প্রতারণার মাধ্যমে গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাসেল ও তাঁর স্ত্রী শামীমা নাসরিন গ্রেপ্তার হওয়ার পর লাখ লাখ গ্রাহক দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। একইভাবে গ্রাহকের ১১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় ই–অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া মেহজাবিনসহ কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
ইভ্যালি ও ই–অরেঞ্জের কম দামে পণ্য কেনার ফাঁদে পড়া গ্রাহকদের এখন একটাই দাবি, যেকোনো মূল্যে তাঁরা টাকা কিংবা পণ্য ফেরত চান। কিন্তু কীভাবে তাঁরা টাকা ফেরত পাবেন, সে ব্যাপারে আইনজ্ঞদের অভিমত হচ্ছে, প্রতারিত গ্রাহকদের ফৌজদারি ও দেওয়ানি—দুই ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এই আইনি প্রক্রিয়ায় টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়টি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।
লোভনীয় দামে পণ্য কেনার ফাঁদে আটকে যাওয়া শত শত গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য প্রতারক কোম্পানির সম্পত্তি ক্রোকের পর তা বিক্রি করার নতুন বিধান তৈরি করার পরামর্শ দিয়েছেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় টেক বিডিকে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘প্রতারণার মাধ্যমে যেসব কোম্পানি মানুষের কাছ থেকে নেওয়া টাকায় অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছে, সেসব সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে মানুষের টাকা মানুষের কাছে ফিরিয়ে দিলে সবচেয়ে ভালো হবে। প্রতারক কোম্পানির সম্পত্তি ক্রোক করে তা বিক্রির জন্য আলাদা বিধান করা উচিত। বিদ্যমান আইনে কোনো মামলার আসামি দণ্ডিত হওয়ার পর সম্পত্তি ক্রোকের বিধান রয়েছে। কিন্তু ওই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।’
প্রতারণার মাধ্যমে গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাসেল এবং তাঁর স্ত্রী শামীমা নাসরিন। বর্তমানে তাঁদের হেফাজতে নিয়ে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করছে। এর আগে ১১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ই-অরেঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা সোনিয়া মেহজাবিনসহ প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন কর্মকর্তা গত ১৭ আগস্ট থেকে কারাগারে আছেন।
ইভ্যালির গ্রাহকদের কীভাবে টাকা ফেরত দেওয়া হবে, সে প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাসেলের আইনজীবী মনিরুজ্জামান আসাদ টেক বিডিকে বলেন, ইভ্যালি তো অস্বীকার করছে না যে তারা টাকা নেয়নি কিংবা টাকা ফেরত পাবেন না। রাসেল ও তাঁর স্ত্রী যদি জামিনে ছাড়া পান, তারপর নিশ্চয় তাঁরা গ্রাহকের টাকা কিংবা পণ্য ফেরত দেবেন।
অবশ্য গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়া প্রসঙ্গে ই–অরেঞ্জের উদ্যোক্তা সোনিয়া মেহজাবিনের আইনজীবী মামুনুর রশীদ প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের দায় মেহজাবিন কিংবা তাঁর স্বামীর নয়। গত এপ্রিল মাসে বীথি আক্তার নামের এক ব্যক্তির কাছে প্রতিষ্ঠানটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
এর আগেও যুবক, ডেসটিনি কিংবা ইউনিপেটুইউর মতো প্রতিষ্ঠানের লোভনীয় ফাঁদে আটকা পড়ে হাজার হাজার গ্রাহক টাকা খুইয়েছেন, কিন্তু কেউই তাঁদের টাকা ফেরত পাননি। বেশি লাভের আশায় টাকা বিনিয়োগ করে পথে বসে গেছেন অনেক গ্রাহক।
এসব ঘটনায় রাষ্ট্রপক্ষ এবং ব্যক্তির পক্ষ থেকেও ফৌজদারি মামলা হয়েছে। সেসব মামলার বেশির ভাগ বিচারাধীন। অবশ্য ইউনিপেটুইউর ২৫৫ জন গ্রাহক টাকা আদায়ের জন্য ইউনিপেটুইউর চেয়ারম্যান শহিদুজ্জামানসহ ১৫ জনকে বিবাদী করে ২০১৮ সালে ঢাকায় দেওয়ানি আদালতে ‘মানি মোকদ্দমা’ করেন। এই মামলার বিচার চলমান।
বর্তমানে ই-অরেঞ্জ, ইভ্যালিসহ বেশ কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কম দামে পণ্য বিক্রির লোভনীয় ফাঁদে যাঁরা আটকে গেছেন, সেসব গ্রাহকের কথা চিন্তা করে সরকারকে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শফিক আহমেদ টেক বিডিকে বলেন, গ্রাহকেরা প্রতারিত হয়ে টাকা না পাওয়াটা দুঃখজনক। সরকারের উচিত, যেসব কোম্পানি গ্রাহকের টাকা আত্মসাৎ করেছে, তাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। পাশাপাশি গ্রাহকের টাকা ফিরিয়ে দেওয়ারও উদ্যোগ নেওয়া উচিত রাষ্ট্রের। যাকে মানুষ টাকা দিল, তার যদি সম্পত্তি থাকে, সেটা ক্রোক করে বিক্রি করে যতটুকু সম্ভব গ্রাহককে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গত বৃহস্পতিবার রাতে মুঠোফোনে টেক বিডিকে বলেন, ‘অবশ্যই প্রয়োজনীয় আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’




