ইন্টেলের কারখানা থেকে বেরোনো প্রতিটি প্রসেসরকে বিক্রির অনুমতি দেওয়ার আগে মাপা হয়, সন্দেহ করা হয়, আবার মাপা হয়। যাঁরা এই সন্দেহের কাজটি করেন তাঁরা মেট্রোলজি প্রকৌশলী, আর তাঁদেরই একজন মোহাম্মদ মাশরুর হোসেন — উচ্চমাধ্যমিক লালমনিরহাট সরকারি কলেজে, স্নাতক গাজীপুরের ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে যান্ত্রিক প্রকৌশলে, এখন যুক্তরাষ্ট্রে ইন্টেলে কর্মরত এবং ইউনিভার্সিটি অব টেনেসি, নক্সভিলে পিএইচডি করছেন।
মেট্রোলজি জিনিসটা কী
মেট্রোলজি হলো মান নিয়ন্ত্রণে প্রয়োগ করা পরিমাপের বিজ্ঞান। কারখানায় এর মানে তৈরি ও আধা-তৈরি সিলিকনে ত্রুটি পরীক্ষা করা, কোন ধরনের ত্রুটি দেখা দিয়েছে তা চিহ্নিত করা, আর উৎপাদন লাইনকে বলে দেওয়া কীভাবে সেটি তৈরি করা বন্ধ করতে হবে। হোসেনের কাজের মধ্যে আছে ওয়েফার-লেভেল প্যাকেজিং মেট্রোলজি — খালি ডাইকে ব্যবহারযোগ্য উপাদানে পরিণত করা স্তর ও সংযোগগুলো মাপা — সঙ্গে ত্রুটি চিহ্নিতকরণ, প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ, মূল কারণ বিশ্লেষণ ও তথ্যভিত্তিক অপ্টিমাইজেশন।
সহজ ভাষায়: এক ব্যাচ চিপে কিছু গোলমাল হলে তাঁর দল বের করে কেন, আর সমাধানটি ফিরে যায় উৎপাদনে।
যে সমস্যাটি একে কৌতূহলোদ্দীপক করে
কাজের বিবরণ যা বোঝায় না, তা হলো এই। যে গড়নগুলো মাপা হচ্ছে সেগুলো যে আলো দিয়ে মাপবেন তার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের চেয়েও ছোট। দৃশ্যমান আলো মোটামুটি ৪০০ থেকে ৭০০ ন্যানোমিটার; আগ্রহের কাঠামোগুলো তার ভগ্নাংশমাত্র। আপনি কেবল তাকিয়ে দেখতে পারবেন না, কারণ কোনো আলোকীয় ব্যবস্থা পদার্থগতভাবেই তার ব্যবহৃত তরঙ্গদৈর্ঘ্যের প্রায় অর্ধেকের চেয়ে সূক্ষ্ম জিনিস আলাদা করতে পারে না।
তাই সেমিকন্ডাক্টর মেট্রোলজি মূলত পরোক্ষ। কোনো কাঠামোর ছবি তোলার বদলে একই রকম কাঠামোর পুনরাবৃত্ত নকশার ওপর আলো ফেলে দেখা হয় তা কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তারপর উল্টো দিকে কাজ করা হয়: কাঠামোটি কেমন হওয়ার কথা তার একটি ভৌত মডেল বানান, ওই মডেল কেমন বিচ্ছুরণ তৈরি করত তা হিসাব করুন, আর হিসাব করা ধরনটি মাপা ধরনের সঙ্গে না মেলা পর্যন্ত মডেল বদলাতে থাকুন। উত্তরটি একটি ফিট থেকে করা অনুমান, ছবি নয়। স্তরের পুরুত্ব মাপা হয় প্রতিফলন আলোর সমবর্তন কতটা বদলায় তা দেখে। যেখানে সরাসরি ছবি তোলা ছাড়া উপায় নেই, সেখানে ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ অনেক ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্য ব্যবহার করে — বিনিময়ে লাগে সময়, শূন্যাবস্থা, আর কখনো নমুনাটিও নষ্ট হয়।
এ কারণেই শাখাটি পরিদর্শনের নয়, পদার্থবিদ্যা, মডেলিং ও পরিসংখ্যানের মিশ্রণ। প্রকৌশলীর আসল প্রশ্ন সাধারণত “এই পরিমাপটি কত” নয়, বরং “একে কতটা বিশ্বাস করব” — কারণ প্রতিটি সংখ্যাই এমন একটি মডেল থেকে আসে, যা এমনভাবে ভুল হতে পারে যা ওই সংখ্যা দেখে বোঝা যায় না।
মাপাটা নিজেই একটি বিনিময় কেন
কারখানার আসল পণ্য ইল্ড: যা বানানো হলো তার কত অংশ কাজ করে। ইল্ড রক্ষা করতেই মেট্রোলজি আছে, আর এর খরচও আছে — আপনি যে ওয়েফারটি মাপছেন সেটি ততক্ষণ লাইনে এগোচ্ছে না, আর মাপার যন্ত্রপাতি গোটা ভবনের সবচেয়ে দামি জিনিসগুলোর একটি।
তাই প্রকৌশলের প্রশ্নটি কখনোই “সব মাপো” নয়। প্রশ্নটি হলো, কোন ধাপে কতটা কম মাপলে কোনো প্রক্রিয়া সরে যাওয়া ধরা পড়বে ব্যাচ নষ্ট হওয়ার আগেই। কম মাপলে সমস্যাটি ধরা পড়ে হাজার হাজার ওয়েফার সেটি বহন করার পর। বেশি মাপলে কারখানা ধীর হয়ে যায় এমন একটি সমস্যা ঠেকাতে, যা আদৌ ঘটছিল না। এই বিচারবোধ — স্যাম্পলিং কৌশল — এই কাজে অভিজ্ঞতার বড় অর্জন।
প্যাকেজিং কেন, আর যান্ত্রিক ডিগ্রি কেন মানানসই
হোসেন বলছেন, নিয়োগে তিনটি জিনিস বিবেচিত হয়েছে: গবেষণার অভিজ্ঞতা, বিশ্লেষণী দক্ষতা, আর উৎপাদন পর্যায়ে জটিল প্রকৌশল সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা। ইলেকট্রনিকসের ডিগ্রি তালিকায় নেই, আর কারণটি আকস্মিক নয়, কাঠামোগত।
কয়েক দশক ধরে চিপের অগ্রগতি এসেছে ট্রানজিস্টর ছোট করা থেকে। সেটি ধীর হয়ে আসছে এবং নাটকীয়ভাবে ব্যয়বহুল হচ্ছে, তাই কর্মক্ষমতার উন্নতির ক্রমবর্ধমান অংশ এখন আসে অ্যাডভান্সড প্যাকেজিং থেকে — একটি নকশাকে কয়েকটি ছোট ডাইয়ে ভাগ করে ঘনভাবে জুড়ে দেওয়া, ডাই একটির ওপর আরেকটি বসানো, সরাসরি একটিকে আরেকটির সঙ্গে বন্ধন করা। কৌতূহলোদ্দীপক সমস্যাগুলো আংশিকভাবে লিথোগ্রাফি থেকে সরে গিয়ে ঢুকেছে সিলিকনের স্তূপ কীভাবে জোড়া দেবেন, ঠান্ডা রাখবেন আর ধরে রাখবেন — সেই প্রশ্নে।
এগুলো প্রায় হুবহু পাঠ্যবইয়ের যান্ত্রিক ও বস্তুগত সমস্যা। ভিন্ন ভিন্ন বস্তু গরম হলে ভিন্ন হারে প্রসারিত হয়, তাই ঘরের তাপমাত্রায় সমতল থাকা প্যাকেজ চালু অবস্থার তাপমাত্রায় বেঁকে যায় আর স্তরগুলোর মাঝের সংযোগে টান পড়ে। স্তূপের মাঝখানে তৈরি হওয়া তাপকে ওপরের স্তরগুলো ভেদ করে বেরোতে হয়। প্রতি বর্গমিলিমিটারে হাজার হাজার সংযোগকে বছরের পর বছর তাপচক্র সহ্য করে টিকে থাকতে হয়।
কাজেই সেমিকন্ডাক্টর প্যাকেজে তাপ ব্যবস্থাপনা ও বস্তুর আচরণ নিয়ে কাজ করা যান্ত্রিক প্রকৌশলী অন্য শাখা থেকে ভুল করে ঢুকে পড়া কেউ নন। তিনি সমস্যাটির ঠিক সেই অংশেই কাজ করছেন যা নিয়ে তাঁর ডিগ্রি — আর যেসব শিক্ষার্থী ভাবেন চিপশিল্প কেবল ইলেকট্রনিকসের স্নাতকদের, তাঁদের জন্য এটিই দরকারি সংশোধন।
পথটি, আর তাতে আসলে কী লাগে
- ২০২১: আইইউটি থেকে যান্ত্রিক প্রকৌশলে স্নাতক; দুই মাস পরেই যুক্তরাষ্ট্রে।
- ২০২১–২০২৩: ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনে যান্ত্রিক প্রকৌশলে স্নাতকোত্তর।
- ২০২৩: স্নাতকোত্তর শেষ করেই ইন্টেলে মেট্রোলজি প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান — জীবনের প্রথম চাকরি।
- এখন: ওয়েফার-লেভেল প্যাকেজিং ও প্রক্রিয়া অপ্টিমাইজেশন, সঙ্গে অ্যাডভান্সড প্যাকেজিং, বস্তু ও তাপ ব্যবস্থাপনা নিয়ে পিএইচডি।
ধরনটি স্পষ্ট করে বলা দরকার: দেশে শক্ত একটি স্নাতক ডিগ্রি, বিদেশে গবেষণানির্ভর একটি স্নাতকোত্তর, আর বেতনের অঙ্ক নয় সমস্যার গভীরতা দেখে বেছে নেওয়া প্রথম চাকরি। “গবেষণানির্ভর” অংশটিই আসল কাজ করছে — গবেষণাগারের ফলাফলবিহীন পাঠভিত্তিক স্নাতকোত্তর সেই গবেষণা-অভিজ্ঞতা তৈরি করে না, নিয়োগে যেটিকে সবার আগে বিবেচনা করা হয়েছিল।
সৎ পাদটীকাটি হলো, এই পথ যতটা অন্য একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে যায়, ততটাই যায় সেই দেশের অভিবাসন ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে — আর কোনো প্রস্তুতিই এই সীমাবদ্ধতা সরায় না। এ কারণেই প্রশ্নটির দেশীয় সংস্করণটিও জরুরি: প্যাকেজিং, অ্যাসেম্বলি ও টেস্টিং হলো শিল্পের সেই অংশ যা দেশগুলো সবার আগে গড়ে, কারণ এতে অত্যাধুনিক ফ্যাব নয়, দক্ষ প্রক্রিয়া প্রকৌশল লাগে। ছোট ভিত্তি থেকে সেমিকন্ডাক্টর কর্মীবাহিনী গড়তে হলে এই প্রান্তেই বৃদ্ধি সম্ভব — আর এই প্রান্তেই যান্ত্রিক বা বস্তু প্রকৌশলের স্নাতকের প্রশিক্ষণ আগে থেকেই ঠিক আছে।




