প্রতিবছর অক্টোবরে পৃথিবী হ্যালির ধূমকেতুর ফেলে যাওয়া ধূলিকণা ও অবশিষ্টাংশের মধ্য দিয়ে যায়, আর তা থেকেই হয় ওরিওনিড উল্কাবৃষ্টি। এটি শীর্ষে ওঠে ২১ ও ২২ অক্টোবর রাতে, আর বাংলাদেশের আকাশ থেকেও তা দেখা যায়।
কতটা দেখা যেতে পারে
ভালো পরিস্থিতিতে ঘণ্টায় ২০টি পর্যন্ত খসে পড়া তারা—সত্যিকারের অন্ধকার আকাশে ১০ থেকে ২০টি। উল্কাগুলো ছড়িয়ে পড়ে বলে মনে হয় ওরিয়ন নক্ষত্রমণ্ডল থেকে, লাল দানব তারা বেটেলজিউসের কাছাকাছি অঞ্চল থেকে—এখান থেকেই উল্কাবৃষ্টির নামটি এসেছে।
কণাগুলো হ্যালির ধূমকেতুরই প্রাচীন অংশ, যা বায়ুমণ্ডলে ঢোকে ঘণ্টায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ মাইল বেগে। বাতাসের সঙ্গে সংঘর্ষে সেগুলো বাষ্পীভূত হয়, আর তাতেই তৈরি হয় আলোর যে রেখাটি আপনি দেখেন।

সময়ের সমস্যাটি
বিশেষজ্ঞদের মতে সবচেয়ে উপযুক্ত সময় ২১ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত। তবে একটি জটিলতা আছে: চাঁদ ৭৪ শতাংশ আলোকিত, আর এতটা জ্যোৎস্নায় রাতের বড় একটি সময় ধরে ফিকে উল্কাগুলো দেখা যাবে না।
সৌভাগ্যের বিষয়, সূর্যোদয়ের আগেই চাঁদ ডুবে যায়। চাঁদ ডোবা আর প্রথম আলো ফোটার মাঝের কয়েক ঘণ্টায় সত্যিকারের অন্ধকার আকাশ মেলে, আর তখনই উল্কাবৃষ্টি ঠিকভাবে দেখা সম্ভব। অ্যালার্ম দিলে মধ্যরাতে নয়, শেষ রাতের দিকেই দিন।
দেখবেন যেভাবে
কোনো যন্ত্রপাতি লাগে না—টেলিস্কোপ নয়, দূরবিনও নয়। লাগে পরিষ্কার আকাশ আর খোলা জায়গা। উজ্জ্বল আলো থেকে দূরে যান, আর চোখকে অন্ধকারে সইয়ে নিতে ২০ থেকে ৩০ মিনিট সময় দিন; বেশির ভাগ মানুষ রাতদৃষ্টি তৈরি হওয়ার অনেক আগেই হাল ছেড়ে দেন—কিছু না দেখতে পাওয়ার সবচেয়ে প্রচলিত কারণ এটিই।
বাংলাদেশের শহর থেকে এটিই কঠিন অংশ। ঢাকা, চট্টগ্রাম বা খুলনার আলোকদূষণ একাই একটি উল্কাবৃষ্টির বেশির ভাগ মুছে দিতে যথেষ্ট। শহরের কিনারা, সড়কবাতি থেকে দূরে কোনো ছাদ, কিংবা শহরের বাইরের খোলা জায়গায় যেতে পারলে পার্থক্যটি সামান্য নয়—পার্থক্যটি কয়েকটি দেখা আর কিছুই না দেখার। অক্টোবরে কুয়াশাও থাকে, তাই অন্ধকারের মতোই জরুরি পরিষ্কার আকাশ।
বছরে দুবার আসে কেন
হ্যালির অবশিষ্টাংশ থেকে তৈরি বছরের দ্বিতীয় উল্কাবৃষ্টি ওরিওনিড। প্রথমটি মে মাসের ইটা অ্যাকুয়ারিড। পৃথিবী বছরে দুবার ধূমকেতুটির পথরেখা অতিক্রম করে, তাই একটি ধূমকেতু থেকেই দুটি উল্কাবৃষ্টি।
হ্যালি নিজে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে ৭৬ বছরে একবার, আর পৃথিবী থেকে আবার দৃশ্যমান হবে ২০৬১ সালে। আজ রাতে যিনি দেখছেন, তিনি এমন এক ধূমকেতুর টুকরো দেখছেন যা এখনকার বেশির ভাগ মানুষ সরাসরি কখনো দেখবেন না—ভোররাত চারটায় ভাবার মতো কথা।
আজ রাতে মেঘ থাকলে
শীর্ষ রাত পেরোলেই উল্কাবৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায় না। ওরিওনিডের কার্যক্রম দুই পাশে কয়েক দিন ধরে চলে, হার কিছুটা কম থাকে—তাই ২৩ তারিখের পরিষ্কার আকাশ আজকের মেঘলা আকাশের চেয়ে বেশি কাজের। শহরের আলো থেকে দূরে যেতে যদি সপ্তাহান্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়, তাতেও ক্ষতি নেই—অন্ধকার জায়গা থেকে কম উল্কা দেখা সাধারণত আলোকিত জায়গা থেকে বেশি উল্কা দেখার চেয়ে ভালো।
ছবি তোলার কথা ভাবলে একটি বাস্তব কথা। উল্কা দ্রুতগামী ও ফিকে একটি রেখা, আর ফোনের নাইট মোড কয়েক সেকেন্ডের ফ্রেম গড় করে—যা ঠিক ওই রেখাটিকেই মুছে দেয়। ট্রাইপডে বসানো ক্যামেরায় দীর্ঘ এক্সপোজারে সম্ভাবনা আছে; হাতে ধরা ফোনে প্রায় নেই। ওই ঘণ্টাটি বরং দেখেই কাটানো ভালো।
আর নিরাপত্তার একটি কথা: অন্ধকার খোলা জায়গা খুঁজতে গিয়ে রাতে অচেনা নির্জন জায়গায় একা না যাওয়াই ভালো। ছাদ, স্কুলের মাঠ কিংবা পরিচিত কারও বাড়ির উঠানই যথেষ্ট—দরকার কেবল সরাসরি আলো চোখে না পড়া।
দেখার সময় একটি ছোট কৌশলও কাজে দেয়: সরাসরি ওরিয়নের দিকে না তাকিয়ে আকাশের একটু পাশে তাকান। উল্কা ছড়ায় ওই অঞ্চল থেকে, কিন্তু রেখাগুলো লম্বা হয়ে ফুটে ওঠে কিছুটা দূরে গিয়ে। চিত হয়ে শুয়ে আকাশের বড় একটি অংশ চোখে রাখাই সবচেয়ে কার্যকর ভঙ্গি, আর মাঝেমধ্যে ফোনের পর্দায় তাকালে অন্ধকারে সয়ে আসা চোখ আবার শূন্য থেকে শুরু করে—তাই ফোনটি পকেটেই থাক।
সম্পর্কিত: অক্টোবরে বাংলাদেশের রাতের আকাশ।




