ব্যবহারকারীর অবস্থানের তথ্য (লোকেশন ডেটা) যেভাবে সামলেছে, তার জন্য গুগলকে ৪০৩ মিলিয়ন ইউরো (প্রায় ৩৪৫ মিলিয়ন পাউন্ড বা ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা) জরিমানা করেছে আয়ারল্যান্ডের ডেটা প্রোটেকশন কমিশন (ডিপিসি)। সোমবার ঘোষিত এই জরিমানা আইরিশ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড়গুলোর একটি; ইউরোপের কয়েকটি ভোক্তা অধিকার সংগঠনের অভিযোগের পর ছয় বছর আগে শুরু হওয়া তদন্তের এটাই সমাপ্তি।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা যা পেয়েছে
ডিপিসি গুগল অ্যাকাউন্টের তিনটি সুবিধা খতিয়ে দেখেছে: ওয়েব অ্যান্ড অ্যাপ অ্যাক্টিভিটি, লোকেশন হিস্ট্রি ও লোকেশন অ্যাকুরেসি—এবং ২০১৮ সালের ২৫ মে (যেদিন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাধারণ তথ্য সুরক্ষা বিধি বা জিডিপিআর কার্যকর হয়) থেকে ২০২০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেগুলো কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। সংস্থাটির সিদ্ধান্ত: গুগল লোকেশন ডেটা এমনভাবে প্রক্রিয়া করেছে, যা "বৈধ", "ন্যায্য" বা "স্বচ্ছ" ছিল না—ব্যক্তিগত তথ্য নাড়াচাড়ার জন্য জিডিপিআরের এই তিনটিই মৌলিক শর্ত।
ডেপুটি কমিশনার গ্রাহাম ডয়েল বলেন, লোকেশন ডেটা "একজন মানুষের সম্পর্কে বিপুল তথ্য প্রকাশ করতে পারে, যার মধ্যে সহজাতভাবে ব্যক্তিগত তথ্যও আছে"। গুগলের ব্যর্থতার কারণে মানুষ "জানতেই পারেনি যে তাদের অবস্থান ব্যবহার করে, যেমন, বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রভাবিত করা হচ্ছে বা তাদের আগ্রহ অনুমান করা হচ্ছে, এবং তারা নিজেদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারত"। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় তথ্য ধরে রাখা সেই নিয়ন্ত্রণহীনতাকে আরও বাড়িয়েছে, বলেন তিনি।
জরিমানার পাশাপাশি গুগলকে ছয় মাসের মধ্যে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ নিয়মের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গুগলের জবাব
গুগল বলছে, মামলাটি "পুরোনো নীতিমালা নিয়ে, যা এরই মধ্যে হালনাগাদ করা হয়েছে"। ২০১৯ সাল থেকে তারা "শিল্পে প্রথম" অটো-ডিলিট নিয়ন্ত্রণ চালু করেছে, যাতে যে কেউ প্রতি ৩, ১৮ বা ৩৬ মাস পরপর অ্যাকাউন্টের কার্যক্রমের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে ফেলার ব্যবস্থা করতে পারেন; ব্যক্তিগতকৃত বিজ্ঞাপন পুরোপুরি বন্ধ করার সহজ সুইচ এসেছে; আর লোকেশন সেটিংস কী করে, তার ব্যাখ্যা এক জায়গায় আনা হয়েছে। আয়ারল্যান্ডে গুগলের ইউরোপীয় সদর দপ্তর, তাই পুরো ইইউতে গুগলের জিডিপিআর মেনে চলার প্রধান তদারককারী ডিপিসি-ই।
বাংলাদেশের মানুষের কেন মাথাব্যথা
জিডিপিআর বাংলাদেশের কাউকে সুরক্ষা দেয় না, আর দেশে এখনো স্বাধীন কোনো তথ্য সুরক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থা নেই; ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২২ সাল থেকে খসড়া আর বিতর্কের মধ্যেই আছে। কিন্তু রায়ে উল্লিখিত তিনটি সেটিংস ডাবলিনের মতো ঢাকার প্রতিটি অ্যান্ড্রয়েড ফোনেও একই, আর সেগুলো কী করে তা বদলায়নি: ওয়েব অ্যান্ড অ্যাপ অ্যাক্টিভিটি আপনার সার্চ ও অ্যাপ ব্যবহারের হিসাব রাখে, লোকেশন হিস্ট্রি (এখন নাম টাইমলাইন) ফোন কোথায় কোথায় গেছে তার ডায়েরি রাখে, আর লোকেশন অ্যাকুরেসি জিপিএস না পেলে ওয়াই-ফাই ও মোবাইল নেটওয়ার্ক দিয়ে ফোনের অবস্থান বের করার অনুমতি দেয়। আপনি যে বিজ্ঞাপন দেখেন, দোকানের "পপুলার টাইমস", গুগল ম্যাপসের যানজট—সবই ওই তথ্য দিয়ে তৈরি।
নিজের সেটিংস যেভাবে দেখবেন
- myactivity.google.com-এ যান (বা ফোনে Settings → Google → Manage your Google Account → Data & privacy)।
- History settings-এর নিচে Web & App Activity খুলুন। বন্ধ করে দিন, অথবা চালু রেখে Auto-delete ৩ মাসে নামিয়ে আনুন; ডিফল্ট ১৮ মাস।
- Timeline (লোকেশন হিস্ট্রি) খুলুন। ২০২৪ সাল থেকে এটি ক্লাউডে নয়, ফোনেই থাকে; মুছে ফেলতে বা বন্ধ করতে পারেন।
- ফোনে Settings → Location → Location services → Google Location Accuracy-এ যান। বন্ধ করলে ম্যাপ আপনাকে খুঁজে পেতে একটু বেশি সময় নেবে, তবে ওয়াই-ফাই স্ক্যান বন্ধ হবে।
- My Ad Centre-এ গিয়ে ব্যক্তিগতকৃত বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিন, যদি সাধারণ বিজ্ঞাপনই দেখতে চান।
এতে গুগলের কোনো সেবা বন্ধ হয় না; শুধু ঠিক হয়, কোম্পানিটি আপনার সম্পর্কে কতটা মনে রাখবে। আইরিশ রায় মনে করিয়ে দিল, প্রায় দুই বছর ধরে গুগল আপনাকে যা বলেছিল, তার চেয়ে বেশি মনে রেখেছিল।




