প্রতারণা, জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে করা দুই মামলায় ফুডপান্ডা বাংলাদেশের পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বুধবার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন ঢাকার একটি আদালত; আসামিদের মধ্যে আছেন সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দা আম্বারীন রেজা। প্রতিষ্ঠানটির সহযোগী কোম্পানি বলছে, এরপর পাঁচজনই হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছেন; তারা কোনো অপরাধমূলক আচরণের কথা অস্বীকার করছে এবং বিষয়টিকে বলছে বাণিজ্যিক বিরোধ।
পরোয়ানা দোষী সাব্যস্ত হওয়া নয়। এখনো কোনো বিচার হয়নি, আর নিচের কোনো অভিযোগই আদালতে প্রমাণিত হয়নি। এখানে সেগুলো অভিযোগ হিসেবেই তুলে ধরা হলো, সঙ্গে কোম্পানির বক্তব্যসহ।
আদালত কী আদেশ দিলেন
গুলশান থানা-পুলিশের দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে দুই মামলায় পরোয়ানা জারি করেন ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জাশিতা ইসলাম। একটি মামলার প্রতিবেদন দেন উপপরিদর্শক মো. মশিউর রহমান, অন্যটির উপপরিদর্শক মো. সাখাওয়াত হোসেন; দ্য ডেইলি স্টার বলছে, প্রতিবেদন দুটি জমা পড়েছিল এ বছরের জুন ও জুলাই মাসে। আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাদীপক্ষের আইনজীবী কাজী মাফিজুল ইসলাম।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছাড়া বাকি আসামিরা হলেন সহপ্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক জুবায়ের সিদ্দিকী, হেড অব ক্যাটাগরি দিলারা ফারুক, ডিরেক্টর অব ডেলিভারি মো. তাবারেজ খান (ভারতীয় নাগরিক) এবং সিনিয়র ম্যানেজার ও পরিচালক মোহাম্মদ সাজেদুল হক।
অভিযোগে কী বলা হয়েছে
মামলা দুটি গত বছরের ৩ জুলাই করেন ব্যবসায়ী শিহাব মাহমুদ বশির, যিনি ফুডপান্ডার কুইক-কমার্স শাখা পান্ডামার্টে পণ্য সরবরাহ করতেন। তিনটি সংবাদপত্র তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম তিন রকম লিখেছে—নিউ এজ লিখেছে প্রোটিন অ্যান্ড পেরিশেবল, ডেইলি স্টার লিখেছে আইপিইএল ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক, আর দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড লিখেছে ফার্স্ট টেলি সেলস কোম্পানি, যা আমদানি করত আইপিএলই ইলেকট্রনিকসের মাধ্যমে—যা থেকে মনে হয়, মামলাগুলোতে একাধিক সরবরাহ-ধারা জড়িত।
নিউ এজের বিবরণ অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুন থেকে দেশি ও আমদানি করা ফলমূল-শাকসবজি সরবরাহ শুরু হয়, প্রথমদিকে অর্থ পরিশোধ নিয়মিতই ছিল, অনিয়মের অভিযোগ পরের। অভিযোগ, ১ লাখ টাকার ক্রয়াদেশের বিপরীতে তাঁর হিসাবে জমা পড়ে ১ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত অঙ্ক। আরও অভিযোগ, পণ্য ফেরত দেখিয়ে এবং একই দিনে একাধিক জায়গায় কাল্পনিক ব্যক্তির সই দিয়ে "রিটার্ন টু ভেন্ডর" স্লিপ বানিয়ে টাকা সরানো হয়েছে। দুই মামলায় অঙ্কটি ধরা হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড আরেকটি ধারার কথা বলছে: ২০২২ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় আড়াই কোটি টাকার গৃহস্থালি ও রান্নাঘরের সামগ্রী এবং মোবাইল আনুষঙ্গিক সরবরাহ, যার মধ্যে প্রায় দেড় কোটি টাকা পরিশোধ হয় আর প্রায় এক কোটি টাকা বকেয়া থাকে; চুক্তির শর্ত ভেঙে ভ্যাট, কর ও বিজ্ঞাপন বাবদ প্রায় ১০ লাখ টাকা কর্তন; আর গত বছরের জুনে পাওনা চাইতে প্রতিনিধি পাঠালে তাঁকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ। চার মামলা মিলিয়ে ওই পত্রিকাটি অঙ্ক বলছে প্রায় ৬ কোটি টাকা।
ফুডপান্ডার পক্ষ কী বলছে
জবাব দেওয়া ফুডপান্ডার সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডেলিভারি হিরো স্টোরস বলেছে, তারা বাংলাদেশের আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়াকে সম্মান করে ও মেনে চলে, এবং অভিযোগের বিরুদ্ধে লড়বে; তাদের অবস্থান, কর্মীরা অপরাধ বলে গণ্য হয় এমন কোনো আচরণ করেননি। পরোয়ানাকে তারা বলেছে "এ ধরনের মামলায় একটি প্রক্রিয়াগত ধাপ", আর জানিয়েছে, সব কর্মীর জন্য হাইকোর্ট থেকে জামিন আগেই নেওয়া হয়েছে।
মামলার সূত্রপাত নিয়ে তাদের বর্ণনা বাদীর বর্ণনা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কোম্পানিটি বলছে, চারটি ফৌজদারি মামলাই হয়েছে বাদীর ইস্যু করা প্রত্যাখ্যাত চেক নিয়ে চলমান একটি বাণিজ্যিক বিরোধের মধ্যে, যেখানে ডেলিভারি হিরো স্টোরসেরই টাকা পাওনা রয়ে গেছে; আর এই প্রেক্ষাপট নাকি "জোরালোভাবে ইঙ্গিত করে" যে মামলাগুলো প্রতিশোধমূলক—নিজের দায় এড়াতে ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা। তারা আরও বলছে, একই থানা চারটি মামলারই তদন্ত করেছে, আর দুটি প্রতিবেদনে কোনো অপরাধমূলক উপাদান পাওয়া যায়নি এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে টাকা পাওনা তাদেরই। বিরোধটি যে চুক্তিভিত্তিক এবং এতে কর্মীদের কোনো ফৌজদারি দায় নেই, তা আদালতে প্রতিষ্ঠা করতে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ বলেও জানিয়েছে।
এটি এখানে কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের বড় প্রযুক্তি নিয়োগদাতা ও প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি ফুডপান্ডা, আর পান্ডামার্ট দাঁড়িয়ে আছে হাজারো সরবরাহকারী আর লাখো অর্ডারের মাঝখানে। ফল যা-ই হোক, মামলাটি ঘুরছে সাদামাটা ও বহুল প্রচলিত একটি বিষয়ের ওপর: একটি প্ল্যাটফর্ম ডেলিভারি, ফেরত ও কর্তন কীভাবে লিপিবদ্ধ করে, আর দুই পক্ষের খতিয়ান না মিললে সরবরাহকারী কী প্রমাণ করতে পারেন।
ছকটি চেনা। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে, ই-কমার্স ধসের তুঙ্গে, পাওনা টাকা নিয়ে এক সরবরাহকারী মামলা করেছিলেন ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী, তাঁর স্ত্রী ও আরও ২৫ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। সেই অধ্যায় শেষ হয়েছিল ডিজিটাল বাণিজ্যের সুশাসন নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের হিসাব-নিকাশে। এটি ভিন্ন এক কোম্পানি, ভিন্ন অবস্থানে, আর এখানকার অভিযোগ বিতর্কিত ও অপ্রমাণিত—কিন্তু চাপের জায়গাটি একই, আর পাঁচ বছরেও তার সমাধান হয়নি।
ওপরে উদ্ধৃত কোম্পানির বক্তব্য ২৩ সেপ্টেম্বর ডেলিভারি হিরো স্টোরসের সংবাদমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতি থেকে নেওয়া। মামলার অগ্রগতি অনুযায়ী প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।




