উত্তর জাপানের ইয়ামাগাতার শোনাই সমভূমিতে — একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে সাগর, মাঝখানে ধান — বুড়িয়ে যাওয়া কৃষকসমাজ পরখ করছে দুই হাজার বছর ধরে হাতে ফলানো একটি ফসলের জন্য প্রযুক্তি কী করতে পারে। সবচেয়ে বেশি ছবি তোলা উত্তরটি হলো ক্ষেতের পানিতে ঘুরে বেড়ানো ছোট্ট একটি রোবট, যা করছে আগে হাঁসেরা যে কাজ করত।
যে হাঁস-পদ্ধতির নকল
বুনো ও গৃহপালিত হাঁসের সংকরকে জাপানি ভাষায় বলে আইগামো, আর কৃষক তাকাও ফুরুনোর জনপ্রিয় করা আইগামো পদ্ধতিটি জৈব চাষের এক চমৎকার কৌশল। চারা রোপণের কয়েক সপ্তাহ পর ডোবানো ক্ষেতে ছেড়ে দেওয়া হয় হাঁসের ছানা। তারা আগাছা, পোকা ও ছোট ক্ষতিকর প্রাণী খায়, কিন্তু ধান ছোঁয় না; তাদের সাঁতারে পানি নড়ে, মাটিতে অক্সিজেন ঢোকে আর তা নরম থাকে; তাদের বিষ্ঠা সার হয়। কোনো আগাছানাশক নয়, কীটনাশক নয় — আর মৌসুম শেষে বড় হওয়া হাঁস বিক্রি হয় ডিম ও মাংসের জন্য, একই জমি থেকে দ্বিতীয় একটি আয়।
যন্ত্রের দরকার পড়ল কেন
পদ্ধতিটি সুন্দর এবং কষ্টসাধ্য। হাঁসকে বাঁচাতে হয় শিকারি প্রাণী, আবহাওয়া ও রোগ থেকে। ধানে শিষ এলে তাদের সরিয়ে নিতে হয়, কারণ তত দিনে তারা গাছের ক্ষতি করার মতো বড়। সময় মেপে কাজ করা, থাকার ব্যবস্থা আর প্রতিদিনের যত্ন মিলিয়ে যে শ্রম দরকার, জাপানের সংকুচিত ও বৃদ্ধ কৃষিশ্রমিক সমাজ ঠিক সেটিই জোগাতে পারে না। জৈব ধানের সবচেয়ে বড় বাধা আগাছা দমন, আর তা হাতে বা বারবার যন্ত্র চালিয়ে করলে সময়, শ্রম ও টাকা তিনটিই লাগে।
রোবটটি আসলে যা করে, আর তা আগাছা তোলা নয়
এই অংশটি বোঝা দরকার, কারণ এটি প্রত্যাশার উল্টো আর নিচের প্রতিটি সীমাবদ্ধতা এটিই ব্যাখ্যা করে।
নিউগ্রিনের রোবট আগাছা তোলে না, কাটে না, বিষ দেয় না। এটি সারির মধ্য দিয়ে চলতে চলতে পানি ও উপরের কাদা নাড়ে — আর সেই কাদাই পানি ঘোলা করে দেয়। মাটির ওপরের এক সেন্টিমিটারে অঙ্কুরিত হওয়া আগাছার চারা তখন অন্ধকারে বসে থাকে, আর শিকড় গাড়ার আগেই মরে যায়। নাড়াচাড়ায় মাটিতে অক্সিজেনও ঢোকে আর তা নরম থাকে — হাঁসেরা যা দিত তার বাকি অর্ধেক এটিই।
কাজেই কৌশলটি আলো থেকে বঞ্চিত করা, তুলে ফেলা নয় — অর্থাৎ সময়ই সব। আগাছা অঙ্কুরিত হওয়ার সময়ে আগেভাগে ও বারবার চালালে কাজ হয়। দেরিতে চালালে, যখন আগাছার পাতা পানির ওপরে উঠে গেছে, কিছুই হয় না — কারণ যে গাছ ইতিমধ্যেই আলোয় পৌঁছেছে, ঘোলা পানি দিয়ে তাকে ছায়া দেওয়া যায় না।
প্রতিটি ইউনিট প্রায় ১.৫ হেক্টর সামলায়। প্রথম সংস্করণের ওজন ছিল প্রায় ১৬ কেজি; দ্বিতীয়টির প্রায় ৬ কেজি, যা একজন মানুষ এক ক্ষেত থেকে আরেক ক্ষেতে বয়ে নিতে পারেন। এটি পোকা খায় না, ডিমও পাড়ে না — যে যন্ত্রকে কখনো ধরতে, খাওয়াতে বা শিয়ালের হাত থেকে বাঁচাতে হয় না, এটিই তার বিনিময়।
ডোবানো ক্ষেতে যন্ত্র পথ চেনে কীভাবে
ধানক্ষেত রোবটের জন্য অস্বাভাবিক রকম সহনশীল, আবার অস্বাভাবিক রকম প্রতিকূল। সহনশীল, কারণ তা সমতল, আইল দিয়ে ঘেরা, আর ধান ছাড়া ধাক্কা খাওয়ার মতো কিছু নেই। প্রতিকূল, কারণ কোনো চিহ্ন নেই, পৃষ্ঠটি পানি, আর যা একবার আটকে যায় তা আটকেই থাকে।
এই শ্রেণির যন্ত্র পথ চেনে দুভাবে — হয় সারি অনুসরণ করে, অর্থাৎ রোপণ করা রেখাগুলো টের পেয়ে তাদের মাঝ দিয়ে চলে; নয়তো এমন নির্ভুল উপগ্রহ অবস্থান দিয়ে, যাতে আগে থেকে ঠিক করা পথে চলা যায়। সাধারণ জিপিএস কয়েক মিটার পর্যন্ত নির্ভুল, যা ৩০ সেন্টিমিটার দূরত্বের সারির জন্য অকেজো; তাই নিখুঁত কাজে স্থির একটি রেফারেন্স স্টেশন থেকে সংশোধন সংকেত লাগে, যা নির্ভুলতা সেন্টিমিটারে নামায়। সারি অনুসরণে কোনো অবকাঠামো বা সাবস্ক্রিপশন লাগে না — আর কোনো প্রযুক্তি অন্য দেশের ছোট খামারে পৌঁছাবে কি না, তাতে এটির গুরুত্ব বিপুল।
অন্য সীমাবদ্ধতাটি শক্তি, আর এ কারণেই এই যন্ত্রগুলো ছোট ও ধীর। সৌরশক্তি ও মাঝারি একটি ব্যাটারিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানির ভেতর ধীরে চলা হালকা একটি রোবটের নকশা পুরোপুরিই ঠিক করে দিয়েছে হাতে থাকা শক্তি, দ্রুততম কী হতো তা নয়।
অন্যত্র কাজ করতে হলে যা সত্যি হতে হবে
পৃথিবীর প্রায় যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি ধান ফলায় বাংলাদেশ, আর জাপানের বিপরীতে এখানে কৃষিশ্রমিকের ঘাটতি নেই — এখনো। তবু মজুরি বাড়ায় আর তরুণেরা ক্ষেত ছাড়ায় আগাছানাশকের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে; আর ঢাকার সুপারশপে জৈব চালের যে বাড়তি দাম মেলে, রাসায়নিক ছাড়া আগাছা দমন ব্যয়বহুল বলে খুব কম কৃষকই সেখানে পৌঁছাতে পারেন।
গ্রামে সমবায় মিলে ভাগ করে ব্যবহার করা যায় এমন ৬ কেজির রোবট ঠিক সেই ধরনের উপযুক্ত প্রযুক্তি, যা ভালোভাবেই ছড়ায় — যদি দামটিও ছড়ায়। তবে বাধাটি প্রকৌশল নয়। বাধাটি কৃষিবিদ্যা, আর তা সুনির্দিষ্ট।
পদ্ধতিটির দরকার নির্দিষ্ট গভীরতায় একটানা ডোবানো ক্ষেত — এত গভীর যাতে রোবট ভাসতে ও নাড়তে পারে, এত অগভীর যাতে কচি ধান ডুবে না যায়। এর জন্য লাগে পানি নিয়ন্ত্রণ, তার জন্য লাগে নির্ভরযোগ্য সরবরাহ আর সমান করা জমি। লাগে সোজা, সমান দূরত্বের সারি, যার বাস্তব অর্থ হাতে নয় যন্ত্রে চারা রোপণ। আর লাগে কৃষকের নিজের সুবিধা নয়, আগাছার সময়সূচি মেনে এটি চালানো।
এই শর্তগুলো সাধারণ ছোট খামারের নয়, সুসংগঠিত বাণিজ্যিক খামারের বর্ণনা — নিকট ভবিষ্যতে এটি কতদূর যাবে, তার সৎ মূল্যায়ন এটিই। আবার এটি এমন কিছু জিনিসের তালিকাও, যা দুর্লভ নয় বরং অর্জনযোগ্য — আর ক্রমটি গুরুত্বপূর্ণ: আগে জমি সমান করা ও যন্ত্রে রোপণ, তারপর রোবট। ক্ষেত সমান করার আগে যে গ্রাম রোবট কেনে, সে একটি নৌকা কিনেছে।




