যুক্তরাষ্ট্রের লেহম্যান কলেজের পদার্থবিদেরা বলছেন, বিগ ব্যাংয়ের ঠিক পরপরই তৈরি হওয়া অতি ক্ষুদ্র কৃষ্ণগহ্বরই হতে পারে সেই যন্ত্র, যা পঞ্চম মাত্রার সন্ধান দেবে—যদি তেমন কিছু থেকে থাকে।
গবেষণাটি করেছেন লুইস এ অ্যানকোরদোকি, অ্যালেক বেদ্রোয়া ও ডিটার লুস্ট, আর এটি প্রকাশিত হয়েছে ফিজিক্যাল রিভিউ ডি সাময়িকীতে।
ধারণাটি
আমাদের দৃশ্যমান জগৎ চার মাত্রার: দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা ও সময়। তাত্ত্বিক গবেষণার একটি ধারা বলছে, এই চার মাত্রার মহাবিশ্ব আসলে আরও বড় পাঁচ মাত্রার এক পটভূমির ভেতরে আছে, যাকে পদার্থবিদেরা বলেন ‘ডার্ক ডাইমেনশন’ বা বাল্ক। আমাদের চেনা বাস্তবতা হবে তার ভেতরে ভেসে থাকা একটি কাঠামো।
গবেষণাপত্রের যুক্তি আদিম কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে—বিশাল নক্ষত্রের জ্বালানি ফুরিয়ে ভেঙে পড়ে যেগুলো তৈরি হয় সেগুলো নয়, বরং বিগ ব্যাংয়ের ঠিক পরের ঘন পরিস্থিতিতে তৈরি অনেক ছোট বস্তু।
লেখকেরা বলছেন, এগুলো এতই ছোট আর এতই ঘন যে এদের অভিকর্ষ চার মাত্রার বাস্তবতা থেকে পঞ্চম মাত্রায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। তা ঘটলে এমন কৃষ্ণগহ্বরের আচরণ চার মাত্রার পদার্থবিদ্যা যা বলে তার চেয়ে মাপার মতো আলাদা হবে—আর ওই পার্থক্যই হবে খোঁজার মতো চিহ্ন।
টিকে গেলে এর তাৎপর্য পৌঁছাবে ডার্ক ম্যাটার, মহাজাগতিক গঠন আর স্পেসটাইমের স্বরূপ পর্যন্ত।
এটি যা, আর যা নয়
এটি পিয়ার-রিভিউ করা সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি তাত্ত্বিক প্রস্তাব, পর্যবেক্ষণ নয়। কেউ পঞ্চম মাত্রা শনাক্ত করেননি, আর আদিম কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্বও কেউ নিশ্চিত করেননি—সেগুলো এখনো প্রকল্পিত বস্তু।
অর্থাৎ ফলাফলটি শিরোনাম থেকে এক ধাপ দূরে: এটি যুক্তি দিচ্ছে যে যদি আদিম কৃষ্ণগহ্বর থেকে থাকে, আর যদি ডার্ক ডাইমেনশনের মডেল ঠিক হয়, তবে প্রথমটি দ্বিতীয়টি পরীক্ষার কাজে লাগার মতো যন্ত্র হবে। এটি প্রতিষ্ঠা করা মূল্যবান, কারণ এই ক্ষেত্রে ঘাটতি বাড়তি মাত্রা নিয়ে ধারণার নয়—সেগুলো পরীক্ষার উপায়ের।
আবিষ্কার না ভেবে এই ভিত্তিতেই বিচার করুন, আর এমন যেকোনো ফল পড়ার নিয়মটি খাটে: মূল্য এতে যে এটি এমন কোনো মাপজোখের ইঙ্গিত দেয় কি না, যা কেউ সত্যিই করতে পারেন।
বাংলাদেশে এর মানে কী
বাংলাদেশের কোনো যন্ত্র এটি পরীক্ষা করবে না, আর এটি প্রকাশের কারণ সেটি নয়।
তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা সেই অল্প কয়েকটি গবেষণাক্ষেত্রের একটি, যেখানে অবদান রাখার বাধা সত্যিই কম। এতে দরকার গণিত, গবেষণাপত্রে প্রবেশাধিকার আর একজন তত্ত্বাবধায়ক—গবেষণাগার, টেলিস্কোপ বা কণা-ত্বরক নয়। আর্কাইভ (arXiv) প্রিপ্রিন্ট সার্ভার বিনা মূল্যের, আর রাজশাহীর একজন শিক্ষার্থী ক্যালটেকের শিক্ষার্থীর সঙ্গে একই দিনে একই গবেষণাপত্র পড়েন।
এ কারণেই এ ধরনের কাজ এখানে এমনভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যেভাবে পরীক্ষামূলক পদার্থবিদ্যা এখনো নয়। বাংলাদেশি পদার্থবিদেরা দেশের প্রতিষ্ঠান থেকেই মহাজাগতিকবিদ্যা ও সাধারণ আপেক্ষিকতা নিয়ে প্রকাশ করেছেন; উৎপাদন সীমিত করে তত্ত্বাবধানের সামর্থ্য আর সময়, যন্ত্রপাতি নয়।
আর এতে আকৃষ্ট শিক্ষার্থীর জন্য সৎ সতর্কতা: বাড়তি মাত্রার অনুমাননির্ভর মডেলগুলোর ক্ষেত্র ভিড়ে ঠাসা আর পরীক্ষাযোগ্য ভবিষ্যদ্বাণী কম, যা একে পেশা গড়ার কঠিন জায়গা বানায়। এখানকার গবেষকেরা যত্ন নিয়ে একটি মাপজোখের পথ তৈরি করেছেন—আর ওই শৃঙ্খলাটিই, অর্থাৎ ধারণাকে শেষ পর্যন্ত যাচাইযোগ্য হতেই হবে বলে জেদ ধরা, অনুকরণের মতো অংশ।
আগের একটি মহাজাগতিক ফল আর তার সংখ্যাটি কীভাবে পড়তে হয়, তা আছে মহাবিশ্বের শেষ নিয়ে লেখাটিতে।
আদিম কৃষ্ণগহ্বর কেন এখনো প্রকল্পিত
এই গবেষণার পুরো যুক্তি দাঁড়িয়ে এমন একটি বস্তুর ওপর, যা কেউ কখনো দেখেননি—আর কেন দেখেননি, সেটি বোঝার মতো।
আদিম কৃষ্ণগহ্বর যদি থেকে থাকে, তবে সেগুলো অতি ক্ষুদ্র—কোনোটির ভর একটি পাহাড়ের সমান হলেও আকার একটি পরমাণুর চেয়ে ছোট। এত ছোট বস্তু আলো আটকায় না, তাই টেলিস্কোপে ছায়া হিসেবে ধরা পড়ে না। এগুলো শনাক্তের প্রস্তাবিত উপায়গুলো পরোক্ষ: দূরের নক্ষত্রের আলো এদের অভিকর্ষে সামান্য বেঁকে গেলে উজ্জ্বলতার ক্ষণিক বদল, কিংবা হকিং বিকিরণে বাষ্পীভূত হওয়ার সময় নির্দিষ্ট ধরনের বিস্ফোরণ।
দুটিই অত্যন্ত দুর্বল সংকেত, আর কোনোটিই এখনো নিশ্চিতভাবে ধরা পড়েনি। এ কারণেই এ ধরনের গবেষণাপত্র সাধারণত ‘হতে পারে’ দিয়ে শেষ হয়—আর সংবাদের শিরোনাম ‘হয়েছে’ দিয়ে। পার্থক্যটি ছোট শোনায়, কিন্তু বিজ্ঞানের খবর পড়ার সময় এটিই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি তৈরি করে।
সূত্র: ফিজিক্যাল রিভিউ ডি, প্রথম আলোর বরাতে।




