হালনাগাদ, অক্টোবর ২০২৬ — মাইলসের হামিম আহমেদ ও মানাম আহমেদের করা মামলাটি অভিযোগ গঠনের আগেই প্রত্যাহার করা হয়। কেন এ ধরনের মামলা শিল্পীর জন্য দুর্বল হাতিয়ার, তা মূল প্রতিবেদনের নিচে।
দেশের তৃতীয় বৃহত্তম মোবাইল অপারেটর বাংলালিংকের বিরুদ্ধে কপিরাইট আইনে মামলা করেছেন জনপ্রিয় রক ব্যান্ড মাইলসের দুই সদস্য।
ব্যান্ডের ভোকালিস্ট হামিন আহমেদ ও কীবোর্ডিস্ট মানাম আহমেদ রোববার ঢাকা মেট্রোপলিটন সেশন জজ কোর্টে এ মামলা দায়ের করেন।
কপিরাইট আইন ২০০০-এর ৭১, ৮২ ও ৯১ ধারায় মামলাটি করা হয়েছে।

এ মামলায় বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশনস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এরিক অস, চিফ কমপ্লাইয়েন্স অফিসার এম নুরুল আলম এবং চিফ ডিজিটাল অফিসার সঞ্জয় ভাঘাসিয়াকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
অভিযোগটি কী
মাইলসের অভিযোগ, "নীলা", "ফিরিয়ে দাও"-এর মতো ব্যান্ডটির গান বছরের পর বছর বাংলালিংকের ওয়েলকাম টিউন, রিংটোন ও অন্যান্য মোবাইল কনটেন্ট হিসেবে বিক্রি হয়েছে, অথচ গানের স্বত্বাধিকারী হিসেবে ব্যান্ডের অনুমতি নেওয়া হয়নি বা রয়্যালটি দেওয়া হয়নি। কপিরাইট আইন ২০০০-এর ৭১ ধারা মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন, ৮২ ধারা তার শাস্তি আর ৯১ ধারা লঙ্ঘন করে বাণিজ্যিক ব্যবহারের বিষয়ে। একই সপ্তাহে সংগীতশিল্পী জেমসও একই অভিযোগে বাংলালিংকের বিরুদ্ধে আদালতে যান।
প্রেক্ষাপট
মোবাইল অপারেটরদের কলার টিউন ব্যবসা দুই হাজারের দশক থেকে বছরে শত কোটি টাকার। গান আসত "কনটেন্ট অ্যাগ্রিগেটর" নামের মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে, যারা লাইসেন্স থাকার দাবি করত; শিল্পীদের অভিযোগ, সেই চেইনের কোথাও তাঁদের হিস্যা পৌঁছায়নি। বাংলাদেশে সংগীতের কপিরাইট নিয়ে মামলা বিরল বলে মাইলস ও জেমসের মামলা দুটি শিল্পের জন্য পরীক্ষার মামলা হয়ে ওঠে।
শিল্পীর প্রাপ্য কীভাবে হিসাব হয়
কপিরাইট আইনে গানের স্বত্ব তিন ভাগে: গীতিকারের কথা, সুরকারের সুর আর শিল্পীর পরিবেশনা। মাইলসের বেশির ভাগ গানের কথা ও সুর ব্যান্ডের সদস্যদের নিজেদের, তাই তিন স্বত্বই ব্যান্ডের—যে কারণে তারা সরাসরি বাদী হতে পেরেছে। কোনো কোম্পানি গান বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করতে চাইলে স্বত্বাধিকারীর লিখিত অনুমতি লাগে এবং প্রতিটি বিক্রি বা ব্যবহারের ভিত্তিতে রয়্যালটি দিতে হয়। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন এই হিসাব রাখা হতো না; শিল্পী এককালীন টাকায় গান রেকর্ড করতেন, আর পরের সব আয় যেত প্রযোজক বা অ্যাগ্রিগেটরের কাছে। ২০২৩ সালের কপিরাইট আইনে রয়্যালটি সংগ্রহ ও বণ্টনের জন্য সমিতি গঠনের বিধান আসে, যা এই ফাঁক বন্ধের প্রথম আইনি কাঠামো।
এরপর যা হলো
হালনাগাদ, সেপ্টেম্বর ২০২৬। বাংলালিংক জানায়, তারা লাইসেন্সধারী অ্যাগ্রিগেটরের কাছ থেকে কনটেন্ট নিয়েছে এবং শিল্পীদের সঙ্গে মীমাংসায় প্রস্তুত; বিষয়টি পরে আলোচনার টেবিলে যায়। স্থায়ী পরিবর্তন আসে আইনে: ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে পাস হওয়া কপিরাইট আইন ২০২৩ ডিজিটাল মাধ্যমে গানের ব্যবহার, রয়্যালটি বণ্টন ও মধ্যস্বত্বভোগীর দায় নিয়ে স্পষ্ট ধারা আনে—যে ফাঁক নিয়ে এই মামলাগুলো হয়েছিল, তা বন্ধ করতে।
এরপর যা হলো
মাইলসের হামিম আহমেদ ও মানাম আহমেদ ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতে মামলাটি করেছিলেন। বাংলালিংকের চার শীর্ষ কর্মকর্তা আত্মসমর্পণ করে প্রথমে অন্তর্বর্তী, পরে স্থায়ী জামিন পান। অভিযোগ গঠনের শুনানির আগেই মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়; আদালতে মানাম আহমেদ বলেন, এটি হয়েছিল ভুল বোঝাবুঝি থেকে।
শিল্পীর হাতে কপিরাইট মামলা কেন দুর্বল হাতিয়ার
ফল যা-ই হোক, এ ধরনের বিরোধে কাঠামোগত অসাম্যটি থেকেই যায়, আর তা বাংলাদেশের বাইরেও সমান সত্যি।
প্রমাণের ভার পুরোটাই শিল্পীর। কোন গান, কোন সেবায়, কত দিন, কতবার ব্যবহৃত হয়েছে—তা দেখাতে হয় তাঁকেই। অথচ ওই ব্যবহারের হিসাব থাকে কেবল অপারেটরের ব্যবস্থায়। যিনি অভিযোগ করছেন, প্রমাণের উপকরণ তাঁর হাতে নেই।
সময় ও খরচ অসম। একটি টেলিকম প্রতিষ্ঠানের আইন বিভাগ আছে, যার জন্য মামলাটি নিয়মিত কাজের অংশ। সংগীতশিল্পীর জন্য এটি বছরের পর বছরের ব্যক্তিগত ভার।
জয় মানে ব্যবস্থা বদল নয়। একটি মামলায় জিতলে ওই গানগুলোর ওই ব্যবহারটি নিষ্পত্তি হয়। পরের বছর, পরের শিল্পীর জন্য আবার শুরু থেকে।
যা এর বিকল্প
যেসব দেশে এ সমস্যা কমেছে, সেখানে সমাধান এসেছে মামলা থেকে নয়—সম্মিলিত ব্যবস্থাপনা থেকে। একটি সংস্থা শিল্পীদের হয়ে অধিকার সামলায়, ব্যবহারকারীদের সঙ্গে একবারে লাইসেন্স চুক্তি করে, ব্যবহারের হিসাব সংগ্রহ করে আর আদায় করা অর্থ বণ্টন করে।
এতে তিনটি সমস্যাই একসঙ্গে মেটে: হিসাব আসে চুক্তির শর্ত হিসেবে, খরচ ভাগ হয়ে যায় সবার মধ্যে, আর নিষ্পত্তি হয় পুরো তালিকার জন্য—একটি গানের জন্য নয়।
এ মামলার সবচেয়ে কাজের পাঠ তাই ফলাফল নয়। ২০০৭ থেকে ২০২১—চৌদ্দ বছরের অভিযোগ আদালতে পৌঁছানোই দেখিয়ে দেয়, নিয়মিত হিসাব আর আদায়ের কোনো ব্যবস্থা কাজ করছিল না। মামলা প্রত্যাহার সেই ঘাটতিটিকে স্পর্শও করেনি।




