২০২৬ সালের ২৩ আগস্ট ঢাকায় একটি এআই সম্মেলনে করপোরেট নেতা, নীতিনির্ধারক ও প্রযুক্তিবিদেরা বসেছিলেন এ প্রশ্ন নিয়ে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্প ও কর্মসংস্থানকে কীভাবে বদলে দেবে। ঠিক সেই রাতে, মধ্যরাতের দিকে, গাজীপুরের একটি কারখানা থেকে বাড়ি ফিরছিলেন এক সেলাই শ্রমিক—প্রথম আলোর বিবরণে যাঁর নাম রহিমা, ছদ্মনাম। তিনি জানতেন না, আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল তাঁরই কর্মস্থল।
এ খাতে এআই আসছে আসলে কোথায়
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারকেরা এআই ভাবছেন উৎপাদন পরিকল্পনা, স্বয়ংক্রিয় মান পরীক্ষা, যন্ত্র বিকল হওয়ার আগাম সতর্কতা আর চাহিদার পূর্বাভাসের জন্য। এর কোনোটিই কল্পনা নয়; চারটিই এমন পণ্য, যা একটি কারখানা আজই কিনতে পারে।
সরকার জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা ২০২৬–২০৩০-এর খসড়া জনমতের জন্য প্রকাশ করেছে; চূড়ান্ত অনুমোদন এখনো বাকি।

কোন কাজগুলো ঝুঁকিতে, আর কেন
পুনরাবৃত্তিমূলক ও একঘেয়ে কাজই সবচেয়ে ঝুঁকিতে—সহজ কারণেই, যন্ত্র সেগুলো সস্তায় ও ভালোভাবে করে। এসব কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে গেলে আর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতানির্ভর কাজে উন্নীত না করা হলে শ্রমিকেরা পিছিয়ে পড়েন—আর প্রশিক্ষণ পৌঁছাতে হবে কারখানার ব্যবস্থাপনা ও মেঝে, দুই জায়গাতেই। যে কারখানা মান পরীক্ষার ব্যবস্থা কিনে কাউকে তা চালাতে শেখায় না, সে আসলে দামি একটি শোপিস কিনেছে।
উন্নীত হওয়ার যুক্তিটি লেখায় স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে: যে সেলাই শ্রমিক মান পরীক্ষার যন্ত্র চালাতে শেখেন, তিনি কম নয়, বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠেন। পুরো নীতিগত প্রশ্নটিই এই এক বাক্যে।
সম্মেলনের কথাটি, আর যা তাতে নেই
ঢাকায় বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের বিশ্বের বৃহত্তম এআই মডেল বানানোর দরকার নেই; দরকার নিজের সমস্যায় এআইকে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা। কথাটি ঠিক, আর হিসাবশক্তির দৌড়ে জিততে না পারা একটি দেশের জন্য এটিই সঠিক কৌশলগত বোধ।
তবু কথাটি অসম্পূর্ণ, কারণ নিজের সমস্যায় এআই প্রয়োগ করাও বিনা মূল্যে হয় না। এর জন্য দরকার এমন মানুষ, যাঁরা এসব ব্যবস্থার শর্ত ঠিক করতে, কিনতে, যুক্ত করতে ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারেন—আর যে কারখানা সরবরাহকারীর দাবি যাচাই করতে পারে না, সে কিনে ফেলবে যেটির প্রদর্শনী সবচেয়ে চমকপ্রদ। ঘাটতিটি মডেল বানানোর মেধায় নয়। ঘাটতিটি অনেক বেশি সাদামাটা—যোগ্য ক্রেতা হয়ে ওঠার সক্ষমতায়।
নীতিমালায় কী থাকলে তা কাজের হবে
তিনটি জিনিস, কোনোটিই চমকপ্রদ নয়। স্বয়ংক্রিয়তার সঙ্গে যুক্ত তহবিলসহ পুনঃপ্রশিক্ষণের অঙ্গীকার—কোনো কারখানা এমন ব্যবস্থা বসালে যা কোনো পদ সরিয়ে দেয়, ওই শ্রমিকদের সরিয়ে আনার প্রশিক্ষণ বিনিয়োগেরই অংশ হওয়া উচিত, আশার বিষয় নয়। একটি ক্রয়মান, যাতে গাজীপুরের মাঝারি একটি কারখানার হাতে এআই সরবরাহকারী যাচাইয়ের তালিকা থাকে। আর উন্মুক্ত তথ্যের নীতি, কারণ বাংলাদেশভিত্তিক মডেলকে কাজে লাগাতে যে শিল্পতথ্য দরকার, তা এখন পড়ে আছে আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে।
রহিমা জাতীয় এআই নীতিমালা পড়বেন না। তবু সেটি কেমন করে লেখা হলো, তাতেই ঠিক হবে পাঁচ বছর পর তাঁর কাজটি কেমন দেখাবে—আর কক্ষের বাইরের কেউ তাতে প্রভাব ফেলতে পারেন কেবল এই মতামতের সময়টুকুতেই।
একটি সংখ্যাই ঝুঁকির মাত্রা বুঝিয়ে দেয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে কাজ করেন প্রায় ৪০ লাখ মানুষ, যাঁদের বড় অংশ নারী, আর রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে এ খাত থেকেই। যে প্রযুক্তি এর সামান্য অংশের কাজও বদলে দেয়, এ দেশে তা শিল্পের খবর নয়। তা সামষ্টিক অর্থনীতির খবর—আর তা আসে কারখানায় কারখানায় নেওয়া ক্রয়সিদ্ধান্তের ভেতর দিয়ে, এমন কোনো কেন্দ্রীয় মুহূর্ত ছাড়াই যেখানে কেউ সচেতনভাবে বেছে নেন।
এ কারণেই নীতিমালার সময়টুকু গুরুত্বপূর্ণ। যন্ত্র বসে যাওয়ার পর প্রশিক্ষণের শর্ত জুড়ে দেওয়া যায় না; শর্তটি লিখতে হয় কেনার আগে।
আর মতামত দেওয়ার প্রক্রিয়াটি নিয়েও একটি কথা। খসড়া নীতিমালা প্রকাশ্যে থাকে সীমিত সময়ের জন্য, আর মতামত দেন মূলত যাঁরা নথিটি পড়ার সময় ও অভ্যাস রাখেন—শিল্প সংগঠন, আইনি পরামর্শক, বড় প্রতিষ্ঠান। যাঁদের কাজ সবচেয়ে বেশি বদলাবে, তাঁদের পক্ষ থেকে মতামত আসে না। শ্রমিক সংগঠন ও কারখানার মাঝারি স্তরের ব্যবস্থাপকদের এ আলোচনায় টেনে আনা নীতিমালার মান বাড়ানোর সবচেয়ে সহজ উপায়গুলোর একটি।
সম্পর্কিত: এআই এখনো বাংলায় হোঁচট খায় কেন।




