প্রযুক্তি

আমাদের হাত পড়ার আগে: বুনো অবস্থায় তরমুজ, কলা আর ভুট্টা দেখতে কেমন ছিল — আর আপনার খাওয়া কলাটি কেন মেয়াদ জানা এক ক্লোন

মানুষের ইতিহাসের দীর্ঘতম প্রকৌশল প্রকল্প নির্বাচনী প্রজনন। এটি এমন ফসল বানিয়েছে যা আমাদের ছাড়া টেকে না — আর এমন একটি ফল, একটিমাত্র ছত্রাক যার জাত একবার মেরেই ফেলেছে।

আমাদের হাত পড়ার আগে: বুনো অবস্থায় তরমুজ, কলা আর ভুট্টা দেখতে কেমন ছিল — আর আপনার খাওয়া কলাটি কেন মেয়াদ জানা এক ক্লোন

টেবিলে রাখা ফল ও সবজি দেখতে প্রাকৃতিক, অথচ এগুলোর প্রায় কোনোটিরই প্রকৃতিতে অস্তিত্ব নেই। এগুলো মানুষের ইতিহাসের দীর্ঘতম প্রকৌশল প্রকল্পের ফল: হাজার হাজার বছর ধরে কৃষকেরা সবচেয়ে মিষ্টি, সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে কম বিচিওয়ালা গাছের বীজ রেখে বাকিগুলো ফেলে দিয়েছেন।

এর নাম নির্বাচনী প্রজনন, আর একে জিনগত পরিবর্তন থেকে আলাদা করা দরকার। জিএম পদ্ধতিতে অন্য কোনো জীবের জিন ঢুকিয়ে একটি বৈশিষ্ট্য যোগ করা হয়। নির্বাচনী প্রজনন কেবল গাছটিতে আগে থেকেই থাকা বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্য থেকেই বেছে নেয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে — যতক্ষণ না বুনো আদি রূপটি আর চেনাই যায় না।

বেছে নেওয়াতেই কাজ হয় কেন

কৌশলটি শুনতে যতটা সহজ ততটা স্পষ্ট নয়, আর নিচের সবকিছুর গতি এটিই ব্যাখ্যা করে।

যেকোনো বুনো জনগোষ্ঠীতেই তারতম্য থাকে — কোনো ফল একটু বড়, কোনোটিতে বিচি একটু কম — আর সেই তারতম্যের কিছু অংশ বংশগত। কেবল চরম নমুনাটির বীজ রাখুন, পরের প্রজন্মের গড় সেদিকেই সরে যাবে। কয়েক শ প্রজন্ম ধরে এটি করুন, আর সরণটি বিপুল হয়ে উঠবে — কেউ জিনতত্ত্ব না বুঝেই, কোনো নকশার অভিপ্রায় ছাড়াই।

যা বেরিয়ে আসে তা সম্পর্কহীন ফসলের মধ্যেও এতটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ যে জীববিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন: ডোমেস্টিকেশন সিনড্রোম। বীজ নিজে থেকে ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করে, তাই ফসল গাছেই থেকে যায়। সুপ্তাবস্থা হারিয়ে যায়, তাই বুনলেই সব অঙ্কুরিত হয়। ফল বড়, মিষ্টি, নরম, কম তেতো আর কম সুরক্ষিত হয়ে ওঠে।

লক্ষ করুন, এর প্রতিটি বৈশিষ্ট্যই বুনো পরিবেশে অসুবিধা। যে গাছ নিজের বীজ ছড়ায় না আর রাসায়নিক প্রতিরক্ষা হারিয়েছে, সে নিজে থেকে ছড়াতে পারে না। গৃহপালন কেবল ফসল বদলায়নি; ফসলকে নির্ভরশীল বানিয়েছে — আর সম্পর্কটি দুদিকেই কাজ করে।

ছবির সেই তরমুজ

সবচেয়ে বেশি ছড়ানো প্রমাণটি ইতালীয় চিত্রশিল্পী জোভান্নি স্তানকির একটি স্থিরচিত্র, আঁকা ১৬৪৫ থেকে ১৬৭২ সালের মধ্যে। তাতে কাটা তরমুজের ভেতরটা লাল নয়: ঘোরানো শিরায় আলাদা হওয়া ফ্যাকাশে খণ্ড, আর কেবল কিছু জায়গায় রঙের ছোপ। পরে চাষিরা লাল অংশটির — যা আসলে গাছের অমরা — পরিমাণ বাড়াতে প্রজনন চালিয়ে গেছেন, যতক্ষণ না তা গোটা ভেতরটা ভরে ফেলে।

একটি সৎ সতর্কতা, কারণ ছবিটি প্রাপ্যের চেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাস নিয়ে ঘোরে। একটিমাত্র চিত্রকর্ম মানে একটিমাত্র ফল, তা-ও শিল্পীর দৃষ্টি আর সেই সময়ের রীতির মধ্য দিয়ে ছাঁকা — আর পাকা হওয়া ও মানের দিক থেকে একেকটি তরমুজ একেক রকম। ছবিটি ভালো প্রমাণ যে সপ্তদশ শতকের ইতালিতে ভিন্ন একটি জাত প্রচলিত ছিল। এটি কোনো প্রজাতির আলোকচিত্র নয়।

জোরালো প্রমাণ অন্যত্র, আর তা অনেক নীরস: জিনতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব ও বীজের অবশেষ — যেগুলো কারও তুলির ওপর নির্ভর না করেই একই গতিপথ দেখায়।

পাথরে ঠাসা কলা — আর যে অংশটি নিয়ে দুশ্চিন্তা করা উচিত

কলার চাষ শুরু হয় সাত থেকে দশ হাজার বছর আগে, এখনকার পাপুয়া নিউগিনি ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। আধুনিক ফলটি দুটি বুনো প্রজাতির সংকর — মুসা অ্যাকুমিনাটা ও মুসা বালবিসিয়ানা — যাদের ফল ছিল খাটো আর বড়, পাথরের মতো শক্ত বিচিতে ঠাসা।

নরম বিচিহীন কলা একটি বন্ধ্যা সংকর, অর্থাৎ একে বীজ থেকে জন্মানো যায় না। প্রতিটি গাছই আরেকটি গাছের কাটিং থেকে বংশবিস্তার করা, কাজেই বাণিজ্যিক কলা কেবল একই রকম নয় — সেগুলো জিনগতভাবে অভিন্ন, গ্রহজুড়ে ছড়িয়ে থাকা একটিমাত্র জীব।

এটি তাত্ত্বিক দুর্বলতা নয়। পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত পৃথিবী যে কলা খেত সেটি ছিল ভিন্ন জাত, গ্রো মিশেল — শোনা যায় আজকেরটির চেয়ে বেশি সুস্বাদু। মাটির একটি ছত্রাক — পানামা রোগ — এমন বাগানে ছড়িয়ে পড়ে যেখানে তাকে থামানোর মতো কোনো জিনগত বৈচিত্র্যই ছিল না, আর বাণিজ্যিক ফসলটি ধ্বংস করে দেয়। শিল্পটি তার জায়গায় আনে ক্যাভেন্ডিশ, যা ওই ধরনটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধী ছিল।

ক্যাভেন্ডিশ এখন একই রোগের নতুন একটি ধরনের মুখোমুখি, আর বাগানগুলো আবারও ক্লোনের একচাষ। ধরনটি দুর্ভাগ্য নয়। এটি কাটিং থেকে বংশবিস্তারের সরাসরি মূল্য: অভিন্নতাই পণ্যটিকে সুসংগত রাখে, আর অভিন্নতাই রোগজীবাণুকে বাধাহীন পথ দেয়।

ভুট্টা, গাজর ও বাকিরা

ভুট্টার পূর্বপুরুষ টিওসিন্টে, মধ্য আমেরিকার একটি ঘাস, যার “মোচা”য় খোসার ভেতরে থাকত ডজনখানেক শক্ত দানা; আজকের মোচায় থাকে কয়েক শ নরম দানা। রূপান্তরটিকে নির্বাচনের পক্ষে বড্ড বেশি মনে হয় — যতক্ষণ না জানা যায় যে পার্থক্যের বেশির ভাগই নিয়ন্ত্রণ করে অল্প কয়েকটি জিন, যার একটি ডাল ছড়ানো নিয়ন্ত্রণ করে আর আরেকটি প্রতিটি দানার চারপাশের শক্ত খোলস। বড় প্রভাবওয়ালা অল্প কয়েকটি জিনিস বদলালে গাছ দ্রুতই চেনার অযোগ্য হয়ে যায় — এ কারণেই প্রত্নতাত্ত্বিক নথিতে এটি সবার প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত ঘটতে দেখা যায়।

বুনো বেগুন ছিল ছোট, গোল, তেতো আর কাঁটাওয়ালা — চকচকে বেগুনের চেয়ে আগাছার কাছাকাছি। গাজর ছিল সরু, সাদা ও আঁশে ভরা; কমলা রংটি বাছাই করা হয়েছে তুলনামূলকভাবে সম্প্রতি। বুনো পিচ ছিল চেরির আকারের, আর তার বেশির ভাগটাই আঁটি।

প্রতিটি ক্ষেত্রেই দিকটি অভিন্ন: বড়, মিষ্টি, নরম, কম বিচি — আর এমন গাছ, যা যে পাখিদের খাওয়াত তাদের চেয়ে কৃষককেই বেশি দেয়।

“প্রাকৃতিক বনাম প্রকৌশল” কাঠামোটি ভেঙে পড়ে কেন

জিএম বিতর্ক সাধারণত সাজানো হয় প্রাকৃতিকের বিপরীতে প্রকৌশল হিসেবে। ওপরের ইতিহাস সেটি টিকিয়ে রাখা কঠিন করে দেয় — আর আরও একটি জটিলতা আছে, যার কথা প্রায় কখনোই ওঠে না।

কয়েক দশক ধরে উদ্ভিদ প্রজননকারীরা ব্যবহার করছেন মিউটেশন ব্রিডিং: বীজকে তেজস্ক্রিয়তা বা রাসায়নিকের মুখে ফেলে জিনোম এলোমেলো করা, তারপর যারা বাঁচে তাদের চাষ করা আর কাজের কিছু পেলে রেখে দেওয়া। এভাবে তৈরি হাজার হাজার জাত এখন চাষ হচ্ছে এবং কোনো মন্তব্য ছাড়াই প্রচলিত হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। জিনোমের কতটা বদলানো হলো আর তখন কতটা বোঝা যেত — এই বিচারে এটি একটি চিহ্নিত জিন ঢোকানোর চেয়ে অনেক বেশি স্থূল হাতিয়ার।

কাজেই বর্ণালিটির এক প্রান্তে প্রাকৃতিক আর অন্য প্রান্তে প্রকৌশল — ব্যাপারটা তা নয়। এটি চলে ধীর ও দিশাহীন থেকে দ্রুত ও এলোমেলো হয়ে নিখুঁত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পর্যন্ত — আর সবচেয়ে নিখুঁত পদ্ধতিটিই সবচেয়ে বেশি সন্দেহ কুড়োয়।

প্রতিটি উচ্চফলনশীল ধানের জাত, প্রতিটি হাইব্রিড ভুট্টার বীজ, প্রতিটি উন্নত আমের জাত — সবই উন্নততর হাতিয়ার দিয়ে চালিয়ে যাওয়া সেই একই প্রক্রিয়া। তরমুজের ইতিহাস আরও ভালো প্রশ্নটি দেখিয়ে দেয়: পাতের সবকিছুই প্রকৌশলের ফল, কাজেই তর্কটি কেবল কীভাবে, কত দ্রুত আর কার হাতে — তা নিয়েই।

সূত্র: Domestication genetics literature, crop history, IAEA/FAO mutant variety records, Giovanni Stanchi still life

লিখেছেন

Tanmay Das

টেক বিডিতে বিজ্ঞান, মহাকাশ ও স্বাস্থ্য নিয়ে লেখেন তন্ময় দাস — গবেষণার ফল, মহাকাশ অভিযান আর চিকিৎসাবিজ্ঞানের খবর। কোনো গবেষণা আসলে কী মেপেছে, তিনি তা-ই পড়েন; আর লেখেন সংবাদ বিজ্ঞপ্তির জন্য নয়, ঢাকার পাঠকের জন্য তার মানে কী—তা নিয়ে।