প্রযুক্তি

পিএইচপির আতঙ্কে হামলার চেষ্টা হয়েছে লাখ লাখ, নিশ্চিত কোনো ভাঙন নেই, আর অনেক তথ্যই শেষে দাঁড়িয়েছে আবর্জনায়

ত্রুটিগুলো সত্যি ও গুরুতর ছিল। অপরাধীদের হাতে কার্যকর হামলার কৌশল আছে—এ খবরগুলো ছিল না। যাঁরা এক সপ্তাহের ঘুম হারিয়েছেন, তাঁরা এখন জানতে চাইছেন পরের সতর্কবার্তাটি কীভাবে লেখা উচিত।

পিএইচপির আতঙ্কে হামলার চেষ্টা হয়েছে লাখ লাখ, নিশ্চিত কোনো ভাঙন নেই, আর অনেক তথ্যই শেষে দাঁড়িয়েছে আবর্জনায়

মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলা এক সম্মেলনে বলেছেন, পিএইচপির এই জরুরি অবস্থার মতো কিছু তিনি ‘অনেক, অনেক দিন’ দেখেননি। সঙ্গে যোগ করেন, ‘আমি জানি, আইটি ও নিরাপত্তার সব মানুষের জন্য এটি ছিল এক দীর্ঘ দিন আর এক দীর্ঘ রাত।’

দীর্ঘ রাতের কথাটি তিনি ঠিকই বলেছেন। কয়েক দিন পর যা স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তা হলো—সেই রাতের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ কেটেছে এমন তথ্যের প্রতিক্রিয়ায়, যা সত্য ছিল না।

সপ্তাহটি আসলে কেমন ছিল

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সিস্টেম প্রশাসক অ্যাডাম মাড বিবিসির জো টিডিকে বলেন, ‘এটি ছিল নিরবচ্ছিন্ন।’ উদ্বিগ্ন ওয়েবসাইট মালিকদের কাছ থেকে এত বার্তা তিনি আগে কখনো পাননি।

‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল—যেসব গ্রাহক সতর্কতা হিসেবে সাইট বন্ধ রাখতে চান তাঁদের সামলানো, আর একই সঙ্গে অসংখ্য ভিন্ন ব্যবস্থায় হালনাগাদ ও সমাধান সমন্বয় করা,’ তিনি বলেন। ‘কখনো পিএইচপির সমস্যা সারাতে যত সময় লাগে, একটি ওয়েবসাইট বন্ধ করতে তার চেয়ে বেশি সময় লাগে।’

তিনি কাজ শুরু করতেন ভোরে, শেষ করতেন রাত সাড়ে ১০টায় (বিএসটি)।

মরিশাসে আইটি প্রশাসক লোগানাদেন ভেলভিন্দ্রন একই সমস্যার আরও কঠিন রূপে পড়েন। ‘চালু থাকা পিএইচপির অনেক সংস্করণই পুরোপুরি আয়ুষ্কাল শেষ করা, ফলে কিছু ক্ষেত্রে আমাদের ওয়েব অ্যাপ নতুন করে বানাতে ও কোড বদলাতে হচ্ছে,’ তিনি বলেন। যেখানে বসানোর মতো নতুন প্যাকেজই নেই, সেখানে প্যাচ করা মানে নতুন করে লেখা—আর সে প্রস্তুতির জন্য তিনি কোনো আগাম বার্তা পাননি।

এক ডিজিটাল বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত পরিচালক জন জোনস বর্ণনা করেছেন এর অদ্ভুত উত্তেজনা। ‘সতর্কবার্তাটি নামতে দেখা নিশ্চিতভাবেই চোখ খুলে দেওয়ার মতো, আর এটি আমাদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা,’ তিনি বলেন। ‘তবে একদিকে, হলিউডের অ্যাকশন দৃশ্যের মতো লাগায় ব্যাপারটা উত্তেজনাপূর্ণও ছিল।’ বুধবার বিএসটি সময় বিকেল ৩টায় প্যাচ এলে ‘দৌড় শুরু হয়ে যায়’—যদিও প্রতিটি প্রশাসক যা জানেন, তিনি সেটিও মনে করিয়ে দেন: ‘হালনাগাদ অন্য সমস্যা তৈরি করার আশঙ্কা সব সময়ই থাকে।’

চেষ্টা মানেই ভাঙন নয়
ক্লাউডফ্লেয়ার ও এডব্লিউএস জানিয়েছে ঘণ্টায় লাখ লাখ চেষ্টার কথা। এই ত্রুটি থেকে নিশ্চিত বড় ভাঙন: এ পর্যন্ত একটিও নয়। গ্রাফিক: টেক বিডি।

যে তথ্যটি ভুল ছিল

দৌড়টি এতটা জরুরি মনে হওয়ার কারণ ছিল ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া একটি দাবি—অপরাধীদের হাতে ইতিমধ্যেই কার্যকর হামলার কৌশল আছে। নিরাপত্তা গবেষকেরা এখন বলছেন, সে দাবি অনেকটাই ছিল কলরব।

‘হ্যাকারদের হাতে কার্যকর প্রুফ অব কনসেপ্ট (পিওসি) আছে এবং তারা সক্রিয়—এমন আবর্জনা তথ্যে আমরা ভেসে গিয়েছিলাম,’ বলেন যুক্তরাজ্যের সাইবার বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল কার্ড। মঙ্গলবার গুজব ছড়ানো শুরুর পর থেকেই তিনি একটানা কাজ করছিলেন। ‘এ ধরনের পরিস্থিতি আমাদের প্রথম নয়, তবে এবার মনে হচ্ছে এটি একেবারে অন্য মাত্রায় চলে গেছে।’

দুর্বলতাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল—এ নিয়ে তাঁর কোনো সংশয় নেই। তাঁর বিরক্তি সেগুলোকে ঘিরে আসা খবর নিয়ে।

সরকারি সংস্থাগুলো সতর্কবার্তা দিয়েছে—এমনকি, বিস্ময়করভাবে, জাপানের প্রধানমন্ত্রীও। আর অন্তত একটি বড় সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান হামলাকারীদের হাতে কার্যকর প্রুফ অব কনসেপ্ট আছে বলে সতর্কবার্তা প্রকাশ করে, পরে তা প্রত্যাহার করতে হয়।

যে সংখ্যাটি শেষে দাঁড়ায়নি

ক্লাউডফ্লেয়ার ও এডব্লিউএস—দুটিই ঘণ্টায় লাখ লাখ হ্যাকিং চেষ্টার কথা জানিয়েছে। সংখ্যাটি অনেক দূর ছড়িয়েছে, আর যে সংখ্যাটি আসলে গুরুত্বপূর্ণ তার থেকে এটিকে আলাদা করা দরকার।

চেষ্টা মানে সার্ভারে এসে পৌঁছানো একটি অনুরোধ। ভাঙন মানে হামলাকারীর ভেতরে ঢুকে পড়া। এ পর্যন্ত এই ত্রুটিগুলো থেকে বড় আকারের তথ্য ফাঁস বা সাইবার হামলার কোনো প্রমাণ নেই।

হামলাকারীরা কার্যকর কৌশল বানাতে এআই ব্যবহার করছে—এটি দেখা গেছে। তবে এখনো কোনোটিই বড় পরিসরে কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে না—যা এই সপ্তাহ নিয়ে একটি বক্তব্য, আগামী মাস নিয়ে নয়।

সতর্কবার্তা নিয়ে সতর্কবার্তা

এই ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করেছে এআই, যা দশকের পর দশক মানুষ গবেষকদের চোখ এড়িয়ে ছিল। ওপরে উদ্ধৃত সবাই মনে করেন, এটি চলতেই থাকবে। ফলে সতর্কবার্তা কীভাবে লেখা হয়, তা বিতর্কের বিষয় না থেকে এখন একটি জীবন্ত সমস্যা।

ওয়ার্ডপ্রেসের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ওয়ার্ডফেন্স-এর প্রতিষ্ঠাতা মার্ক মনডার সরাসরি বলেছেন, ‘ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক যে অসাধারণ সক্ষমতা আনছে, তা দিয়ে আমরা ভয়ংকর দুর্বলতা খুঁজে পেতেই থাকব, কিন্তু আমাদের বার্তাটির মাত্রা ঠিক করতে হবে।’

তাঁর দুশ্চিন্তা সতর্কতা-ক্লান্তি নিয়ে। প্রতিটি আবিষ্কার যদি সর্বোচ্চ আওয়াজে আসে, তাহলে যেটির মাধ্যমে সত্যিই হামলা হচ্ছে, তাতে সাড়া দেওয়া দ্রুত নয়, বরং ধীর হবে—কারণ যাঁদের কাজ করতে হবে, তাঁরা সাইরেনকে ছাড় দিতে শিখে যাবেন।

পরেরটি কীভাবে পড়বেন

বাংলাদেশে সাইট চালান যাঁরা, তাঁদের জন্য কাজের শিক্ষাটি ক্রম নিয়ে। প্যাচ করুন রক্ষণাবেক্ষণকারীদের দেওয়া পরামর্শবার্তার ভিত্তিতে, কারণ সেটি একটি যাচাইযোগ্য কারিগরি দলিল। কোনো স্ক্রিনশট, ফরোয়ার্ড করা ভয়েস নোট বা সক্রিয় হামলার দাবি করা বিক্রেতা-ব্লগের ভিত্তিতে প্যাচ করবেন না, আর সেগুলোর জোরে চালু থাকা সাইট বন্ধও করবেন না।

আর সারা সপ্তাহ যে দুটি প্রশ্ন মিলেমিশে গিয়েছিল, সেগুলো আলাদা করুন: আমার সফটওয়্যার আক্রান্ত কি না—এর উত্তর দেয় সংস্করণ নম্বর, আর কেউ আমার ওপর হামলা করছে কি না—এর উত্তর দেয় আপনার লগ। প্রথমটি চায় ব্যবস্থা। দ্বিতীয়টি চায় প্রমাণ।

আরও পড়ুন: এখানে সিপ্যানেল সাইটের মালিকদের যা করতে হবে।

সূত্র: বিবিসি

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি ঢাকাভিত্তিক একটি স্বাধীন প্রযুক্তি প্রকাশনা, প্রকাশিত হয় বাংলা ও ইংরেজিতে। লেখাগুলো আলাদা লেখকের নামে নয়, প্রকাশনার নামেই প্রকাশিত হয়; সংশোধন বা সূত্র নিয়ে প্রশ্ন পাঠানো যায় info@tech-bd.com ঠিকানায়।