ফ্রান্সের প্রায় ৭০০ সুপারমার্কেটের হিমায়ন ব্যবস্থায় হামলা হয়েছে। শত শত ডিপ ফ্রিজারের বরফ গলে দোকানের মেঝে ভেসে গেছে, নষ্ট হয়েছে বিপুল পরিমাণ খাবার। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা এতটাই বেড়েছে যে আগুন ধরে গেছে। ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ১ কোটি ইউরো।
কাজটি হলো যেভাবে
সুপারমার্কেটের হিমায়ন চলে কেন্দ্রীয় অনলাইন কন্ট্রোলারে, যাতে কারিগরেরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে দূর থেকে তাপমাত্রা দেখতে ও বদলাতে পারেন। ফরাসি সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা আনসি বলছে, আক্রমণকারীরা লক্ষ্য করেছিল পুরোনো সেসব কন্ট্রোলার, যেগুলোতে চলছিল মেয়াদোত্তীর্ণ বা আর সমর্থন না পাওয়া সফটওয়্যার—নির্মাতা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ড্যানফস ও কোপল্যান্ড।
নিরাপত্তা হালনাগাদ ছিল না, আর ব্যবস্থাগুলো ইন্টারনেটে উন্মুক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। আক্রমণকারীরা দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পাসওয়ার্ড যাচাই পেরিয়ে স্বয়ংক্রিয় ডিফ্রস্ট চালু করে দেয় আর তাপমাত্রার সর্বোচ্চ সীমা তুলে দেয়। রাতের মধ্যেই ফ্রিজারের তাপমাত্রা ওঠে প্রায় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।

প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বিশেষজ্ঞরা সবচেয়ে জরুরি কথাটি বলেছেন: হামলাটিতে জটিল কোনো কোড লাগেনি। এখানে কারিগরি কৃতিত্বের কিছু ছিল না। ছিল এমন যন্ত্র, যা ইন্টারনেট থেকে নাগালে থাকারই কথা ছিল না, আর যাতে চলছিল এমন সফটওয়্যার, যা অনেক আগেই বদলে ফেলার কথা।
সীমা তুলে দেওয়াই আসল চাতুর্য
কেবল ডিফ্রস্ট চালু করলে তা চোখে পড়ত, আর কেউ বন্ধ করে দিত। ক্ষতিটি বড় হয়েছে তাপমাত্রার সর্বোচ্চ সীমা তুলে দেওয়ায়—কারণ নির্দিষ্ট মাত্রার পর ফ্রিজারকে আর গরম হতে না দেওয়ার যে নিরাপত্তা-ছাদ, সেটিই মুছে ফেলা হয়েছিল। এরপর কন্ট্রোলার সারা রাত ঠিক যা বলা হয়েছে তা-ই করেছে, কোনো আপত্তি ছাড়াই।
শিল্পযন্ত্রে হামলার চেনা ধরনটি এ-ই। ক্ষতি সাধারণত যন্ত্র ভেঙে আসে না। ক্ষতি আসে যন্ত্রটিকে নির্ভুলভাবে চালিয়ে—কেবল সীমাগুলো খুলে নিয়ে।
বাংলাদেশ থেকে পড়লে
এ দেশের কোল্ড চেইন সুপারমার্কেটের বিষয় নয়; এটি ওষুধ, পোলট্রি, দুগ্ধ আর হিমায়িত মাছ রপ্তানির বিষয়। টিকা ও ইনসুলিন সংরক্ষণ, হ্যাচারির ইনকিউবেটর, বরফকল আর রপ্তানির চিংড়ি রাখা হিমাগার—সবই চলে ঠিক এ ধরনের কন্ট্রোলারে, যেগুলোর অনেকই বছরখানেক আগে আমদানি হয়ে আর কখনো হালনাগাদ হয়নি—কারণ শিল্পকন্ট্রোলার হালনাগাদ মানে যন্ত্র বন্ধ রাখা, আর বন্ধ রাখা মানে পণ্য নষ্ট হওয়া।
যাঁরা ওই যন্ত্র দেখভাল করেন, তাঁদের তিনটি প্রশ্ন করা দরকার। এর কোনোটি কি ইন্টারনেট থেকে নাগালে আছে—সরাসরি, কিংবা চালু রেখে দেওয়া কোনো রিমোট-সাপোর্ট সরঞ্জামের মাধ্যমে? সফটওয়্যারটি কি নির্মাতার সমর্থনে আছে, নাকি মেয়াদ ফুরিয়েছে? আর কন্ট্রোলারে কি এমন কঠিন তাপমাত্রা-সীমা আছে, যা দূর থেকে বদলানো যায় না?
প্রথমটির সৎ উত্তর যদি হয় ‘সম্ভবত’ আর দ্বিতীয়টির ‘কেউ দেখেনি’, তবে গত সপ্তাহে ফ্রান্সের ৭০০ সুপারমার্কেট ঠিক ওই অবস্থাতেই ছিল। পার্থক্য হলো, ঢাকায় গলে যাওয়া ফ্রিজারে আইসক্রিমের বদলে টিকা থাকতে পারে।
এটি যে ধরনের সমস্যার অংশ
অপারেশনাল টেকনোলজি—পাম্প, চিলার, লিফট, জেনারেটর ও উৎপাদন লাইন চালানো কন্ট্রোলারগুলো—নকশা করা হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন কিছুই নেটওয়ার্কে যুক্ত ছিল না। নিরাপত্তা ছিল ভৌত: প্যানেলের নাগাল না পেলে সেটিং বদলানো যেত না। এরপর এল দূর থেকে পর্যবেক্ষণ, প্যানেলে যুক্ত হলো ইন্টারনেট সংযোগ, আর নকশার নিচে থাকা অনুমানটি নীরবে অসত্য হয়ে গেল।
এ ধরনের যন্ত্রকে অস্বস্তিকর করে তোলে প্রতিস্থাপনের চক্রটি। ওয়েব সার্ভার বদলায় কয়েক বছরে; রেফ্রিজারেশন কন্ট্রোলার টেকার কথা পনেরো বছর, আর যন্ত্রটি নষ্ট হওয়ার অনেক আগেই নির্মাতা হালনাগাদ দেওয়া বন্ধ করে দিতে পারে। সফটওয়্যারের মেয়াদ ফুরোনো মানে যন্ত্রের মেয়াদ ফুরোনো নয়—দুটি সময়রেখা আলাদা হয়ে যায়, আর ওই ফাঁকেই এ ধরনের হামলা বাসা বাঁধে।
বাংলাদেশে এ ফাঁকটি আরও চওড়া, কারণ এখানে শিল্পযন্ত্রের বড় অংশ আসে ব্যবহৃত বা পুনঃসংস্কার করা অবস্থায়—অর্থাৎ কেনার দিনেই তার সফটওয়্যার কয়েক বছরের পুরোনো। কেনার সময় দরদামের তালিকায় ‘নির্মাতা আর কত বছর নিরাপত্তা হালনাগাদ দেবে’—এ প্রশ্নটি প্রায় কখনোই থাকে না।
সম্পর্কিত: মেটার রিপোজিটরিতে একটি চুরি যাওয়া লগইন।




