প্রযুক্তি

এক বছরে দেশে তৈরি হ্যান্ডসেট কমেছে ২৪ শতাংশ, আর বৈধ পথে আনা ফোনের কর গেছে উল্টো দিকে

বিটিআরসির হিসাবে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশে তৈরি হয়েছে ১৬ লাখ ২৯ হাজার হ্যান্ডসেট, আগের বছর যা ছিল ২১ লাখ ৪৭ হাজার। একই সময়ে আমদানি করা ফোনের কর ৪৩.৪৩ থেকে বেড়ে ৬৪.২৫ শতাংশ।

এক বছরে দেশে তৈরি হ্যান্ডসেট কমেছে ২৪ শতাংশ, আর বৈধ পথে আনা ফোনের কর গেছে উল্টো দিকে

ফোনের বাক্সে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা এখন পরিচিত দৃশ্য, আর কয়েক বছর ধরে সেটি শিল্পটি কোন দিকে যাচ্ছে তার সঠিক বর্ণনাও ছিল। সর্বশেষ হিসাব উল্টো দিকে ইঙ্গিত করছে।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশি প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি করেছে ১৬ লাখ ২৯ হাজার হ্যান্ডসেট। এক বছর আগে একই সময়ে সংখ্যাটি ছিল ২১ লাখ ৪৭ হাজার। অর্থাৎ বারো মাসে কমেছে ৫ লাখ ১৮ হাজার ইউনিট, বা ২৪.১ শতাংশ।

যে সংখ্যাটি এর ব্যাখ্যা দেয়

কারণ হিসেবে কয়েকটি বিষয় আসে—করকাঠামো, লজিস্টিকস খরচ, বাজারের বদল। কিন্তু সবগুলোকে একসুতোয় গাঁথে যে সংখ্যাটি, সেটি হলো: বিটিআরসির নিজের হিসাব ও সংশ্লিষ্টদের মতে দেশের মুঠোফোন বাজারের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশই অনুমোদনহীন হ্যান্ডসেটের দখলে। দামি ফোনে বৈধ ও ধূসর পথের দামের পার্থক্য সবচেয়ে বেশি—আর ঠিক সেখানেই দেশীয় সংযোজনকারীর মুনাফা থাকার কথা।

এই বাণিজ্যের কারণে রাজস্ব হারানোর হিসাব বছরে ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা।

যে কর ছাড় দেওয়া হয়েছিল, তারপর তুলে নেওয়া হলো

সরকার পদক্ষেপ নিয়েছিল। ফোন আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়, কার্যকর ছিল চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত। যুক্তি ছিল, দামের ব্যবধান কমলে ক্রেতারা বৈধ বাজারে ফিরবেন।

জুনের পর কমানো হার আর বহাল রাখা হয়নি। বলা হয়, এতে বৈধ আমদানি বা দেশে উৎপাদন তেমন বাড়েনি।

এরপর আমদানি করা ফোনের সম্মিলিত করভার ৪৩.৪৩ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৪.২৫ শতাংশে।

প্রতিবেশীদের পাশে রাখলে যা দাঁড়ায়

তুলনাটিই এই খবরের অস্বস্তিকর অংশ।

  • বাংলাদেশ — ৬৪.২৫%
  • ভারত — প্রায় ২২ থেকে ২৪%
  • পাকিস্তান — ১৫ থেকে ২৫%
  • নেপাল — ১৮ থেকে ২৫%
  • শ্রীলঙ্কা — ১৫ থেকে ২০%
  • মালদ্বীপ — প্রায় শূন্য, কারণ দেশটি পুরোপুরি আমদানিনির্ভর

দক্ষিণ এশিয়ার কোথায় হ্যান্ডসেট কারখানা বসাবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিনিয়োগকারী এই তালিকাটিই পড়েন। চোরাকারবারিও পড়েন।

ছয় মাসের কর ছাড় কেন কাজ করার কথা ছিল না

যুক্তিসঙ্গতভাবেই বলা যায়, পরীক্ষাটিকে সফল হওয়ার শর্ত দেওয়া হয়নি—আর কথাটি বলা দরকার, কারণ একই সিদ্ধান্ত আবার সামনে আসবে।

যে বাণিজ্যকে বদলানোর কথা ছিল, ছয় মাস তার পরিকল্পনার চক্রের চেয়ে ছোট। বৈধ পথে আসতে চাওয়া আমদানিকারককে অর্থায়ন, ওয়ারেন্টি-সেবা, বিটিআরসি নিবন্ধন আর খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে হয়—দুই প্রান্তিক পরেই উঠে যেতে পারে এমন হারের জন্য এর কোনোটিই গড়ার মতো নয়। উল্টো দিকে ধূসর পথের আমদানিকারকের এর কিছুই লাগে না, আর তিনি অপেক্ষা করতে পারেন। ছাড়টি বৈধ বাণিজ্যের কাছে দীর্ঘ প্রতিশ্রুতি চেয়েছিল স্বল্প নিশ্চয়তার বিপরীতে, আর অবৈধ বাণিজ্যের কাছে কোনো প্রতিশ্রুতিই চায়নি।

এরপর হার ৬৪.২৫ শতাংশে ওঠায় আগের অবস্থা ফিরে আসেনি। বরং ধূসর বাজার যে ব্যবধানটি কাজে লাগায়, সেটি ছাড় দেওয়ার আগের চেয়েও বড় হয়েছে।

বাংলাদেশে এর মানে কী

ক্রেতার জন্য এটি ঢাকার দোকানে আগে থেকেই দেখা যাওয়া হিসাব, আর আইফোন ১৮-এর দামের ব্যবধান বাজারের ওপরের প্রান্তে একই প্রক্রিয়ার ফল।

শিল্পের জন্য বিষয়টি আরও গুরুতর। তৈরি পণ্য আমদানি থেকে পণ্য তৈরির দিকে যাওয়ার যে অল্প কয়েকটি পথ একটি দেশের সামনে থাকে, হ্যান্ডসেট সংযোজন তার একটি—আর সাধারণত এটিই যন্ত্রাংশ তৈরির প্রথম ধাপ। এক বছরে ২৪ শতাংশ চাহিদার ভাটা নয়; ফোন বিক্রি হচ্ছেই, শুধু এখানে তৈরি হচ্ছে না।

আর রাজস্বের যুক্তিটি দুদিকেই কাটে। ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা হারাচ্ছে এমন এক বাজারের কাছে, যা টিকে আছে বৈধ দাম বেশি বলেই; বৈধ দাম বাড়ালে ক্ষতিও বাড়ে। নীতির প্রশ্নটি তাই শুল্ক কম কি না, বরং কোন হারে ধূসর বাজার কী করে—তার কোনো নমুনা কেউ কষেছেন কি না। সেটি বাজেটে একটি সংখ্যা বসানোর চেয়ে ভিন্ন ও কঠিন কাজ।

সূত্র: বিটিআরসির উৎপাদন ও বাজারের তথ্য, আর প্রথম আলোয় সামির আশাফের বিশ্লেষণ।

সূত্র: প্রথম আলো

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি সম্পাদকীয় দল।