচ্ছ চিহ্নিত করে সেগুলো পরিমার্জনের ক্ষমতা রয়েছে। শব্দগুচ্ছগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ফ্রি তিব্বত’, ‘লং লিভ তাইওয়ান ইনডিপেনডেন্স’ ও ‘ডেমোক্রেসি মুভমেন্ট’।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য শাওমির মি ১০টি ফাইভজি মডেলের স্মার্টফোনের সফটওয়্যারে সেন্সরশিপের অপশন বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে চাইলেই দূর থেকে সেটি সচল করা যায় বলে লিথুয়ানিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শাওমির ফোনগুলো ব্যবহারকারীর তথ্য এনক্রিপ্ট করে সিঙ্গাপুরের একটি ডেটা সার্ভারে পাঠায়। হুয়াওয়ের পি৪০ ফাইভজি মডেলের স্মার্টফোনেও নিরাপত্তাত্রুটি মিলেছে। তবে আরেক চীনা প্রতিষ্ঠান ওয়ানপ্লাসের স্মার্টফোনে কোনো ত্রুটি পায়নি সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাটি।

প্রতিবেদনটি তুলে ধরার সময় লিথুয়ানিয়ার প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী মারগিরিস আবুকেভিসিয়াস সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের পরামর্শ হলো নতুন চীনা স্মার্টফোন না কেনা। আর যেগুলো আগেই কেনা হয়েছে, সেগুলো থেকে যত দ্রুত সম্ভব নিস্তার পাওয়া।’

লিথুয়ানিয়ায় তাইওয়ানের দূতাবাসের নাম ‘তাইওয়ানিজ রিপ্রেজেন্টেটিভ অফিস’ রাখার ঘোষণা দিলে চটে যায় চীন। গত মাসে চীন জানায়, লিথুয়ানিয়া থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতকে ফিরিয়ে আনা হবে। একই সঙ্গে বেইজিং থেকে লিথুয়ানিয়ার রাষ্ট্রদূতকে ফিরিয়ে নিতে বলা হয়।

তাইওয়ানকে নিজেদের অঞ্চল হিসেবে দাবি করে চীন। ঝামেলা এড়ানোর জন্য ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে তাইওয়ানের দূতাবাসের উল্লেখ করতে চাইলে ‘তাইওয়ান’ না বলে ‘তাইপেই’ উল্লেখ করা হয়।

ইন্টারনেট ব্রাউজারসহ শাওমির সিস্টেম অ্যাপগুলো বর্তমানে ৪৪৯টি চীনা শব্দ সেন্সর করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, ‘এটা কেবল লিথুয়ানিয়ার জন্য নয়, বরং শাওমির যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে এমন সব দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’

শাওমির অস্বীকার

লিথুয়ানিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন ঠিক নয় বলে দাবি করেছে শাওমি। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর গতকাল বুধবার প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়, তাদের স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর আদান–প্রদান করা তথ্য সেন্সর করে না।

রয়টার্সকে পাঠানো এক বিবৃতিতে শাওমির মুখপাত্র বলেছেন, শাওমি কখনো ওয়েব ব্রাউজিং, কল কিংবা অন্য কোনো যোগাযোগের সফটওয়্যার ব্যবহারের মতো গ্রাহকদের ব্যক্তিগত কোনো কাজে প্রতিবন্ধকতা তৈরি বা তা করতে না দেওয়ার মতো কিছু করেনি। ভবিষ্যতেও এ রকম কিছু করবে না।

সব ব্যবহারকারীর আইনি অধিকারের প্রতি শাওমির পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে এবং তার সুরক্ষা দেওয়া হয়।

এরপর যা হলো

শাওমি লিথুয়ানিয়ার প্রতিবেদনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে এবং জানায়, তাদের যন্ত্র ব্যবহারকারীর যোগাযোগ সেন্সর করে না; প্রতিষ্ঠানটি একটি স্বাধীন মূল্যায়নেরও কথা বলে। লিথুয়ানিয়া অবস্থান বদলায়নি। বিতর্কটি কোনো আন্তর্জাতিক নিষ্পত্তিতে পৌঁছায়নি, আর দুই পক্ষের বিবরণ আজও আলাদা।

এর বাইরে যা ঘটেছে তা কূটনীতির: তাইওয়ানের প্রতিনিধি কার্যালয় নিয়ে চীন-লিথুয়ানিয়া সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়, আর ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে চীনা হ্যান্ডসেট ও নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম নিয়ে নজরদারি বেড়েই চলে।

যে কারিগরি কথাটি থেকে যায়

প্রতিবেদনের সবচেয়ে কাজের বাক্যটি অভিযোগ নয়, বর্ণনা: সেন্সরশিপের তালিকাটি ইউরোপের যন্ত্রে বন্ধ ছিল, কিন্তু দূর থেকে চালু করা যেত।

অর্থাৎ যন্ত্রটি কী করে, তা কেনার দিনে স্থির হয়ে যায়নি। সেটি নির্ভর করে নির্মাতার সার্ভার আগামী সপ্তাহে কী বলে তার ওপর। এটি চীনা ফোনের বৈশিষ্ট্য নয়—আজকের প্রায় প্রতিটি ফোন, টিভি, গাড়ি ও স্মার্ট যন্ত্রই এভাবে চলে: সুবিধা যোগ হয়, সরে যায়, বদলে যায় হালনাগাদের মধ্য দিয়ে, আর ক্রেতার সম্মতি নেওয়া হয় একবার, কেনার সময়।

একই নির্ভরতার উল্টো পিঠ দেখা গেছে ব্ল্যাকবেরি ফোন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায়—সেখানে সার্ভার বন্ধ হওয়ায় যন্ত্রটিই অকেজো হয়েছিল।

“তথ্য সিঙ্গাপুরে যায়” অংশটি নিয়ে সতর্ক থাকা দরকার। বহু নির্মাতাই আঞ্চলিক সার্ভারে তথ্য পাঠায়, আর দক্ষিণ এশিয়ার জন্য সিঙ্গাপুর সাধারণ গন্তব্য। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি কোথায় যাচ্ছে তা নয়, বরং কী যাচ্ছে, কত ঘন ঘন, আর বন্ধ করা যায় কি না।

বাংলাদেশে যা করা যায়

এ দেশে শাওমি সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ব্র্যান্ডগুলোর একটি, আর বেশির ভাগ ক্রেতার পক্ষে ফোন কী পাঠাচ্ছে তা যাচাই করা সম্ভব নয়। যা করা যায় তা হলো যতটুকু নিয়ন্ত্রণ দেওয়া আছে, তা ব্যবহার করা: সেটিংসে ব্যবহারের তথ্য ও বিজ্ঞাপনসংক্রান্ত শেয়ারিং বন্ধ করা, নির্মাতার নিজস্ব ব্রাউজার ও সহকারীর বদলে পরিচিত বিকল্প ব্যবহার করা, আর নিয়মিত নিরাপত্তা হালনাগাদ পায় এমন মডেল বেছে নেওয়া।

ফোনের গোপনীয়তা সেটিং নিয়ে বিস্তারিত আছে যে সেটিংগুলো বন্ধ করা উচিত লেখাটিতে।

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি সম্পাদকীয় দল।