চোখের কোণ থেকে জল গড়ানো ছোট্ট হলুদ মুখটিই গত এক বছরে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ইমোজি হয়ে উঠেছে—গুগলের পক্ষ থেকে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী। সাধারণ একটি হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট খুললে দেখা যেতে পারে, কেবল শেষ ৭২ ঘণ্টাতেই এটি ব্যবহৃত হয়েছে পনেরোবার।
লক্ষণীয় হলো এটি কী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। কেউ নতুন চাকরি পেয়েছেন? কান্নার ইমোজি। অদ্ভুত কোনো কারণে কারও সঙ্গে দেখা করতে গেছেন? কান্নার ইমোজি। সোফা থেকে কুকুরটি পড়ে গেছে? আবারও কান্নার ইমোজি। প্রতীকটি দুঃখ থেকে প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
অন্যদিকে হাসতে-হাসতে-কান্নার মুখ আর তার কাত হওয়া সঙ্গীটি—বছরের পর বছর যা ছিল মজা বোঝানোর চেনা উপায়—এত বেশি ব্যবহৃত হয়েছে যে এখন সেগুলো পুরোনো ঠেকে; আপনার আনুমানিক বয়স ধরিয়ে দেওয়ার নির্ভরযোগ্য উপায়।
দ্ব্যর্থবোধকটিই জেতে কেন
এটিকে নিছক কৌতূহলের খবর ভাবা সহজ। এর নিচে সত্যিকারের একটি কথা আছে—লেখা ভাষাকে যখন সুরও বইতে হয়, তখন সেটি কীভাবে কাজ করে।
খুদে বার্তা ছেঁটে ফেলে সেই সবকিছু, যা দিয়ে কথা বলার সময় উদ্দেশ্য বোঝানো হয়: স্বরের ওঠানামা, গতি, বলা মানুষটির মুখ। তার কিছুটা ফিরিয়ে আনতেই ইমোজি এসেছিল। কিন্তু যেগুলো টিকে যায়, সেগুলো সূক্ষ্ম অর্থেরগুলো নয়—সেগুলো যথেষ্ট স্থিতিস্থাপক, যাতে একসঙ্গে কয়েকটি অনুভূতি ঢাকা পড়ে।
কান্নার মুখ মানে হতে পারে আনন্দে আপ্লুত, ঠাট্টা করে বিধ্বস্ত, সত্যিই আবেগাপ্লুত, কিংবা এত মজার যে কষ্ট হয়ে গেছে। এই দ্ব্যর্থতাই এর বৈশিষ্ট্য। এটি প্রেরককে প্রবল অনুভূতির ইঙ্গিত দিতে দেয়, কোনটি তা না বলেই—মানুষ উষ্ণ অথচ গম্ভীর নয় এমন হতে চাইলে ঠিক এটিই চান।
হাসতে-হাসতে-কান্নার মুখ হেরেছে উল্টো কারণে। এটির মানে একটিই, ব্যবহার হয়েছে অবিরাম—আর যে প্রতীকের মানে একটিই আর যা সর্বত্র, সেটি আর কোনো তথ্যই বহন করে না।
কেউ এগুলো গুনছে কেন
ইমোজির তালিকা প্রকাশ পায় হালকা বিনোদন হিসেবে, আর তৈরি হয় এমন কারণে যা মোটেই হালকা নয়।
প্ল্যাটফর্মগুলো এসব প্রতীক মাপে, কারণ লেখায় অনুভূতি বোঝার সবচেয়ে স্পষ্ট সংকেতগুলোর মধ্যে এগুলো পড়ে। ছোট একটি বার্তা সফটওয়্যারের পক্ষে পড়া কঠিন; নির্দিষ্ট একটি মুখ দিয়ে শেষ হওয়া বার্তা শ্রেণিবদ্ধ করা অনেক সহজ। ওই শ্রেণিবিন্যাস কাজে লাগে তদারকি ব্যবস্থায়, সুপারিশের ক্রম নির্ধারণে আর বিজ্ঞাপনের শ্রেণিকরণে।
এ কারণেই কোনো প্রতীকের আক্ষরিক অর্থ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া যাঁরা মাপছেন তাঁদের জন্য সত্যিকারের সমস্যা। কান্নার মুখ যদি এখন দুঃখের মতোই প্রায়ই আনন্দ বোঝায়, তবে একে দুঃখ ধরে প্রশিক্ষিত প্রতিটি ব্যবস্থা নীরবে ভুল করছে—আর ভেতর থেকে সেটি খেয়াল করা খুব কঠিন।
প্রতীক পুরোনো হয় যেভাবে
ধরনটি ইমোজির চেয়ে পুরোনো আর নির্ভরযোগ্যভাবে ফিরে আসে। সমসাময়িক হওয়ার কোনো চিহ্ন ছড়ায়, সর্বজনীন হয়, আর যাঁরা সবার আগে নিয়েছিলেন তাঁরা সরে যান—ঠিক এ কারণেই যে বাকি সবাই ধরে ফেলেছে। চিহ্নটি তখন হয়ে ওঠে সময়ের ছাপ—কবে এটি উদ্ভাবিত হয়েছিল তার নয়, ব্যবহারকারী কবে হালনাগাদ হওয়া থামিয়েছেন তার।
এ কারণেই “সঠিক ইমোজি ব্যবহার করুন” পরামর্শটি নিজেই নিজেকে হারায়। এখন যা সঠিক, তা সঠিক কারণ সেটি এখনো সর্বজনীন নয়—আর ঠিক যে মুহূর্তে এ ধরনের লেখায় তা ব্যাখ্যা করা হয়, মোটামুটি তখনই সেটি ভুল হয়ে যায়।
বাংলা ভাষার পাদটীকা
এই বৈশ্বিক তালিকাগুলো একটি জিনিস ধরতে পারে না। এ ধরনের হিসাবে প্রাধান্য থাকে ইংরেজি ভাষার বার্তা আদান-প্রদানের, আর বাংলা লেখার সঙ্গে ইমোজি যেভাবে জোড়া লাগে তা অভিন্ন নয়।
বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ চ্যাট হয় “বাংলিশে”—রোমান হরফে লেখা বাংলায়—যেখানে লেখাটিই অনানুষ্ঠানিকতা বহন করে, ফলে আনুষ্ঠানিক ইংরেজি লেখার তুলনায় ইমোজিকে সুর বোঝানোর কাজ কম করতে হয়। স্থানীয় রীতিও আছে, যা কোনো বৈশ্বিক উপাত্ত ধরে না: কোন প্রতীক গুরুজনকে পাঠানো চলে, কোনটি এখানে ইঙ্গিতপূর্ণ ঠেকে অথচ অন্যত্র নয়, আর গোটা উত্তর হিসেবে একটিমাত্র ইমোজি পাঠানোর বিশেষ বাংলাদেশি অভ্যাসটি।
কাজেই কান্নার মুখ এখানেও হয়তো জিতছে। কেবল ঠিক একই কারণে নয়—আর সেটি কেউ মাপছে না।




