প্লুটোর কক্ষপথের বাইরে নতুন একটি বামন গ্রহ শনাক্ত করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা, যার অস্থায়ী নাম ইডি১৩৮। আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়ন (আইএইউ) স্বীকৃতি দিলে এটিই হবে সৌরজগতের ষষ্ঠ বামন গ্রহ।
চিলির ভেরা সি রুবিন মানমন্দিরের টেলিস্কোপের তথ্য বিশ্লেষণ করে এটি খুঁজে পেয়েছেন ম্যাথু হলম্যান—হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক ও স্মিথসোনিয়ানের জ্যেষ্ঠ জ্যোতিঃপদার্থবিদ।
মাপজোখ
সূর্য থেকে ইডি১৩৮-এর দূরত্ব প্রায় ৪৬ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক একক (এইউ)—অর্থাৎ পৃথিবী-সূর্য দূরত্বের ৪৬ গুণ, যা প্লুটোরও বেশ বাইরে।
এর আনুমানিক ব্যাস ৬০০ থেকে ১৫০০ কিলোমিটার। পরিসরটি এত চওড়া, কারণ আকার অনুমান করা হয় উজ্জ্বলতা থেকে, আর উজ্জ্বলতা নির্ভর করে পৃষ্ঠ কতটা আলো প্রতিফলিত করে তার ওপর—যা এখনো কারও জানা নেই। এই পরিসরের সর্বনিম্ন মাপেও এটি সেরেসের চেয়ে বড়, যা এখন স্বীকৃত সবচেয়ে ছোট বামন গ্রহ।

এত দিন কেউ দেখেনি কেন
এই অংশটিই সত্যিকারের কৌতূহলোদ্দীপক, আর বিষয়টি বস্তুটির ক্ষীণ হওয়া নিয়ে নয়।
ইডি১৩৮ আছে দক্ষিণ আকাশে, ফলে উত্তর গোলার্ধ থেকে একে দেখা খুব কঠিন—অথচ আকাশ জরিপের বড় অংশ হয়েছে সেখান থেকেই।
আরও সমস্যা, এটি রয়েছে আকাশগঙ্গার সমতলেই। সেখানে ধীরে চলা একটি বিন্দু খোঁজা মানে নিজেদের ছায়াপথের সবচেয়ে ঘন অংশের ভেতর দিয়ে তাকানো—তারায় এত ঠাসা একটি ক্ষেত্র যে সেখানে চলমান বস্তু আলাদা করা অত্যন্ত কঠিন। আকাশের এই পটিটি যে অনেক কিছু আড়াল করে রাখে, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তা বহুদিন ধরেই মানেন। ইডি১৩৮ দেখিয়ে দিল ঠিক কী কী।
বিজ্ঞানের কাছে এটি কেন কাজের
নিউজিল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ক্যান্টারবেরির সহযোগী অধ্যাপক মিশেল ব্যানিস্টার বলেছেন, বড় একটি ট্রান্স-নেপচুনিয়ান বস্তু হিসেবে ইডি১৩৮ বিজ্ঞানের দিক থেকে খুবই আগ্রহোদ্দীপক। এখন অন্য টেলিস্কোপগুলোও এটি নিয়ে কাজ শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দূরের বড় বস্তুগুলোই সবচেয়ে বেশি তথ্য দেয়, কারণ তাদের কক্ষপথে লেখা থাকে বাইরের সৌরজগতের মহাকর্ষীয় ইতিহাস—দৈত্যাকার গ্রহগুলো কোথায় সরেছে, আর পথে কী কী ছিটকে দিয়েছে।
‘বামন গ্রহ’ ছোট করে বলা নয়, নির্দিষ্ট একটি সংজ্ঞা
সংজ্ঞাটি স্থির হয় ২০০৬ সালে প্রাগে এক সম্মেলনে, আর এর তিনটি অংশ। গ্রহ সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে; নিজের মহাকর্ষে প্রায় গোলাকার হওয়ার মতো যথেষ্ট ভর তার থাকে; আর নিজের কক্ষপথের আশপাশ সে অন্য বস্তু থেকে পরিষ্কার করে ফেলে।
বামন গ্রহ প্রথম দুটি শর্ত পূরণ করে, তৃতীয়টিতে ব্যর্থ হয়। প্লুটোর ক্ষেত্রে ঠিক এটিই ঘটেছিল—সে গোলাকার, সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, আর নিজের অঞ্চলটি ভাগ করে নেয় আরও বহু উপাদানের সঙ্গে।
তাই ইডি১৩৮-কে বামন গ্রহ বলা মানে এটি কতটা চিত্তাকর্ষক সে বিষয়ে মন্তব্য নয়। এটি বলছে তার আশপাশ কতটা ভিড়ে ঠাসা—আর সেটিই জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মাপতে চাওয়া বিষয়গুলোর একটি।
এই মানমন্দির কেন হিসাব বদলে দেয়
ইডি১৩৮ মিলেছে ভেরা সি রুবিন মানমন্দিরের তথ্যে, আর এই খুঁটিনাটিটিই প্রায় আসল খবর। রুবিন বানানো হয়েছে বেছে নেওয়া লক্ষ্যের দিকে তাকিয়ে থাকার জন্য নয়, বরং দক্ষিণ আকাশের দৃশ্যমান পুরোটা রাতের পর রাত বারবার ছবি তোলার জন্য।
দূরের সৌরজাগতিক বস্তু খুঁজতে ঠিক এটিই দরকার—আকাশের একই টুকরোর বারবার ছবি, যাতে সরে যাওয়া হাতে গোনা বিন্দুগুলোকে না-সরা লাখো বিন্দু থেকে আলাদা করা যায়। ঠাসা একটি ক্ষেত্রের একটিমাত্র গভীর ছবি প্রায় কিছুই বলে না। এক শ ছবি বলে দেয় কোনটি নড়ছে।
এ কারণেই জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ধরে নিচ্ছেন, ইডি১৩৮ বিরল কিছু নয়, বরং লম্বা এক তালিকার শুরুর দিককার নাম। বাইরের সৌরজগতে হঠাৎ নতুন বাসিন্দা আসেনি। ভিড়ের ভেতর থেকে তাদের আলাদা করতে পারে এমন যন্ত্র আমাদের হাতে এসেছে।




