কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শিল্পের এমন একটি স্তর আছে, সিলিকন ভ্যালির বাইরে যার নাম প্রায় কেউ জানেন না—আর বিনিয়োগকারীরা এখন সবচেয়ে মন দিয়ে সেটিকেই দেখছেন।
এদের বলা হয় নিওক্লাউড। কোরউইভ ও নেবিয়াস-এর মতো প্রতিষ্ঠান দামি কম্পিউটারে ঠাসা বিশাল গুদাম চালায় এবং সেই সক্ষমতা ভাড়া দেয় সবার চেনা এআই প্রতিষ্ঠানগুলোকে—ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক ও মেটা। এই উত্থানের তারকা নয়, এরা বাড়িওয়ালা। আর এখন প্রশ্ন উঠেছে, আর্থিকভাবে এরা আদৌ মজবুত কি না।
সংখ্যাটি
নিওক্লাউডগুলো সাধারণত বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা চুক্তি করে, তারপর সেই চুক্তি আর এআই চিপগুলোকেই জামানত দেখিয়ে ঋণ নেয়। যন্ত্রপাতির দাম আগেই শোধ করতে হয়, তাই এ খাতে ঋণ থাকাটাই স্বাভাবিক।
আইপিও গবেষণা প্রতিষ্ঠান দ্য কোয়ায়েট পিরিয়ডের বিশ্লেষক কোরি জনসন বিবিসিকে বলেছেন, ঋণদাতারা অনেক সময় নিওক্লাউডের নিজের চেয়ে তার গ্রাহকদের—মাইক্রোসফট, মেটা—ঋণযোগ্যতাকে বেশি গুরুত্ব দেন। তাঁর ভাষায়, ‘এ থেকেই বোঝা যায় কোরউইভ কীভাবে ৩,৫১০ কোটি ডলারের (২,৬৩০ কোটি পাউন্ড) ঋণ জমিয়েছে।’

পূর্বাভাস যা বলছে
গার্টনারের বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস, ২০৩০ সালের মধ্যে ৮০ শতাংশ নিওক্লাউড প্রতিষ্ঠান ‘স্বাধীনভাবে কার্যক্রম চালানো বন্ধ করে দেবে’। ফরেস্টার বলছে, ‘আর্থিক অবস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়ায়’ অন্তত তিনটি অচিরেই অধিগ্রহণের মুখে পড়বে।
বিনিয়োগকারীরা আগেই নড়েচড়ে বসেছেন। গত এক মাসে কোরউইভের শেয়ারের দাম কমেছে প্রায় এক-চতুর্থাংশ, আর একই সময়ে নেবিয়াস, আইরেন ও অ্যাপ্লায়েড ডিজিটালের শেয়ারও প্রায় ততটাই বা তার বেশি কমেছে। খাতটির কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণদাতারা এখন আরও বেশি মুনাফা চাইছেন।
কোরউইভের প্রধান নির্বাহী মাইক ইনট্রেটর বলেছেন, বাজার ‘অযৌক্তিক’ আচরণ করছে; নিজেদের ব্যবসায়িক মডেলে তিনি আস্থাশীল। বৃহস্পতিবার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সিএনবিসিকে বলেছেন, নিওক্লাউডগুলো ‘পুরো ব্যবস্থার একটি ছোট অংশ’।
ক্রিপ্টোর উত্তরাধিকার
নিওক্লাউডগুলোর কয়েকটি আগে ক্রিপ্টো মাইনার ছিল। কোরউইভের যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে ইথেরিয়াম মাইনিং দিয়ে; আইরেন, কোর সায়েন্টিফিক ও অ্যাপ্লায়েড ডিজিটালও সেখান থেকেই এসেছে। মাইনিংয়ে যে ধরনের ভৌত অবকাঠামো লাগে, এআই প্রশিক্ষণেও প্রায় সেটিই লাগে—ফলে ২০২২ সালে চ্যাটজিপিটি আসার সময় এরা অস্বাভাবিক সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। ব্যতিক্রম নেবিয়াস—রাশিয়ার গুগল বলে পরিচিত ইয়ানডেক্সের অংশ ইয়ানডেক্স এনভি ছিল এটি, ২০২৪ সালে আলাদা হয়ে নাম বদলায়।
এ সপ্তাহে টলে গেল কেন
নিওক্লাউডের টিকে থাকা নির্ভর করে গ্রাহকদের খরচ চালিয়ে যাওয়ার ওপর। মাইক্রোসফট ও গুগল যখন প্রত্যাশার চেয়ে কম এআই ব্যয়ের পূর্বাভাস দিল, কয়েকটি নিওক্লাউডের শেয়ারদর একসঙ্গে পড়ে গেল। সম্প্রতি বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যায়—যা ২০৩০ সাল পর্যন্ত গড়াতে পারে—ব্রিটিশ নিওক্লাউড এনস্কেলের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে মাইক্রোসফট, আর অস্ট্রেলিয়ার ফার্মাস শেয়ারবাজারে আসার পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছে।
ইলন মাস্ক সম্প্রতি এক পোস্টে লিখেছেন, দুই শতাধিক নিওক্লাউড ‘গাপ্পি মাছের মতো মৃত্যু ও একীভবনের’ মুখে পড়তে পারে। তিনি যোগ করেন, ‘কিছু টিকে যাবে, তবে বেশি নয়।’
সবাই অবশ্য হতাশ নন। ইয়র্কভিল আইভসের বিশ্লেষকেরা বলছেন, কম্পিউটিং ক্ষমতার চাহিদা এখনো সরবরাহের চেয়ে বেশি, আর বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যে ফাঁক পূরণ করতে পারে না নিওক্লাউডগুলো সেটিই করছে। তবে খাতটির ভাগ্য এখন বাঁধা পড়েছে এমন দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে, যারা এখনো শেয়ারবাজারে আসেনি—আগামী কয়েক মাসে অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআই দুটিরই শেয়ার ছাড়ার কথা।
টাস্ক ভেঞ্চার্সের ব্র্যাডলি টাস্ক বলছেন, ‘এআই যদি বুদ্বুদ হয় আর ফেটে যায়’, তাহলে নিওক্লাউড প্রতিষ্ঠানগুলো ‘নিশ্চিতভাবেই পার্শ্বক্ষতির মুখে পড়বে’।




