প্রযুক্তি

৮০ শতাংশ সাশ্রয়ের দাবি নিয়ে সেন্সর লাইট আনল হেগা — যে হিসাব সিঁড়িঘরে একে সত্যি করে আর বসার ঘরে মিথ্যা

সেন্সর বাতি বিদ্যুৎ বাঁচায় ঠিক একভাবেই: কেউ না থাকলে না জ্বলে। হিসাবটি কষলে দেখা যায়, কিছু ঘরে দাবিটি রক্ষণশীল আর কিছু ঘরে প্রায় শূন্য।

৮০ শতাংশ সাশ্রয়ের দাবি নিয়ে সেন্সর লাইট আনল হেগা — যে হিসাব সিঁড়িঘরে একে সত্যি করে আর বসার ঘরে মিথ্যা

ঘরে ঢুকলে নিজে থেকেই জ্বলে ওঠে আর বেরোলে নিভে যায় — এমন বাতি স্মার্ট হোমের সেই অল্প কয়েকটি ভাবনার একটি, যার খরচ ফোনের অ্যাপ ছাড়াই উঠে আসে। নতুন প্রতিষ্ঠান হেগা ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে তাদের স্বয়ংক্রিয় সেন্সর লাইটের ধারা উন্মোচন করেছে, আর জানিয়েছে পরে আসবে সুইচ, ডোরবেল, প্লাগ, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং বাড়ি ও অফিস স্বয়ংক্রিয়করণের পণ্য।

পণ্যটি যা করে

বাতিগুলোতে মোশন সেন্সরের সঙ্গে আছে যাকে কোম্পানি বলছে ইন্টেলিজেন্ট লাইট ডিটেকশন: মানুষ টের পেলে বাতি জ্বলে, আর তা-ও কেবল চারপাশের আলো কম থাকলে; জায়গাটি খালি হলে নিভে যায়। কোম্পানির দাবি, প্রচলিত বাতির তুলনায় সাশ্রয় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত। কান্ট্রি ম্যানেজার শেখ আল আমিন লক্ষ্যটি বর্ণনা করেছেন তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে আন্তর্জাতিক মানের স্বয়ংক্রিয়করণ হিসেবে।

হিসাবটি কষে দেখুন

সেন্সর বাতি বিদ্যুৎ বাঁচায় ঠিক একভাবেই: কেউ না থাকলে না জ্বলে। কথাটি আক্ষরিকভাবে নেওয়া দরকার, কারণ তাতেই আপনি নিজের ঘরের জন্য দাবিটি এক মিনিটে যাচাই করতে পারেন।

ধরুন একটি সিঁড়িঘরে ২০ ওয়াটের একটি এলইডি সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত — বারো ঘণ্টা — জ্বলে, কারণ অন্ধকারে সিঁড়ি ভাঙতে কেউ চায় না। দিনে তা ২৪০ ওয়াট-ঘণ্টা। এবার ধরুন সারা সন্ধ্যায় মিলিয়ে ওই সিঁড়ি আসলে ব্যবহার হয় এক ঘণ্টা। সেন্সর বাতি তখন ২৪০-এর বদলে পোড়ায় ২০ ওয়াট-ঘণ্টা, অর্থাৎ সাশ্রয় প্রায় ৯২ শতাংশ। ওই ঘরের জন্য “৮০ শতাংশ পর্যন্ত” বরং রক্ষণশীল।

এবার ধরুন বসার ঘর, যেখানে পরিবার সাতটা থেকে এগারোটা পর্যন্ত বসে। দুই ক্ষেত্রেই বাতি ওই চার ঘণ্টা জ্বলবে। সেন্সর বাঁচাবে কেবল শেষের সেই কয়েক মিনিট, যখন সবাই শুতে গেছে আর কেউ নেভাতে ভুলে গেছে — ভালো দিনে পাঁচ শতাংশ, আর পরিবারটি যদি এমনিতেই নিভিয়ে দেয় তবে কিছুই নয়।

কাজেই দাবিটি বিপণনের আজগুবি কথাও নয়, সর্বজনীন সত্যও নয়। এটি উপস্থিতির ধরন নিয়ে একটি বক্তব্য, আর তা খাটে সেখানেই যেখানে এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাতি জ্বলে অথচ নিচে কেউ থাকে না: সিঁড়িঘর, করিডর, গ্যারেজ, স্টোররুম, বাথরুম, ভবনের লবি, মসজিদের অজুখানা, দোকানের পেছনের ঘর।

আরেকটি সৎ কথা, কারণ এভাবেই এই সংখ্যাগুলো সবচেয়ে বেশি ফোলানো হয়। আপনি যদি পুরোনো ফ্লুরোসেন্ট টিউব বা ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্ব বদলান, সাশ্রয়ের বড় অংশ আসবে এলইডি থেকে, সেন্সর থেকে নয় — একই আলোর জন্য এলইডি ইনক্যান্ডেসেন্টের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বিদ্যুৎ খরচ করে। নতুন সেন্সর এলইডিকে পুরোনো ইনক্যান্ডেসেন্টের সঙ্গে তুলনা করে পুরো পার্থক্যটি সেন্সরের নামে লিখে দেওয়া ভুল যন্ত্রাংশের প্রশংসা।

দুই ধরনের সেন্সর, আর কোনটি কোন ঘরে

আপনি সন্তুষ্ট হবেন কি না তা সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে এই স্পেসিফিকেশনের ওপর, আর এটি প্রায় কখনোই বাক্সে লেখা থাকে না।

প্যাসিভ ইনফ্রারেড সেন্সর চলমান তাপ শনাক্ত করে। এগুলো সস্তা, নির্ভরযোগ্য, আর এর দুটি ফল জানা দরকার। এগুলো কাচ বা দেয়াল ভেদ করে দেখতে পারে না, যা সাধারণত আপনি চানই। আর এগুলো তাপের উৎসের নড়াচড়া ধরে — কাজেই ডেস্কে স্থির হয়ে বসা মানুষ ধরা পড়া বন্ধ হয়ে যেতে পারেন, আর যিনি যাননি তাঁর মাথার ওপরেই বাতি নিভে যায়। করিডর বা সিঁড়িঘরে এটি কখনো ঘটে না। স্টোররুমে, যেখানে কেউ স্থির দাঁড়িয়ে লেবেল পড়তে পারেন, এটি অহরহ ঘটে।

মাইক্রোওয়েভ সেন্সর একটি সংকেত ছাড়ে আর তাতে কিছু নড়লে পরিবর্তনটি ধরে। এগুলো ছোট নড়াচড়ায় বেশি সংবেদনশীল আর পাতলা পার্টিশন ভেদ করে যায় — যা বাধাযুক্ত লম্বা করিডরে সুবিধা, আর ফ্ল্যাটে সমস্যা, যেখানে প্লাস্টারবোর্ডের দেয়ালের ওপাশ দিয়ে কেউ হেঁটে গেলেই বাতি জ্বলে ওঠে।

কাজেই: পরিষ্কার দৃষ্টিরেখাসহ ঘেরা জায়গার জন্য পিআইআর, আর করিডর ও যেখানে নিখুঁততার চেয়ে বিস্তার বেশি জরুরি সেখানে মাইক্রোওয়েভ। কোনটি তা জিজ্ঞেস করুন, আর “বিস্তৃত কভারেজ” না মেনে মিটারে শনাক্তকরণের দূরত্ব জেনে নিন।

আরও তিনটি বিষয় দেখে নিন

হোল্ড টাইম। নড়াচড়া থামার পর বাতি কত ক্ষণ জ্বলে থাকে। খুব কম হলে আপনি সিঁড়িতে থাকতেই অন্ধকার নেমে আসে — যা বিরক্তিকর, আর এ কারণেই মানুষ এগুলো খুলে ফেলেন। নির্দিষ্ট নয়, সমন্বয়যোগ্য বিলম্ব খুঁজুন।

লাক্স থ্রেশহোল্ড। দিনের আলোয় বাতি জ্বলা ঠেকানোর সীমা। এটি সমন্বয়যোগ্য হওয়া উচিত, কারণ ইউরোপের শীতের জন্য ঠিক করা নির্দিষ্ট সীমা এখানে অদ্ভুত আচরণ করে।

ভোল্টেজ সহনশীলতা। বাংলাদেশে বাতিটি কত দিন টিকবে তা ঠিক করে এই স্পেসিফিকেশনটিই। এলইডি নিজে কদাচিৎ নষ্ট হয়; নষ্ট হয় একে চালানো ছোট পাওয়ার সাপ্লাইটি, আর তা নষ্ট হয় বয়সে নয়, ভোল্টেজের ওঠানামায়। প্রশস্ত ইনপুট পরিসর — ধরুন ১৭০–২৫০ ভোল্ট — পাঁচ বছর টেকা বাতিকে এক বছর টেকা বাতি থেকে আলাদা করে।

দাবিটি যে দুটি খরচ বাদ দেয়

স্ট্যান্ডবাই খরচ। সেন্সর বাতি কখনোই পুরোপুরি বন্ধ থাকে না। সেন্সর ও তার ইলেকট্রনিকস অবিরাম সামান্য বিদ্যুৎ টানে, সাধারণত এক ওয়াটেরও কম। একটি বাতির জন্য তা তুচ্ছ। অফিস ভবনজুড়ে চল্লিশটি বাতির জন্য এটি একটি স্থায়ী লোড, যা নীরবে শিরোনামের সাশ্রয় কমায় — আর সংখ্যাটি জিজ্ঞেস করে নেওয়া উচিত।

সুইচিং চক্র। ব্যস্ত করিডরের বাতি দিনে দুবার নয়, কয়েক শ বার জ্বলে-নেভে। এলইডি এটি ভালোভাবেই সামলায়; সস্তা ড্রাইভার কখনো কখনো পারে না — আর বেশি চলাচলের করিডরে আঠারো মাসে নষ্ট হওয়া বাতির ডায়োড নয়, ড্রাইভারই সাধারণত গেছে।

এ কারণেই ওয়ারেন্টির প্রশ্নটি আসলে সেবার প্রশ্ন। সেন্সর বাতি নষ্ট হয় ড্রাইভারে বা সেন্সরে, কাজেই সনদে কী লেখা তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয়ভাবে বদলে নেওয়ার পথ আছে কি না।

স্থানীয়ভাবে বাজারে আসার মূল্য আছে

এ দেশে স্মার্ট হোম পণ্য বেশির ভাগই এসেছে টুকরো টুকরোভাবে, আমদানিকারকদের হাত ধরে, পেছনে কোনো সহায়তা ছাড়াই — আর এভাবেই কোনো শ্রেণির বদনাম হয় যে “টেকে না”। স্থানীয় কার্যালয়, একটি দামের অবস্থান ও পণ্যের পরিকল্পনা নিয়ে কোনো ব্র্যান্ডের আসা তাই ছোট হলেও সত্যিকারের পার্থক্য।

আর স্মার্ট হোমের সব শ্রেণির মধ্যে সেন্সর বাতিতেই আপনি বিক্রেতার হিসাব নিজে মিলিয়ে দেখতে পারেন। এখন যে বাতির নিচে কেউ না থেকেও সেটি যত ঘণ্টা জ্বলে তা গুনে ওয়াট দিয়ে গুণ করুন — কিছু কেনার আগেই সাশ্রয়ের অঙ্কটি আপনার হাতে।

সূত্র: Sensor lighting specifications, PIR and microwave sensing principles, LED driver practice

লিখেছেন

Mahbub Rabbani

টেক বিডিতে ভোক্তা প্রযুক্তি নিয়ে লেখেন মাহবুব রব্বানী — ফোন, অ্যাপ, অপারেটিং সিস্টেম আর দেশের বেশির ভাগ মানুষের প্রতিদিনের প্ল্যাটফর্ম। সাইটের কীভাবে-করবেন নির্দেশিকাগুলো তাঁর লেখা; কোনো পণ্যকে তিনি মাপেন কেনার খরচ দিয়ে নয়, ব্যবহারের খরচ দিয়ে।