প্রযুক্তি

বাংলাদেশে প্রথমবার চালু হলো স্টারলিংক—বিনিয়োগ সম্মেলনে ২২০ এমবিপিএস, আর যে প্রশ্নের উত্তর স্টলের কেউ দিতে পারলেন না

ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাংলাদেশ বিনিয়োগ সম্মেলনের দর্শনার্থীরা স্যাটেলাইট কোম্পানির স্টলে কিউআর কোড স্ক্যান করে প্রথমবার স্টারলিংকের স্বাদ পেলেন: ফোনে ১৭০ থেকে ২২০ এমবিপিএস, একসঙ্গে প্রায় ৪৫ জন যুক্ত। সেবাটির এখন বিডার নিবন্ধন আছে, চালুর জন্য ৯০ কার্যদিবস। পরীক্ষা কী দেখাল, আর কী দেখাল না—প্রধানত দাম।

বাংলাদেশে প্রথমবার চালু হলো স্টারলিংক—বিনিয়োগ সম্মেলনে ২২০ এমবিপিএস, আর যে প্রশ্নের উত্তর স্টলের কেউ দিতে পারলেন না

হালনাগাদ, অক্টোবর ২০২৬ — এই প্রতিবেদনটি ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত, যখন কবে আর কত দামে—এই দুটি প্রশ্নের উত্তর জানা ছিল না। দুটিরই উত্তর মিলেছে, আর দামই ঠিক করে দিয়েছে সেবাটি কাদের জন্য। উত্তর দুটি মূল প্রতিবেদনের নিচে।

এ সপ্তাহে কয়েক দিন ঢাকার সবচেয়ে দ্রুত ইন্টারনেট সংযোগ ছিল একটি মেলার স্টলে। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ সম্মেলনে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড তাদের স্টলে একটি স্টারলিংক টার্মিনাল আর পাশে একটি কিউআর কোড রাখে, আর যে কেউ স্ক্যান করে স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড ব্যবহার করতে পেরেছেন—দেশে সেবাটি চালু হওয়ার প্রথম ঘটনা।

পরীক্ষা যা দেখাল

ফোনে চেষ্টা করা জাহিদুর রাব্বী প্রথম আলোকে বলেন, একসঙ্গে প্রায় ৪৫ জন যুক্ত থাকা অবস্থায় ফাস্টডটকমে মাপা গতি ১৭০ থেকে ২২০ এমবিপিএস। সেটি একটি বাসাবাড়ির টার্মিনাল, ভিড়ে ভাগ করা, তবু রাজধানীতে বিক্রি হওয়া বেশির ভাগ ফাইবার প্যাকেজের চেয়ে দ্রুত। সংযোগটি স্থানীয় অবকাঠামোর বদলে গেছে স্টারলিংকের মালয়েশিয়ার গেটওয়ে হয়ে—কোনো দেশে গ্রাউন্ড স্টেশন হওয়ার আগে কোম্পানি এভাবেই সেবা দেয়। সম্মেলন প্রাঙ্গণজুড়ে কাভারেজ ছিল, আর রিসিভার, রাউটার ও বসানোর যন্ত্রাংশ প্রদর্শিত হচ্ছিল।

যা দেখাল না

সম্মেলনে আসা প্রযুক্তি পেশাজীবী জারিফ ফাইয়াজ অনুপস্থিত অংশটি সরাসরি বললেন: স্টলের কেউ বলতে পারলেন না সেবাটি বাসাবাড়িতে কবে মিলবে, বা খরচ কত হবে। জরুরি প্রশ্ন এই দুটোই, আর এখনো এগুলোর মীমাংসা হয়নি। মীমাংসা হয়েছে কাগজপত্রের। স্টারলিংক ২৯ মার্চ বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থেকে বিনিয়োগ নিবন্ধন পেয়েছে, কার্যক্রম শুরুর জন্য ৯০ কার্যদিবস, আর সরকার বলেছে, সেবাটি দ্রুত চালু চায়।

দামের একটি অনুমান

নিকটতম তুলনা ভুটান, যেখানে স্টারলিংক এ বছরের শুরুতে চালু হয়েছে: আবাসিক সেবা মাসে ৪ হাজার ২০০ গুলট্রাম, প্রায় ৫ হাজার ৮০০ টাকা, সঙ্গে যন্ত্রের কিট, যা বেশির ভাগ বাজারে কয়েক শ ডলারে বিক্রি হয়। এটি ঢাকার সাধারণ ব্রডব্যান্ড লাইনের দশ গুণ দাম, আর একটি ছোট অফিসের ডেডিকেটেড সংযোগের তুলনীয়। এই সংখ্যায় স্টারলিংক বাংলাদেশে গণভোক্তার পণ্য হবে না। হবে সেই জায়গার পণ্য, যেখানে ফাইবার কখনো পৌঁছায়নি—হাওর, পাহাড়ি জেলা, চর, গভীর সমুদ্রের জাহাজ—আর সেই প্রতিষ্ঠানের, যাদের এমন সংযোগ দরকার, যা কোনো স্থানীয় অপারেটর, কোনো স্থানীয় বন্ধের আদেশ নিভিয়ে দিতে পারে না।

এরপর কী দেখার

তিনটি জিনিসে নজর রাখুন: বিটিআরসির লাইসেন্সের শর্তে স্থানীয় গেটওয়ে বাধ্যতামূলক হয় কি না (হলে মালয়েশিয়া হয়ে যাওয়া বন্ধ হবে, আর তদারকির প্রশ্ন উঠবে), আবাসিক প্যাকেজের দাম ভুটানের নিচে নামে কি না, আর প্রথম কিটগুলো কারা পায়—ঢাকার প্রযুক্তিপ্রেমীরা, নাকি সুনামগঞ্জের হাওরের স্কুল। উত্তরগুলো বলে দেবে, এটি বিলাসদ্রব্য হবে নাকি অবকাঠামো।

উত্তর দুটি

কবে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল স্টারলিংককে পরিচালন লাইসেন্স দেয়, আর সেবাটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় ১৮ জুলাই ২০২৫—অর্থাৎ এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ৯০ কার্যদিবসের মধ্যেই। এর জন্য বিটিআরসিকে ভূস্থির নয় এমন কক্ষপথের (এনজিএসও) জন্য একেবারে নতুন একটি লাইসেন্সিং কাঠামো দাঁড় করাতে হয়, আর তা করা হয় কয়েক সপ্তাহে।

কত দামে। আবাসিক গ্রাহকের জন্য দুটি প্যাকেজ: স্টারলিংক রেসিডেনশিয়াল মাসে ৬ হাজার টাকা আর রেসিডেনশিয়াল লাইট ৪ হাজার ২০০ টাকা—দুটিতেই আনলিমিটেড ডেটা, গতি ৩০০ এমবিপিএস পর্যন্ত। সঙ্গে যন্ত্রপাতি ও স্থাপনের এককালীন খরচ ৪৭ হাজার টাকা।

ভূ-অবকাঠামোও এসেছে, অর্থাৎ ওপরে বর্ণিত মালয়েশিয়ার গেটওয়ে হয়ে যাওয়ার বন্দোবস্ত স্থায়ী হয়নি: গাজীপুরের কালিয়াকৈরে হাই-টেক সিটিতে স্থাপনা হয়েছে, আরও সাইট হয়েছে রাজশাহী ও যশোরে।

দামের উত্তরটি গতি-পরীক্ষার প্রশ্নটিকে কীভাবে মিটিয়ে দেয়

পরীক্ষায় ৪৫ জন একসঙ্গে থাকা অবস্থায় ১৭০ থেকে ২২০ এমবিপিএস উঠেছিল। সংখ্যাটি সত্যিই চমকপ্রদ, আর শেষ বিচারে অপ্রাসঙ্গিক।

এরপরের প্রতিবেদনগুলোতে সেবাটিকে একদিকে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে দ্রুত সাড়া দেওয়া সংযোগগুলোর একটি বলা হয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ পরিবারের নাগালের বাইরে। দুটিই সত্য, কারণ দুটি একই তথ্যের দুই পিঠ: স্যাটেলাইট সংযোগকে যে ধারণক্ষমতা দ্রুত করে, তা ব্যয়বহুল, তা ঘনবসতির স্থানীয় নেটওয়ার্কের সঙ্গে ভাগ হয় না, আর তার দাম দিতে হয় যিনি ব্যবহার করছেন তাঁকেই।

৪৭ হাজার টাকার প্রারম্ভিক খরচই ঠিক করে দেয় পণ্যটি কার জন্য। মাসিক ফি ফাইবারের প্যাকেজের সঙ্গে তুলনা করা যায়; কিন্তু এককালীন এই অঙ্কটি সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের সিদ্ধান্ত, আর তা দিতে হয় সেবা শুরুর আগেই।

তাহলে এটি আসলে কাদের জন্য

দামটিকে “সস্তা হতে না পারার ব্যর্থতা” হিসেবে না পড়ে উদ্দিষ্ট গ্রাহকের বর্ণনা হিসেবে পড়লে পণ্যটি অর্থবহ হয়।

স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড ঢাকার ফাইবার লাইনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে না। এটি প্রতিযোগিতা করছে কোনো সংযোগ না থাকার সঙ্গে—হাওর, পাহাড়ি জেলা, চর, গভীর সমুদ্রের জাহাজ, আর দুর্যোগে যেখানে স্থল নেটওয়ার্ক বসে যায়। যে স্কুল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে বিকল্প হলো কিছুই না, তার কাছে ৪৭ হাজার টাকা অসম্ভব অঙ্ক নয়, বিশেষ করে ভাগাভাগি করা গেলে।

প্রতিষ্ঠানের জন্য আরেকটি হিসাব আছে: এমন সংযোগ, যা কোনো স্থানীয় অপারেটরের ওপর নির্ভর করে না। ২০২৪ সালের ইন্টারনেট বন্ধের অভিজ্ঞতার পর এ দেশে এই বৈশিষ্ট্যটির দাম আলাদা—যদিও লাইসেন্স ও দেশের ভেতরের গেটওয়ে থাকার মানে, স্থানীয় নির্দেশের বাইরে এটি পুরোপুরি নয়।

এখন যা দেখার

পুরোনো তিনটি প্রশ্নের উত্তর মিলে যাওয়ার পর নতুন প্রশ্নগুলো ভিন্ন: গ্রাহকসংখ্যা কত দাঁড়ায় আর তাঁরা কোথায়; এককালীন খরচ কমে কি না, কিংবা ভাড়ায় যন্ত্র নেওয়ার সুযোগ আসে কি না; আর প্রতিষ্ঠান বা স্থানীয় সরকার মিলে একটি সংযোগ ভাগ করে নেওয়ার কোনো বৈধ কাঠামো তৈরি হয় কি না। শেষেরটিই ঠিক করবে এটি কয়েক হাজার সংযোগ থাকবে, না কি সত্যিই অবকাঠামো হয়ে উঠবে।

সূত্র: Prothom Alo

লিখেছেন

Mahbub Rabbani

টেক বিডিতে ভোক্তা প্রযুক্তি নিয়ে লেখেন মাহবুব রব্বানী — ফোন, অ্যাপ, অপারেটিং সিস্টেম আর দেশের বেশির ভাগ মানুষের প্রতিদিনের প্ল্যাটফর্ম। সাইটের কীভাবে-করবেন নির্দেশিকাগুলো তাঁর লেখা; কোনো পণ্যকে তিনি মাপেন কেনার খরচ দিয়ে নয়, ব্যবহারের খরচ দিয়ে।