এক বছর আগে, দীর্ঘ অসুস্থতার পর মারা যান এস এম কামাল। তিনি যে শিল্প গড়তে সাহায্য করেছেন, আজ সেখানে কাজ করা বেশির ভাগ মানুষের কাছে তাঁর নাম তেমন কিছু বোঝাবে না — আর এই লেখার কারণও সেটিই।
জীবনের রূপরেখাটি তাঁর মৃত্যুর সময়েই লেখা হয়েছে, এখানে তা আবার বলার দরকার নেই: ফরিদপুরে শৈশব, ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রথম এমবিএ ব্যাচ, আর ১৯৬৮ সালে আইবিএমের চাকরি — ওই দশকে যা ছিল এমন একটি সুযোগ, তাঁর সমসাময়িকদের বেশির ভাগই যা লুফে নিতেন। তিনি বরং দেশে ফিরেছিলেন। তিনি বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন ও এর প্রথম সভাপতি হন, পরে বেসিস-এরও সভাপতি হন — দুটিরই নেতৃত্ব দেওয়া মানুষ খুব কম।
জীবনী যা এক বাক্যে গুটিয়ে ফেলে, তা হলো মাঝের ত্রিশ বছর — আর এই লেখার বিষয় সেটিই: তিনি কে ছিলেন তা নয়, তিনি আসলে কী বদলেছিলেন, আর কেউ তা দেখতে পায় না কেন।
তিনটি লড়াই, আর প্রতিটি যা করেছিল
তাঁকে নিয়ে প্রথম বইটি যিনি লিখেছেন, সেই সহকর্মী দীর্ঘ লড়াইগুলোর কথা মনে করেন। আলাদাভাবে প্রতিটিই প্রশাসনিক খুঁটিনাটি শোনায়। প্রতিটিই কিছু একটা ঠিক করে দিয়েছিল।
কম্পিউটারে আমদানি শুল্ক। কম্পিউটার আমদানি করা পণ্য, আর উচ্চ শুল্ক এর দাম কয়েক শতাংশ বাড়ায় না — গুণ করে দেয়। বাস্তব ফল হলো, বিদেশে যে যন্ত্র মধ্যবিত্ত পরিবারের নাগালে, এখানে তা বিলাসদ্রব্য; অর্থাৎ যাঁরা প্রোগ্রামার হতেন, তাঁরা কোনো দিন একটিতে হাতই দিতেন না। কাজেই কম্পিউটারের শুল্ক বাণিজ্যের প্রশ্ন নয়, এক দশকের বিলম্ব-সহ শিক্ষার প্রশ্ন: কোনো এক বছরে পিসির দাম ঠিক করে দেয় দশ বছর পর কারা দক্ষ হবেন। এটি তুলে দেওয়াই এই তালিকার সবচেয়ে কম দৃশ্যমান ও সবচেয়ে ফলদায়ক কাজ।
স্কুলের পাঠ্যক্রমে অপারেটিং সিস্টেম। একে কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষপাত বলে ভুল পড়া সহজ, আর বিষয়টি নিজের শর্তে বোঝা দরকার। এর আগে স্কুলে কম্পিউটার শিক্ষা ছিল বিমূর্ত — এমন একটি যন্ত্রের তত্ত্ব, যা শিক্ষার্থীরা ছুঁয়েও দেখেনি আর চালাতেও পারত না। অফিসে গিয়ে তারা যে ব্যবস্থার মুখোমুখি হবে সেটিই শেখানোয় পাস করার বিষয়টি হয়ে উঠল হাতে থাকা দক্ষতা। সাধারণ নীতিটিই কাজের অংশ: যে পাঠ্যক্রম সরঞ্জাম ছাড়া ধারণা শেখায়, তা এমন স্নাতক তৈরি করে যাঁরা যে কাজ করতে পারেন না তার বর্ণনা দিতে পারেন — আর মন্ত্রণালয়ের অনেক আগেই নিয়োগদাতারা তা টের পান।
ভিস্যাট স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের অনুমতি। সবচেয়ে কারিগরি, আর সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী। বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্লে যুক্ত হওয়ার আগে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের একমাত্র পথ ছিল স্যাটেলাইট — ব্যয়বহুল, সীমিত ও কড়া নিয়ন্ত্রণে। ব্যক্তিগত স্যাটেলাইট সংযোগের অনুমতি না থাকা পর্যন্ত স্বাধীন ইন্টারনেট সেবাদাতা থাকতে পারত না; আর সেবাদাতা না থাকলে ডেটা-এন্ট্রি শিল্প, আউটসোর্সিং বা ইমেইলভিত্তিক বাণিজ্য — কিছুই থাকত না। ভিস্যাটের অনুমতি ইন্টারনেট সস্তা করেনি। এটি ইন্টারনেটকে বিক্রয়যোগ্য করেছে — আর যেখানে বাজার ছিল না সেখানে বাজার তৈরির ধাপ এটিই।
হাতিয়ার হিসেবে বাণিজ্য সংগঠনই কেন
প্রশ্নটি করা দরকার: যিনি কম্পিউটার শিল্প চেয়েছিলেন, তিনি কোম্পানি গড়ার বদলে জীবনটা সংগঠনে কাটালেন কেন।
নীতিমালা লিখতে বসা মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ করার মতো কাউকে দরকার। যেখানে শিল্পের কোনো সংগঠন নেই, সেখানে ভূমিকাটি গিয়ে পড়ে ঘরে যিনি উপস্থিত তাঁর ওপর — একজন বড় আমদানিকারক, ঢাকায় অফিস থাকা কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান, কিংবা কেউ নন; আর তখন বিধি লেখেন এমন মানুষ যাঁরা পণ্যটি কখনো ব্যবহার করেননি। এর ফল দুর্নীতির চেয়ে বেশি অনুপস্থিতি: এমন নীতি তৈরি হয় যা কোনো পেশাজীবী লিখতেন না, আর পরে তা বাতিল করা কঠিন।
সংগঠন এটি বদলে দেয় দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি স্থায়ী প্রতিপক্ষ তৈরি করে। কাজটি ধীর, জৌলুসহীন, আর এতে কোনো মালিকানা নেই — আর তরুণ অর্থনীতিতে প্রায়ই এটিই আসল বাধা: পুঁজি নয়, মেধা নয়, বরং রাষ্ট্র যাঁর সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারে এমন কারও অনুপস্থিতি।
এ কারণেই ওপরের প্রতিটি লড়াইয়ে বছরের পর বছর লেগেছে। প্রতিটির মানে ছিল এমন আমলা ও মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক যাঁরা বিষয়টির মানেই বুঝতেন না, আর বেশির ভাগ বৈঠক ভালো যেত না। তাঁর সহকর্মী স্বীকার করেন, ঘরে থাকা তরুণেরা মেজাজ হারাতেন আর হাল ছেড়ে দিতেন। কামাল মেজাজ ধরে রাখতেন, লক্ষ্য ধরে রাখতেন, আর পরের সপ্তাহে আবার ফিরে আসতেন।
এ ধরনের কাজ হারিয়ে যায় কেন
জীবদ্দশায় তাঁর কাজ যে স্বীকৃতির যোগ্য ছিল, শিল্প বা রাষ্ট্র কেউই তা দেয়নি — আর এর পেছনে অকৃতজ্ঞতার বাইরেও একটি কাঠামোগত কারণ আছে।
অবকাঠামোর কাজ গড়নের দিক থেকেই অদৃশ্য। সফল কোম্পানি গড়া প্রতিষ্ঠাতার হাতে থাকে তাঁর নামে একটি কোম্পানি। আর যিনি একটি শুল্ক তুলিয়ে দেন, তিনি তৈরি করেন একটি অনুপস্থিতি — এমন একটি খরচ যা আর নেই — আর অনুপস্থিতির দিকে কেউ আঙুল তুলতে পারে না। উপকারটি বাস্তব, ছড়ানো, আর তা গিয়ে পড়ে এমন মানুষের ওপর যাঁরা কখনো জানবেনই না যে কেউ এর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
এই একই অসমতা ব্যাখ্যা করে, সর্বত্রই নীতিকাজের জোগান কেন দীর্ঘস্থায়ীভাবে কম। এর প্রতিদান বড়, বিলম্বিত, কিছুই না করা প্রতিযোগীদের সঙ্গেও ভাগ হয়ে যায়, আর এর কৃতিত্ব দাবি করা অসম্ভব। কাজটি করেন তাঁরাই, যাঁরা কৃতিত্ব আশা করছিলেন না — আর সরকারের সঙ্গে একটি শিল্পের সম্পর্ক চালানোর ভিত্তি হিসেবে এটি বড্ড পাতলা।
এ নিয়ে যা করা দরকার
শুল্কমুক্ত ল্যাপটপ, মন্ত্রণালয়ের উদ্ধৃত সফটওয়্যার রপ্তানির অঙ্ক, মন্ত্রীকে যে বাণিজ্য সংগঠনের সঙ্গে বসতেই হয় — এগুলো তাঁরই অবকাঠামো, আর দেশ তার ওপর দিয়ে হাঁটে এটি কার তা না জেনেই।
কাজের জবাবটি কোনো পুরস্কার নয়। জবাবটি একটি নথি। আশি ও নব্বইয়ের দশকে যাঁরা ওই বৈঠকগুলোতে বসেছিলেন, তাঁদের বয়স এখন সত্তর-আশি, আর হাতে গোনা কয়েকটি স্মৃতিকথা ছাড়া তাঁদের কাজের প্রায় কিছুই লিখিত আকারে নেই। সিদ্ধান্তগুলো নথিভুক্ত আছে ফলাফল হিসেবে — শুল্কের হার বদলেছে, লাইসেন্সের শ্রেণি তৈরি হয়েছে — কিন্তু কে সেগুলোর পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন আর যুক্তিটি কী ছিল, তার কোনো বিবরণ নেই। এটি এখন উদ্ধার করা সম্ভব, দশ বছর পর হবে না।
মৃত্যুর এক বছর পর বাস্তব কথাটি এটিই: স্বীকৃতি তাঁর প্রাপ্য, আর স্বীকৃতির চেয়ে ভালো স্মারক হলো নথিটি — কারণ যাঁরা সেখানে ছিলেন, তাঁদের কাছ থেকে এটি এখনো সংগ্রহ করা যায়।




