হালনাগাদ, অক্টোবর ২০২৬ — ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি অপরিবর্তিত। অভিযোগে যে বিবরণটি সবচেয়ে কম নজর কাড়ে—ফেরত আসা চেক—আইনগতভাবে সেটিই ছিল সবচেয়ে শক্ত জিনিস। কেন, তা মূল প্রতিবেদনের নিচে।
এক গ্রাহকের দায়ের করা মামলায় ইভ্যালির সিইও মোহাম্মদ রাসেল ও চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন গ্রেপ্তার হওয়ার দু'দিন পর এই দম্পতি ও তাদের মালিকানাধীন বিতর্কিত ই-প্ল্যাটফর্মের আরও ২৫ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এবার এক সাপ্লাইয়ার মামলা করেছেন।
'সাপ্লাইয়ার কামরুল ইসলাম চাকলাদার রাজধানীর ধানমন্ডি পুলিশ স্টেশনে শনিবার রাতে ৩৬ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলাটি করেন,' বলে রোববার সকালে জানিয়েছেন ধানমন্ডি জোনের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার আবদুল্লাহ আল মাসুম।
মামলায় ওই সাপ্লাইয়ার ইভ্যালির ১২ জন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ-সহ আরও ১৫-২০ জন অজ্ঞাতনামাকে অভিযুক্ত করেন।

মামলায় অভিযুক্ত অন্যরা হলেন- ইভ্যালির ভাইস প্রেসিডেন্ট আকাশ, ম্যানেজার জাহেদুল ইসলাম হেময়, সিনিয়র অ্যাকাউন্টস ম্যানেজার তানভীর আলম, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ কমার্সিয়াল জাওয়াদুল হক চৌধুরী, হেড অব অ্যাকাউন্টস সেলিম রেজা, অ্যাকাউন্টস ম্যানেজার জুবায়ের আল মাহমুদ, অ্যাকাউন্টস অফিসার সোহেল, আকিবুর রহমান তুর্য, রাসেলের পিএস মো. রেজওয়ান, বাইক ডিপার্টমেন্টের শাকিব রহমান।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ওই সাপ্লাইয়ারের কাছ থেকে প্রায় ৩৬ টাকার পণ্য নেওয়া হলেও পাওনা পরিশোধ করেনি ইভ্যালি।
জানুয়ারি পর্যন্ত কোনো টাকা দেওয়া না হলেও তাকে মে মাসে ৩০ জুন তারিখের একটি চেক দেওয়া হয়। চেকে উল্লেখিত অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় সেই চেক দুইবার 'বাউন্স' করে বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন ওই সাপ্লাইয়ার।
এ অবস্থায় তিনি ২৯ আগস্ট ইভ্যালির কাছে চিঠি পাঠালেও কোনো সাড়া পাননি। পরে ইভ্যালি তাকে জানায়, ৩০ দিনের মধ্যে তার পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হবে। তারপর থেকে ওই কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না তিনি।
এ প্রসঙ্গে গত ১২ জানুয়ারি ধানমন্ডি মডেল পুলিশ স্টেশনে একটি সাধারণ ডায়েরি দায়ের করা হলেও ইভ্যালির পক্ষ থেকে সাপ্লাইয়ারের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করা হয়নি। তিনি ইভ্যালির অফিসে গেলে তার সঙ্গে ওই প্ল্যাটফর্মের কর্মকর্তারা দুর্ব্যবহার করেন, এমনকি তাকে হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করেন কামরুল।
অর্থ আত্মসাৎ এবং হুমকির অভিযোগে ৪২০/৪০৬/৫০৬ ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।
এর আগে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাসেল ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গুলশান পুলিশ স্টেশনে একটি মামলা দায়ের করা হয়। এর কয়েক ঘণ্টা পর ওই দম্পতির মোহাম্মদপুরের বাসায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে র্যাব। তারা এখন তিনদিনের পুলিশ রিমান্ডে রয়েছেন।
এদিকে, রাসেল ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তারের পরদিন র্যাব এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, ইভ্যালির কাছে গ্রাহক ও সাপ্লাইয়ারদের পাওনা ১,০০০ কোটি টাকারও বেশি।
ফেরত আসা চেকটিই ছিল সবচেয়ে শক্ত অংশ
অভিযোগের ভেতরে একটি ছোট বিবরণ আছে: মে মাসে সরবরাহকারীকে দেওয়া হয় ৩০ জুন তারিখের একটি চেক, আর অ্যাকাউন্টে টাকা না থাকায় সেটি দুইবার ফেরত আসে।
বাংলাদেশে এটি কেবল অনাদায়ের প্রমাণ নয়। হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইনে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকা অবস্থায় দেওয়া চেক ফেরত এলে তা নিজেই একটি ফৌজদারি অপরাধ, যার জন্য আলাদা মামলা হয়। অর্থাৎ পাওনাদারকে প্রমাণ করতে হয় না যে প্রতারণার অভিপ্রায় ছিল—চেকটি ফেরত এসেছে, এটুকুই যথেষ্ট।
এ কারণেই সরবরাহকারীদের মামলাগুলো গ্রাহকদের মামলার চেয়ে দ্রুত এগোয়। গ্রাহককে দেখাতে হয় তিনি অগ্রিম দিয়েছেন ও পণ্য পাননি; সরবরাহকারীর হাতে থাকে একটি কাগজ, যা নিজেই অপরাধের প্রমাণ।
পাওনাদারদের সারিতে কে কোথায়
ধসে পড়া একটি প্ল্যাটফর্মে দুই ধরনের পাওনাদার থাকেন, আর তাঁদের অবস্থান এক নয়।
সরবরাহকারী পণ্য দিয়েছেন বাকিতে—তাঁর কাছে চালান, চুক্তি, কখনো চেক থাকে। গ্রাহক টাকা দিয়েছেন আগে—তাঁর কাছে থাকে কেবল একটি অর্ডার নম্বর। কাগজে সরবরাহকারীর অবস্থান তাই শক্ত।
বাস্তবে অবশ্য দুই পক্ষের ফল প্রায় একই হয়েছে, কারণ দায় সম্পদের বহু গুণ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। শক্ত কাগজ থাকা মানে আদালতে ভালো অবস্থান; তা মানে এই নয় যে আদায়যোগ্য কিছু পড়ে আছে।
আজ বাকিতে পণ্য দেওয়ার আগে
ছোট সরবরাহকারীদের জন্য এই মামলার ব্যবহারিক পাঠ কয়েকটি: বড় ক্রেতার কাছেও পুরো চালান একসঙ্গে না ছেড়ে ধাপে ধাপে ছাড়া; প্রতিটি সরবরাহের বিপরীতে স্বাক্ষরিত প্রাপ্তি রাখা; বকেয়া নির্দিষ্ট সীমা ছাড়ালে সরবরাহ থামানো; আর টাকা না পেলে চিঠি দেওয়ার আগেই নয়, দেরির প্রথম দিন থেকেই লিখিত যোগাযোগ রাখা।
প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে এ অবস্থায় পৌঁছাল, তা আছে টাকাগুলো সব গেল কই লেখাটিতে।




