জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ ব্যবহার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মিল্কিওয়ে ছায়াপথের কেন্দ্রের অতিভারী কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে বিপুল পরিমাণ ধাতুসমৃদ্ধ গ্যাস শনাক্ত করেছেন। ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে দ্য অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল জার্নালে।
‘ধাতু’ মানে যা আপনি ভাবছেন তা নয়
জ্যোতির্বিজ্ঞানে ধাতু বলতে বোঝায় হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের চেয়ে ভারী যেকোনো মৌল—অর্থাৎ অক্সিজেন আর কার্বনও এতে পড়ে, লোহা ও সোনার সঙ্গেই। মৃতপ্রায় তারার ভেতরে নিউক্লীয় সংযোজনে এসব মৌল তৈরি হয়, বিস্ফোরণে মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে, আর পরে নতুন তারা ও গ্রহের অংশ হয়ে যায়।
আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রের চারপাশের ধাতুগুলো মূলত সুপারনোভায় তৈরি হয়ে পরে কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। গ্যাসের রাসায়নিক গঠন কাছের তারাদের সঙ্গে বেশ মিলে যায়, যা একধরনের সামঞ্জস্য-পরীক্ষা: কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশের উপাদান এসেছে তার প্রতিবেশের একই তারকাগোষ্ঠী থেকেই, বিচিত্র কোথাও থেকে নয়।

এটি মাপা হলো কেন
মন্ট্রিয়লের ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোল ফোর্ড ধাঁধাটি তুলে ধরেছেন: মিল্কিওয়ের কৃষ্ণগহ্বর চারপাশের উপাদান টেনে নেয় ঠিকই, কিন্তু অন্য অতিভারী কৃষ্ণগহ্বরের তুলনায় খায় অনেক ধীরে। কেন, তা বুঝতে হলে জানতে হবে একে ঘিরে থাকা গ্যাস, ধূলি ও তারার বৈশিষ্ট্য।
ধাতুর পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তা বদলে দেয় গ্যাস কত দ্রুত ঠান্ডা হবে, আর ঠান্ডা হওয়া ঠিক করে গ্যাস কত সহজে ভেতরে টেনে নেওয়া হবে। উত্তপ্ত গ্যাস ভেতরে পড়তে বাধা দেয়; যে গ্যাস দ্রুত তাপ ছাড়ে, সেটি থিতিয়ে পড়ে ও জমা হয়। অর্থাৎ চারপাশের রসায়ন কোনো অলংকার নয়—এটি সেই কলকবজারই অংশ, যা খাওয়ার গতি ঠিক করে দেয়।
ফোর্ড ফলাফলের সীমাটিও বলেছেন: কৃষ্ণগহ্বরের কাছে গ্যাসের প্রবাহ স্থানীয় মেঘের অবস্থা দিয়ে নির্ধারিত হয়, তাই কেবল গ্যাসের তথ্য দিয়ে কোনো কৃষ্ণগহ্বর কতটা সক্রিয় তা বলা যায় না। এটি উত্তরের একটি টুকরো, উত্তর নয়।
এতে লাভ কী
দুটি। বহু দূরের ছায়াপথে অতিভারী কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে ধাতু কীভাবে ছড়িয়ে থাকে, তা বুঝতে এটি সাহায্য করবে—যেখানে এমন বিস্তারিত পরিমাপ অসম্ভব। এত কাছ থেকে এভাবে পরীক্ষা করা যায় কেবল আমাদের নিজেদের ছায়াপথের কেন্দ্রটিকেই, তাই এটিই হয়ে ওঠে তুলনার মানদণ্ড।
আর এটি আরও ঘরোয়া একটি প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত: ভারী মৌলগুলো পৃথিবীতে এল কীভাবে। আপনার রক্তের প্রতিটি লোহার পরমাণু আর ঢাকার কোনো স্বর্ণকারের দোকানের প্রতিটি গ্রাম সোনা তৈরি হয়েছিল মৃত্যুবরণ করা কোনো তারার ভেতরে। ওই মৌলগুলো কোথায় জমে আর কীভাবে চলে, তার খোঁজ নেওয়া মানে সেই সরবরাহ শৃঙ্খলের খোঁজ নেওয়া, যার শেষ প্রান্ত আমাদের পায়ের নিচের মাটি।
যে গ্যাসের কাছে যাওয়া যায় না, তা মাপা হয় কীভাবে
পদ্ধতিটির নাম বর্ণালিবীক্ষণ। প্রতিটি মৌল নির্দিষ্ট কিছু তরঙ্গদৈর্ঘ্যে আলো শোষণ ও বিকিরণ করে, তাই কোনো মেঘের ভেতর দিয়ে আসা তারার আলোয় তৈরি হয় কালো রেখার একটি নকশা—যা বলে দেয় মেঘটিতে কী আছে। ওয়েব কাজ করে অবলোহিত আলোয়, আর এখানে সেটিই জরুরি: আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্র ঢাকা পড়ে আছে পুরু ধূলির আড়ালে, যা দৃশ্যমান আলো পুরোপুরি আটকে দেয়—অবলোহিত আলো তার ভেতর দিয়ে যেতে পারে।
এ কারণেই এ পরিমাপ সম্ভব হয়েছে সম্প্রতি, আর এ কারণেই তা করা হয়েছে আমাদের নিজেদের ছায়াপথের কেন্দ্র নিয়ে, অন্য কোথাও পরিচ্ছন্ন কোনো লক্ষ্যবস্তু নিয়ে নয়। স্যাজিটেরিয়াস এ-স্টারকে যা দেখতে কঠিন করে তোলে, সেটিই একে দেখার মতো করেও তোলে: এটি এত কাছে যে উপযুক্ত যন্ত্র থাকলে আড়াল করা উপাদানটিকেই পড়ে ফেলা যায়।
আর ঢাকার আকাশ থেকে এ কেন্দ্রটি দেখা যায় না বললেই চলে—আলোকদূষণ আর কুয়াশা মিলিয়ে ছায়াপথের ব্যান্ডটিই এখন শহর থেকে প্রায় অদৃশ্য। যে জিনিস খালি চোখে দেখা যায় না, তা নিয়ে গবেষণার খবর পড়াও তাই এক ধরনের দেখা।
শেষে একটি প্রাসঙ্গিক কথা। স্যাজিটেরিয়াস এ-স্টারের ভর সূর্যের প্রায় ৪০ লাখ গুণ, অথচ অন্য ছায়াপথের সক্রিয় কৃষ্ণগহ্বরের তুলনায় এটি প্রায় নিস্তব্ধ। এ নিস্তব্ধতাই আমাদের সৌভাগ্য—সক্রিয় কেন্দ্র থাকলে ছায়াপথের ভেতরের অংশে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ টিকত কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন থাকত। অর্থাৎ ‘ধীরে খায় কেন’—প্রশ্নটি নিছক কৌতূহলের নয়।
সম্পর্কিত: ক্ষুদ্রতম কৃষ্ণগহ্বর আর পঞ্চম মাত্রা।




