বিশ্ব

একটি ছাগল পুড়িয়ে, নিজের শবদাহের ছবি এআই দিয়ে বানিয়ে আসল মৃত্যুসনদ জোগাড়—খুনের বিচার থেমে ছিল দেড় বছর

বানানো ছবিটি ছিল সস্তা অংশ। এটি প্রযুক্তির খবর হয়ে উঠেছে এ কারণে যে পৌরসভার একটি নথি-প্রক্রিয়া ছবিকেই মৃত্যুর প্রমাণ হিসেবে মেনে নিয়েছিল।

একটি ছাগল পুড়িয়ে, নিজের শবদাহের ছবি এআই দিয়ে বানিয়ে আসল মৃত্যুসনদ জোগাড়—খুনের বিচার থেমে ছিল দেড় বছর

খুনের বিচার থেকে বাঁচতে এআই দিয়ে বানানো ছবি ব্যবহার করে নিজের মৃত্যুর নাটক সাজিয়েছিলেন বলে ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তিনি প্রায় সফলও হয়ে গিয়েছিলেন।

৩৮ বছর বয়সী রাজকুমার রাজভরকে রোববার সকাল ৯টার দিকে গ্রেপ্তার করে কোতোয়ালি নগর পুলিশ; সহায়তা করে স্পেশাল অপারেশনস গ্রুপ (এসওজি) ও সার্ভিল্যান্স টিম। গ্রেপ্তার করা হয় তাঁর নিজের এলাকা খাজা জাহানপুরের কাছ থেকে। গুলি করে একজনকে হত্যার মামলায় তিনি জামিনে ছিলেন।

পুলিশ যা বলছে

২০১৬ সালে যোগেশ সিং হত্যার মামলায় রাজভরের বিচার চলছিল; ২০১৬ সালের ১৯ ডিসেম্বর মুন্সিপুরা রেললাইনের কাছে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহত ব্যক্তির ভাইপো অবিনাশ সিংয়ের অভিযোগের ভিত্তিতে রাজকুমার রাজভর ও তাঁর বন্ধু সুদর্শন রাজভরের বিরুদ্ধে মামলাটি হয়েছিল।

পুলিশের বক্তব্য, ২০২৫ সালের ৩০ মে গাজিপুরে বসে রাজভর নিজের মৃত্যুর নাটক সাজানোর পরিকল্পনা করেন। ব্যবহার করা হয় চিতার ওপর শোয়ানো একটি দেহের এআই-উৎপাদিত ছবি, যেখানে মুখ বসানো হয় সুপারইম্পোজ করে। পুলিশ বলছে, কাফনের কাপড়ের নিচে ছিল একটি ছাগলের ধড়, মানুষের দেহের বদলে দাহ করা হয় সেটিই। শেষকৃত্য ও শ্মশানযাত্রার ছবিও জোগাড় করেছিলেন তিনি।

এসব নথির ভিত্তিতেই মৌ মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিল থেকে একটি মৃত্যুসনদ ইস্যু হয়। সেটি আদালতে জমা দিয়ে তিনি দাবি করেন, বিচারের মুখোমুখি হওয়ার জন্য তিনি আর জীবিত থাকছেন না। এরপর প্রায় দেড় বছর তিনি নিজের মতোই বসবাস করেন।

একটি ছাগল, একটি ছবি, একটি সনদ
পুলিশের বক্তব্য, চিতায় শোয়ানো দেহের বানানো ছবি আর মানুষের বদলে পোড়ানো একটি ছাগল থেকেই পৌরসভার আসল মৃত্যুসনদ মিলেছিল—আর মিলেছিল দেড় বছরের মুক্তি। গ্রাফিক: টেক বিডি।

পুলিশের বর্ণনায় উদ্দেশ্য

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অনুপ কুমার বলেছেন, দ্বাদশ শ্রেণিতে অকৃতকার্য রাজকুমার রাজভর পুঁজিবাজারে ট্রেডার হিসেবে কাজ করতেন এবং শেয়ারে বিনিয়োগের কথা বলে কয়েকটি শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ তুলেছিলেন।

পুলিশের দাবি, এই চক্রান্তের উদ্দেশ্য ছিল একসঙ্গে দুটি: খুনের মামলায় আইনি প্রক্রিয়ার হাত থেকে বাঁচা, আর সংগৃহীত সেই অর্থ ফেরত দেওয়া এড়ানো।

রাজভর যেহেতু আর ‘মৃত’ নন, মূল খুনের মামলার বিচার আবার শুরু হবে। পাশাপাশি জালিয়াতির অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আলাদা একটি মামলা হয়েছে।

বানানো ছবিটিই দুর্বল জায়গা নয়

একে ছবি তৈরির যন্ত্র কত ভালো হয়ে গেছে—সেই গল্প হিসেবে পড়তে ইচ্ছা করে। পুরোপুরি তা নয়। চিতায় কাফন-ঢাকা একটি দেহের বিশ্বাসযোগ্য ছবি বানানো বেশ কিছুদিন ধরেই কঠিন নয়, আর মৃতদেহের ওপর মুখ বসানো মডেলের জন্য সহজ কাজ—বিষয় স্থির হয়ে শোয়ানো, আংশিক ঢাকা, কম আলোয় তোলা, আর এমন পরিবেশে যেখানে কেউ ঝকঝকে পোর্ট্রেট আশা করে না।

দুর্বল জায়গাটি প্রক্রিয়া। মৃত্যুসনদ একটি ভিত্তিমূলক দস্তাবেজ: এটি ব্যাংক হিসাব বন্ধ করে, সম্পত্তি হস্তান্তর করে, আদালতের কার্যক্রম শেষ করে, বিমার টাকা ছাড়ায়। এখানে শিকলটি ছিল ছবি থেকে সনদ, সনদ থেকে আদালতের নথি—আর প্রথম সংযোগে যাচাই বলতে যা ছিল, তা হলো ছবিগুলো দেখতে ঠিকঠাক লাগছিল।

জেনারেটিভ যন্ত্র আসার আগেও এই শিকল ভঙ্গুর ছিল; সাজানো ছবি আর সহযোগী সাক্ষী দিয়ে ভুয়া মৃত্যুসনদ বহুদিন ধরেই তৈরি হয়েছে। পাল্টেছে খরচ। আগে শবদাহের নাটক সাজাতে দরকার হতো একটি দেহ বা বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প, সঙ্গে মিথ্যা বলতে রাজি কিছু মানুষ। এখন এই দুটির একটি কেবল একটি প্রম্পট।

আসলে যা ধরতে পারত

ছবির ফরেনসিক নয়। শনাক্তকরণের যন্ত্র উন্নত হচ্ছে—এ মাসেই গুগল নিজের এআই-শনাক্তকরণ পোর্টাল সবার জন্য খুলে দিয়েছে—কিন্তু সেগুলো নির্ভরযোগ্যভাবে কেবল অংশগ্রহণকারী জেনারেটরের জলছাপযুক্ত ছবিই চিহ্নিত করতে পারে। আর পৌরসভার কোনো কর্মচারী শেষকৃত্যের ছবিতে ফরেনসিক পরীক্ষা চালাবেন না।

এটি ধরে ফেলে নীরস প্রশাসনিক নকশা। মৃত্যুর কারণ-সংক্রান্ত চিকিৎসা সনদের বিপরীতে ইস্যু করা মৃত্যুসনদ, কিংবা শ্মশানের নিবন্ধন খাতার একটি এন্ট্রি, কিংবা ফলাফলে যাঁর কোনো স্বার্থ নেই এমন কারও তৈরি যেকোনো নথি—এগুলোর যেকোনো একটিই শিকলটি সঙ্গে সঙ্গে ছিঁড়ে দেয়। জালিয়াতিটি কাজ করেছে, কারণ প্রতিটি উপাদান এসেছিল সেই ব্যক্তির কাছ থেকেই, যিনি এতে লাভবান হচ্ছিলেন।

ভূমি নিবন্ধন থেকে বিমা দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ—এখানে যাঁরা নথি-প্রক্রিয়া বানান বা নিরীক্ষা করেন, তাঁদের জন্য এই শিক্ষাটিই কাজের। যেকোনো দস্তাবেজ সম্পর্কে প্রশ্নটি ‘সঙ্গে লাগানো ছবিটি আসল কি না’ নয়। প্রশ্নটি হলো, ফাইলের কোনো অংশ আবেদনকারী ছাড়া অন্য কেউ তৈরি করেছে কি না।

সম্পর্কিত: পুলিশকে বানানো খুনের তথ্য পাঠানো একটি এআই পরীক্ষামূলক এজেন্ট—যা হাতে পাওয়া জিনিসকে বিশ্বাস করতে তৈরি ব্যবস্থায় উৎপাদিত উপাদান ঢুকে পড়ার একই সমস্যা।

প্রতিবেদনটির জন্য প্রথম আলো এনডিটিভিকে সূত্র হিসেবে উল্লেখ করেছে।

সূত্র: প্রথম আলো

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি ঢাকাভিত্তিক একটি স্বাধীন প্রযুক্তি প্রকাশনা, প্রকাশিত হয় বাংলা ও ইংরেজিতে। লেখাগুলো আলাদা লেখকের নামে নয়, প্রকাশনার নামেই প্রকাশিত হয়; সংশোধন বা সূত্র নিয়ে প্রশ্ন পাঠানো যায় info@tech-bd.com ঠিকানায়।