প্রযুক্তি

গ্যারেজে বসে পতাকা বানানো আহত সেনাসদস্যটির অস্তিত্বই নেই, জানতে ১৫৪.৯৯ পাউন্ড গেল এক প্রকৃত ভেটেরানের

গ্যারেজে কাজ করা আহত সাবেক সেনাসদস্যের এআই-নির্মিত ভিডিও দিয়ে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে সস্তা পণ্য। বিবিসি এমন ৪৫টি টিকটক অ্যাকাউন্ট পেয়েছে। বিশেষজ্ঞ বলছেন, ভিডিওগুলো বানাতে মিনিট কয়েক লাগে—আর চ্যাটবটকে বলা যায় আরও আবেগি করে বানাতে।

গ্যারেজে বসে পতাকা বানানো আহত সেনাসদস্যটির অস্তিত্বই নেই, জানতে ১৫৪.৯৯ পাউন্ড গেল এক প্রকৃত ভেটেরানের

ভিডিওটি বানানোই হয়েছে আঙুল থামিয়ে দেওয়ার জন্য। মুখে ক্ষতচিহ্ন নিয়ে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন একটি গ্যারেজের সামনে, নিচু গলায় বলছেন আহত হওয়ার পর বাড়তি আয়ের জন্য তিনি যে কাঠের পতাকা বানান তার কথা। স্ত্রী পাশে থেকে সাহায্য করছেন। পতাকাগুলো দেখতে সুন্দর। তিনি শুধু চাইছেন, মানুষ যেন বারো সেকেন্ড দেখে যায়।

এই মানুষটির অস্তিত্বই নেই। ভিডিওটি বানানো এআই দিয়ে, আর পতাকাটি কোনো গ্যারেজে তৈরি হয়নি।

এক ক্রেতার যা হলো

উইল্টশায়ারের ব্রেডেনস্টোকের ৬৩ বছর বয়সী রেমন্ড গিলবার্ট সত্যিকারের একজন সেনা ভেটেরান—আফগানিস্তানে ক্যাম্প বাস্টিয়ন ও কান্দাহারে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কোয়ালিটি ম্যানেজার ছিলেন। টিকটকে এমনই একটি ভিডিও দেখে তিনি বিশ্বাস করেন। বাইরের একটি ওয়েবসাইটে গিয়ে হাতে বানানো কাঠের পতাকার জন্য দেন ১৫৪.৯৯ পাউন্ড।

যা এল, তার খামে লেখা ছিল চীনা ভাষায়, আর পতাকাটি আসলে পাতলা কাঠে আঠা দিয়ে সাঁটা একটি ছাপা ছবি। বিবিসিকে বলা তাঁর সিদ্ধান্তটি যেকোনো বিশেষজ্ঞের চেয়ে সোজা: এআই ভালো হচ্ছে, আর মানুষ খারাপ হচ্ছে।

এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, একটি কারবার

বিবিসি এমন ৪৫টি টিকটক অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করেছে, অন্য প্ল্যাটফর্মে আছে আরও—ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবজুড়ে একই ছকে বিক্রি হচ্ছে ব্যাগ, চপিং বোর্ড, দরজার তোরণ। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ উইল গায়াট, যিনি এই "করুণার ফাঁদ" ভিডিওগুলোর বাড়বাড়ন্ত অনুসরণ করছেন, বলছেন—বাস্তবতা হলো এগুলো বানাতে মিনিট কয়েক লাগে, আর চ্যাটবটকে বলেই দেওয়া যায় ভিডিওটি আরও ইচ্ছাকৃতভাবে আবেগি করে তুলতে। এরপর কয়েক ডজন বট অ্যাকাউন্ট মন্তব্যের ঘর ভরে ফেলে, যাতে বিক্রেতাকে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।

টিকটক জানিয়েছে, ক্ষতিকরভাবে বিভ্রান্তিকর এআই-নির্মিত কনটেন্ট ও প্রতারণার বিরুদ্ধে তাদের কঠোর নিয়ম আছে, আর তাদের জানানো অ্যাকাউন্ট ও কনটেন্ট তারা সরিয়ে দিয়েছে। অভিযোগ নিয়ে জিজ্ঞেস করা হলে একটি অ্যাকাউন্ট জবাব দেয়, পণ্যগুলো লন্ডনে বানানো—কিন্তু বিক্রেতা কোন রেজিমেন্টে ছিলেন তা বলতে রাজি হয়নি।

দশ সেকেন্ডে চেনার উপায়

  1. ক্ষতচিহ্নটি একই আছে কি না দেখুন অ্যাকাউন্টের অন্য ভিডিওগুলোতে। এসব নকলে সেটি সরে যায়, দিক বদলায়, কখনো উধাও হয়।
  2. ক্যাপশনের একটি বাক্য সার্চ বক্সে বসান। একই স্ক্রিপ্ট কয়েক ডজন অ্যাকাউন্টে ঘুরছে।
  3. গল্পের সঙ্গে না মেলা নির্মাণমানকে সন্দেহ করুন। গ্যারেজে একা কাজ করা মানুষের কালার গ্রেডিং আর তিনটি ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল থাকে না।
  4. মন্তব্যে পুনরাবৃত্তি খুঁজুন। বটের মন্তব্য কয়েকটি বাঁধা বাক্যের আশপাশে ঘোরে, আর আসে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে।
  5. ভিডিও থেকে যাওয়া বাইরের ওয়েবসাইটে কখনো কিনবেন না। প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে নালিশ করার সুযোগটি চলে যায়।

শেষ কথাটির আইনি দাঁত আছে। ফোর্বস সলিসিটরসের সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট ড্যানিয়েল ফ্লেচার বলছেন, ভোক্তার টাকা ফেরত পাওয়ার অধিকার আছে ঠিকই—কিন্তু এসব বিজ্ঞাপনের ভৌগোলিক চরিত্রের কারণে বাস্তবে সেই অধিকার প্রয়োগ করা খুব কঠিন। বিক্রেতা অন্য দেশের, আর আপনার টাকা প্ল্যাটফর্ম নেয়নি।

বাংলাদেশে এর মানে কী

একই ছক এ দেশেও চলছে, শুধু চরিত্র বদলে। বাংলাদেশি ফেসবুকে আবেগি বিক্রেতা হলেন ছোট দর্জি ব্যবসা চালানো এক বিধবা, সন্তানের অপারেশনের টাকা তুলতে চাওয়া এক বাবা, কিংবা ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়া এক কৃষক—আর পণ্য শাড়ি, মধু, কিংবা অবিশ্বাস্য দামের একটি ফোন। এআই ভিডিও ওই গল্প বানানোর খরচ কার্যত শূন্য করে দিয়েছে, আর পেজ তৈরি হচ্ছে রিপোর্ট করার চেয়ে দ্রুত।

দুটি অভ্যাস এ দেশে বেশির ভাগ মানুষকে বাঁচায়, আর খরচও নেই। এক, ক্যাশ অন ডেলিভারিতে অনড় থাকুন; আগেই বিকাশ বা নগদ চাওয়া বিক্রেতাকে না বলুন—অগ্রিম পরিশোধই এসব প্রতারণার একমাত্র অপরিহার্য শর্ত, আর তাতে রাজি না হলেই লেনদেনটি নিরাপদে শেষ হয়ে যায়। দুই, একেবারে নতুন পেজে অতিরিক্ত আবেগি ভিডিও দেখলে সেটিকে সতর্কসংকেত হিসেবেই নিন: পেজটি কবে খোলা হয়েছে দেখুন, আগের পোস্টগুলো সম্পূর্ণ অন্য বিষয়ে কি না দেখুন, আর রিভার্স ইমেজ সার্চ দিয়ে দেখুন একই ছবি অন্য কোথাও আছে কি না। ভেরিফিকেশন ব্যাজ দখল করে প্রতারণায় বিশ্বাসযোগ্যতা জোগানো নিয়ে আমরা আগেও লিখেছি; এটিও সেই ধার করা বিশ্বাস, এখন শূন্য থেকে বানিয়ে ফেলার মতোই সস্তা। টাকা দিয়ে ফেললে পেজটি প্ল্যাটফর্মে রিপোর্ট করুন, সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল ফিনান্সিয়াল সেবায় অভিযোগ করুন—ফেরত পেতে দ্রুততাই সব—আর স্ক্রিনশটগুলো রেখে দিন।

সূত্র: BBC

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি সম্পাদকীয় দল।