প্লাস্টিক বা রেজিনের বদলে জীবন্ত কোষ ও জৈব উপাদান দিয়ে ত্রিমাত্রিক কাঠামো তৈরির প্রযুক্তিই থ্রিডি বায়োপ্রিন্টিং। জীববিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, উপাদানবিজ্ঞান ও প্রকৌশলের মিলনস্থলে দাঁড়ানো এ প্রযুক্তির উদ্দেশ্য মানবদেহের ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু মেরামত করা, নতুন ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা আর পুনর্জনন চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা।
কাজ করে যেভাবে
প্রথম ধাপ বায়োইঙ্ক তৈরি: জীবন্ত কোষের সঙ্গে অ্যালজিনেট, জেলাটিন, কোলাজেন বা হায়ালুরোনিক অ্যাসিডের মতো সহায়ক উপাদান মেশানো। এগুলো মিশ্রণটিকে আকার ধরে রাখার মতো কাঠামো দেয়, অথচ ভেতরের কোষগুলোকে মেরে ফেলে না।
এরপর কম্পিউটারে রাখা সুনির্দিষ্ট নকশা অনুসরণ করে বায়োপ্রিন্টার বায়োইঙ্ককে স্তরে স্তরে সাজিয়ে ত্রিমাত্রিক কাঠামো গড়ে তোলে। উপাদান ও প্রয়োজনীয় সূক্ষ্মতা অনুযায়ী প্রিন্টিং হতে পারে এক্সট্রুশন, ইঙ্কজেট, লেজার, আলো, শব্দতরঙ্গ কিংবা চৌম্বকীয় পদ্ধতিতে।
প্রিন্ট হওয়াই শেষ নয়। এরপর কাঠামোটি উপযুক্ত পরিবেশে রেখে অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ করা হয়, যাতে কোষগুলো বেড়ে উঠতে পারে—এ ধাপেই ছাপা বস্তুটি জীবন্ত টিস্যু হয়ে ওঠে, কিংবা ব্যর্থ হয়।

এ পর্যন্ত যা বানানো হয়েছে
গবেষকেরা তৈরি করেছেন ত্বক, হাড়, তরুণাস্থি ও স্পন্দনক্ষম হৃৎপিণ্ডের টিস্যু কাঠামো। পাশাপাশি বানানো হচ্ছে যকৃৎ, অগ্ন্যাশয় ও মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র টিস্যু মডেল, আর ক্যানসার গবেষণার জন্য নানা মডেল।
আজকের দিনে সবচেয়ে বেশি কাজে আসছে দ্বিতীয় শ্রেণিটিই। এসব মডেলে ক্ষত নিরাময় নিয়ে গবেষণা করা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গ মেরামতের পথ খোঁজা যায়, স্নায়ুতন্ত্রের রোগ নিয়ে কাজ করা যায়, ক্যানসার কোষের আচরণ পর্যবেক্ষণ করা যায়, আর মানবদেহের অনুরূপ পরিবেশে নতুন ওষুধের কার্যকারিতা নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা যায়।
অঙ্গের চেয়ে মডেল কেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ
প্রতিস্থাপনের জন্য ছাপা অঙ্গ শিরোনাম টানে, আর তা এখনো দূরের কথা: একটি কিডনিতে রক্তসঞ্চালনের জাল এমন সূক্ষ্মতায় বুনতে হয়, যা কোনো প্রিন্টার এখনো আয়ত্ত করতে পারেনি। টিস্যু মডেলগুলো চমকহীন, অথচ এখনই অনেক কিছু বদলে দিচ্ছে—কারণ ছাপা মানবটিস্যুতে ওষুধ পরীক্ষার বিকল্প হলো ভিন্ন শরীরতত্ত্বের কোনো প্রাণীতে, কিংবা মানুষের ওপরেই পরীক্ষা করা।
এ দেশে এর নির্দিষ্ট প্রাসঙ্গিকতা আছে। বাংলাদেশের ওষুধশিল্প যথেষ্ট বড়, কয়েক ডজন দেশে রপ্তানি হয়; এর প্রতিযোগিতামূলক দুর্বলতা উৎপাদনে নয়, পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রক-প্রমাণে। রপ্তানির আবেদনের পেছনে যে প্রাক-ক্লিনিক্যাল তথ্য লাগে, টিস্যু মডেল তার তুলনামূলক সস্তা একটি পথ। বায়োপ্রিন্টারসহ এবং ছাপা জিনিসটি বাঁচিয়ে রাখার দক্ষতাসহ কোনো বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাগার শিল্পটির জন্য আরেকটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির চেয়ে বেশি কাজে আসবে।
সৎ সতর্কবাক্যটি হলো: প্রিন্টারই সহজ অংশ। ব্যয়বহুল ও কঠিন অংশটি এর চারপাশের কোষ-চর্চা—কোষ বাঁচিয়ে রাখা, জীবাণুমুক্ত রাখা, আর যে অঙ্গ থেকে এসেছে তার মতো আচরণ করানো। এটি কেনার জিনিস নয়, গবেষণাগারের সক্ষমতা।
আজ কোথায় দাঁড়িয়ে
প্রযুক্তিটি কোন পর্যায়ে আছে, তা স্পষ্ট করে বলা দরকার। ছাপা ত্বকের গ্রাফট ও তরুণাস্থি কয়েকটি দেশে চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে কিংবা তার কাছাকাছি পৌঁছেছে। ছাপা পূর্ণাঙ্গ অঙ্গ নয়: বাধাটি রক্তনালির জাল—পুরু টিস্যুকে বাঁচিয়ে রাখে যে সূক্ষ্ম রক্তনালির ঘন নেটওয়ার্ক—আর প্রয়োজনীয় সূক্ষ্মতায় তা কেউ ছাপতে পারেননি।
তাই বায়োপ্রিন্টিং নিয়ে কোনো শিরোনাম দেখলে বাস্তবসম্মত প্রশ্নটি হলো, এটি দুটির কোনটির কথা বলছে। ‘গবেষকেরা হৃৎপিণ্ডের টিস্যু ছেপেছেন’ বলতে সাধারণত বোঝায় পাত্রে স্পন্দিত হওয়া ছোট একটি খণ্ড, যা সত্যিকারের অর্জন। এর মানে একটি হৃৎপিণ্ড নয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আরেকটি কথা যোগ করা দরকার। এ ধরনের গবেষণাগার গড়ে তুলতে যন্ত্রের চেয়ে বেশি লাগে ধারাবাহিক তহবিল—কোষ বাঁচিয়ে রাখার কাজ এক দিনও থামানো যায় না। প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়নে যা হয়, তা হলো যন্ত্র কেনা হয়, প্রকল্প শেষ হয়, আর যন্ত্রটি পড়ে থাকে। সিদ্ধান্তটি তাই কেনার নয়, চালিয়ে যাওয়ার।
নৈতিক দিকটিও আলোচনার বাইরে রাখা যায় না। ছাপা টিস্যুর জন্য কোষ আসে কোথা থেকে, দাতার সম্মতি কীভাবে নেওয়া হয়, আর গবেষণাগারে বেড়ে ওঠা মানবটিস্যুর ওপর কার অধিকার—এ প্রশ্নগুলোর উত্তর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম। বাংলাদেশে এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কাঠামো এখনো নেই, আর গবেষণা শুরুর আগেই তা থাকা ভালো, পরে নয়।




