প্রযুক্তি

অস্ট্রেলিয়ার চাকরি ফিরিয়ে কাকরকান্দি গ্রাম থেকে ডলার আয় করেন তৃষ্ণা দিও; প্রতিপক্ষ শুধু লোডশেডিং

এমবিএ, ঢাকায় অপছন্দের এইচআর চাকরি, ময়মনসিংহে গ্রাফিকসের কোর্স, ৮৬ ডলারের প্রথম কাজ, আর এখন শেরপুরের গারো গ্রাম থেকে মাসে ৬০ থেকে ৮৬ হাজার টাকা। বিদ্যুৎ থাকলে, তাঁর হিসাবে, দুই লাখ।

অস্ট্রেলিয়ার চাকরি ফিরিয়ে কাকরকান্দি গ্রাম থেকে ডলার আয় করেন তৃষ্ণা দিও; প্রতিপক্ষ শুধু লোডশেডিং

"গত মাসে আয় করেছি ৮৬ হাজার টাকা," ২০২২ সালের আগস্টের এক শনিবার ময়মনসিংহে বললেন তৃষ্ণা দিও। "কখনো ষাট হাজারের কম হয় না। কিন্তু গ্রামে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, আইপিএস দিয়েও ল্যাপটপ এত সময় চালানো যায় না। বিদ্যুৎ থাকলে মাসে দুই লাখ টাকা আয় হতো।" কথাটা তিনি বললেন গর্বের চেয়ে বেশি আক্ষেপে—তাতেই বোঝা যায় তিনি কেমন ফ্রিল্যান্সার।

ঢাকার এইচআর থেকে শেরপুরের উঠান

গারো সম্প্রদায়ের দিও বড় হয়েছেন ভারত সীমান্তের কাছে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার কাকরকান্দি ইউনিয়নে। ২০১৯ সালে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ থেকে এমবিএ শেষ করে ঢাকায় মানবসম্পদ বিভাগে চাকরি নেন। কাজ ভালো লাগেনি, ছাড়লেন, বাড়ি ফিরলেন, মাসের পর মাস জীবনবৃত্তান্ত পাঠালেন—সাড়া নেই। তখন পরিচিত একজন বললেন, ফ্রিল্যান্সিং করে আয় করা যায়। গারো ফ্রিল্যান্সার সুবীর নকরেকের গড়া ময়মনসিংহের নকরেক আইটি ইনস্টিটিউটে গ্রাফিক ডিজাইন কোর্সে ভর্তি হলেন; ক্লাসের জন্য প্রতি শুক্র ও শনিবার গ্রাম থেকে ময়মনসিংহ।

শেষ করার ছয় মাস পর প্রথম কাজ: ৮৬ ডলার। কাজ পছন্দ হওয়ায় সেই গ্রাহক দিলেন আরও সাতটি। আজ তিনি বিদেশি ক্লায়েন্টের জন্য পোস্টার, বিজনেস কার্ড, সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন, পরিচয়পত্র, রেস্তোরাঁর মেনু, প্রচারপত্র ডিজাইন করেন। "বাংলাদেশের এক গ্রাহক একটা নকশা ১৭ বার বদলিয়েছিলেন," তাঁর কথা। "ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা বাড়ল, ভালো অর্ডার এল, আয়ও বাড়ল।"

যে চাকরি ফিরিয়ে দিলেন

অস্ট্রেলিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান সরাসরি চাকরি দিল, স্পনসরও প্রস্তুত। বাবা করলেন সেই প্রশ্ন, যা সব ঠিক করে দিল: "গ্রামে বসেই যদি আয় করতে পারো, অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে লাভ কী?" তিনি রয়ে গেলেন। যে গ্রাম কানাঘুষা করত—সারা দিন কম্পিউটারের সামনে বসে থাকা মেয়েটি কী করে, তাতে কি টাকা হয়—সে প্রশ্ন থেমে গেছে। এরপর তিনি কাকরকান্দির তরুণদের প্রশিক্ষণ দিতে চান।

যে প্রতিপক্ষ ইন্টারনেট নয়

ফেব্রুয়ারিতে প্রথম আলোর বলা মধুপুরের ফ্রিল্যান্সারদের মতো নয়, দিওর সমস্যা সিগন্যাল নয়। বিদ্যুতের গ্রিড। গ্যাসসংকটে ২০২২ সালের জুলাই থেকে বাংলাদেশে সময়সূচি ধরে লোডশেডিং শুরু হয়, আর নালিতাবাড়ীর মতো গ্রামীণ উপজেলায় সবচেয়ে লম্বা বিরতি—দিনে কয়েক ঘণ্টা। ফ্রিল্যান্সারের জন্য হিসাবটা নির্মম: সিডনির বিকেলের ডেডলাইনের মাঝখানে দুই ঘণ্টার বিরতি মানে হারানো ক্লায়েন্ট। আইপিএস কিছুক্ষণ ল্যাপটপ চালায়; পাঁচ ঘণ্টার বিদ্যুৎহীনতায় রাউটার, মনিটর আর ফ্যান চালায় না। তাঁর দুই লাখ টাকার হিসাবটাই গ্রামীণ বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা যা আছেন আর যা হতে পারতেন, তার ফারাকের মাপ।

হালনাগাদ: এই প্রতিবেদনের এক সপ্তাহের মধ্যে স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিস কাকরকান্দির লোডশেডিংয়ের সময়সূচি বদলায়, আর অক্টোবরে আইসিটি বিভাগের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ল্যাপটপ পান দিও।

সূত্র: Prothom Alo

লিখেছেন

Miraj S

টেক বিডিতে প্রযুক্তির ব্যবসা নিয়ে লেখেন মিরাজ এস — বাংলাদেশের প্রযুক্তি অর্থনীতি, ই-কমার্স, টেলিকম, যন্ত্রাংশের দাম আর সেগুলোর পেছনের নীতিগত সিদ্ধান্ত। ঢাকার বাজারদরের নিয়মিত হিসাব তিনিই রাখেন—অর্থাৎ ভুল হলে সঙ্গে সঙ্গেই তা তাঁকে জানানো হয়।