বিবিসির প্রযুক্তি ও এআই সম্পাদক জো ক্লাইনম্যান পিএইচপির ঘটনাটিকে বলেছেন ‘সাইবার দুনিয়ার না ফাটা বোমা’—আর জানিয়েছেন, যে সাইবার ঘটনা এখনো ঘটেইনি তা নিয়ে এমন নাটকীয়, প্রকাশ্য ও বৈশ্বিক সাড়া তিনি আগে কখনো দেখেননি।
খুঁজে পাওয়া গেল যেভাবে
বিশ বছর ধরে পিএইচপির নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সাইবার নিরাপত্তা গবেষক রায়ান অস্টিন বিবিসি রেডিও ফোরকে বলেছেন, ত্রুটিটি তিনিই আবিষ্কার করেছেন। তাঁর ভাষায় এটি ‘আমার পাওয়া সবচেয়ে গুরুতর ত্রুটি’, আর এর শুরু ‘এমন একটি সন্দেহ থেকে, এআই ছাড়া যা যাচাই করাই আমার পক্ষে সম্ভব হতো না’।
এই এক বাক্যেই পুরো গল্পটি আছে। দুর্বলতাগুলো বছরের পর বছর পিএইচপিতে চুপচাপ বসে ছিল, আর সেগুলো কাজে লাগানো সহজও নয়—একজন গবেষক ক্লাইনম্যানকে বলেছেন, পরীক্ষা হিসেবে সারা রাত চেষ্টা করেও তিনি হিমশিম খাচ্ছিলেন। কিন্তু মানুষের জন্য যা খুব কঠিন, যন্ত্রের জন্য তা ক্রমেই সামান্য ব্যাপার হয়ে উঠছে।

আলজাজিরার বরাতে প্রথম আলো বলছে, এআই-সহায়ক সরঞ্জাম ব্যবহার করে ত্রুটি দুটি খুঁজে পেয়েছে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্যালিফ ও উইজ। কে খুঁজে পেয়েছেন, সে প্রশ্নে বিবরণ দুটি আলাদা; পদ্ধতির প্রশ্নে তারা একমত।
এরপর ফাঁস হলো নিষেধাজ্ঞা
সবাই প্যাচ দেওয়ার সুযোগ না পাওয়া পর্যন্ত সমাধানের খবরটি গোপন রাখার কথা ছিল। খবরটি ফাঁস হয়ে যায়, আর তখন থেকেই ঘড়ি চলতে শুরু করে।
সারে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যালান উডওয়ার্ড দ্বিধাটি চিহ্নিত করেছেন: ‘আক্রমণকারীদের সতর্ক না করে মানুষকে কীভাবে জানাবেন যে প্রস্তুত থাকতে হবে, আর তারপর যে জরুরি ভিত্তিতে প্যাচ দরকার? কার্যত আপনি একই সময়ে সবাইকে সমস্যাটির কথা বলছেন, আর আশা করছেন প্যাচ আসামাত্র রক্ষকেরা যেন যথেষ্ট জেগে থাকেন।’
অ্যামাজন জানিয়েছে, তাদের থ্রেট ইন্টেলিজেন্স ব্যবস্থা শনাক্ত করেছে যে তারা লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল; নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর আরও চেষ্টা হয়েছে, আর তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষতিকর স্ক্যানিং শনাক্ত করে আটকেছে। ক্লাউডফ্লেয়ার ও পালো অল্টো নেটওয়ার্কস বলছে চেষ্টা হয়েছে লাখ লাখ। এ পর্যন্ত কেউ সফল হয়েছে—এমন খবর নেই।
একই সপ্তাহের দুই পাঠ
কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির রেসপনসিবল এআইয়ের অধ্যাপক জিনা নেফ একে বলেছেন সুখবর: একটি বড় এআই প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় একদল মানুষ এআই দিয়ে সমস্যাটি খুঁজে বের করেছেন, মাসের পর মাস কাজ করে সমাধান করেছেন আর সবাইকে প্রস্তুত করেছেন। ‘এসব ঝুঁকি সামলানোর বিপুল সক্ষমতা আমাদের আছে।’
বিপরীত পাঠটিও একই তথ্যের ভেতরে। রক্ষকদের হাতে ছিল এআই আর মাসের পর মাস সময়; আক্রমণকারীদের হাতেও একই সরঞ্জাম, আর প্রকাশ্যে আসাটি তাঁদের জন্য দৌড় শুরুর সংকেত। দুই মাসও হয়নি, এক শ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান খোলা চিঠি দিয়ে বিশ্বকে বলেছিল এআইয়ের যুগের উপযোগী নতুন স্তরের সাইবার সহনশীলতা নিতে। তাঁরা কী বোঝাতে চেয়েছিলেন, তা জানতে বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি।
ছোট দেশের জন্য এর মানে
যে অংশটি এ দেশে আসে না, তা হলো সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা। ব্রিটেনের এনসিএসসি, ইইউ ও অস্ট্রেলিয়ার সমমর্যাদার সংস্থা আর যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থাগুলো ঘণ্টার মধ্যেই সমন্বিত নির্দেশনা দিয়েছে, আর বড় হোস্টিং প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল পরিসরে প্যাচ দিয়ে ফেলেছে—বেশির ভাগ গ্রাহক কিছু জানার আগেই।
বাংলাদেশের জাতীয় সার্ট আছে, কিন্তু হাজারো ছোট হোস্টিং রিসেলার আর বছর কয়েক আগে ক্লায়েন্টের সাইট বানিয়ে সরে যাওয়া এজেন্সিগুলোর ভেতর দিয়ে জরুরি প্যাচ ঠেলে দেওয়ার মতো প্রতিবর্ত ব্যবস্থা নেই। এ সপ্তাহের কাজের শিক্ষাটি পিএইচপি নিয়ে নয়। শিক্ষাটি হলো, বৈশ্বিক সতর্কবার্তা আর ঢাকার একটি প্যাচ দেওয়া সার্ভারের মধ্যকার দূরত্ব মাপা হয় সপ্তাহে—আর আক্রমণকারীরা ওই একই সতর্কবার্তা প্রথম দিনেই পড়ে ফেলেন।
একটি কথা আলাদা করে বলা দরকার, কারণ এটি সামনের দিনগুলোর ইঙ্গিত দেয়। বছরের পর বছর লুকিয়ে থাকা ত্রুটি যদি এআইয়ের সহায়তায় বের করা যায়, তবে একই পদ্ধতিতে আরও অনেক পুরোনো, বহুল ব্যবহৃত সফটওয়্যারেও ত্রুটি বেরোবে। পিএইচপি প্রথমটি, শেষটি নয়।
এর অর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ‘জরুরি প্যাচ’ আর বিরল ঘটনা থাকছে না। এত দিন যে কাজটি বছরে দু-একবার করতে হতো, সেটি নিয়মিত কাজ হয়ে উঠছে—আর যাঁদের হাতে কোনো প্যাচ-পরিকল্পনা নেই, তাঁদের জন্য প্রতিটি দফাই আলাদা সংকট।




