প্রযুক্তি

মনের কথা ফেসবুক জানে কীভাবে? মাইক্রোফোন দিয়ে নয়

এসি কেনার কথা ভাবলেন, কাউকে বললেন না, আর ফিড ভরে গেল এসির বিজ্ঞাপনে। আসল প্রক্রিয়াটি কী, "ফোন শোনে" তত্ত্ব কেন ভুল, আর যে সেটিংসে তা বন্ধ হয়।

মনের কথা ফেসবুক জানে কীভাবে? মাইক্রোফোন দিয়ে নয়

ঢাকার বেসরকারি চাকরিজীবী জাহিদ হোসেন তাপপ্রবাহের মধ্যে ঠিক করলেন, কিস্তিতে একটি এসি কিনবেন। কাউকে বললেন না, পরিবারকেও না। দাম দেখতে ফেসবুক খুলে দেখলেন, ফিড এরই মধ্যে এসির বিজ্ঞাপনে ভরা—ইএমআইয়ের অফারসহ। তাঁর প্রশ্নটিই একসময় সবার প্রশ্ন: ফেসবুক জানল কীভাবে?

মাইক্রোফোন নয়

জনপ্রিয় তত্ত্ব: অ্যাপটি গোপনে ফোনের মাইক্রোফোনে কান পাতে। ফেসবুক বরাবর তা অস্বীকার করেছে, আর নিরাপত্তা গবেষকদের স্বাধীন পরীক্ষায় কখনো অ্যাপটিকে অডিও রেকর্ড করতে দেখা যায়নি; তা করলে ব্যাটারি ফুরাত, আর হাজারো প্রকৌশলী যে নেটওয়ার্ক ট্রাফিক দেখেন, তাতে ধরা পড়ত। সত্যটা কম নাটকীয়, এবং এক অর্থে আরও খারাপ: ফেসবুকের শোনার দরকার নেই, কারণ আপনি অন্যভাবে তাকে বলে দিয়েছেন।

আসলে যেভাবে কাজ করে

  • ফেসবুকে আপনি যা করেন। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও মেসেঞ্জারে যে পোস্টে থামেন, লাইক, মন্তব্য বা শেয়ার করেন—সব আগ্রহের প্রোফাইলে জমা হয়। বন্ধুর নতুন এসির ছবিতে থামাটাও গোনা হয়।
  • ফেসবুকের বাইরে যা করেন। বেশির ভাগ কেনাকাটার ওয়েবসাইট আর অনেক অ্যাপে থাকে মেটা পিক্সেল বা এসডিকে—একটুকরো কোড, যা আপনার ভিজিটের খবর ফেসবুককে পাঠায়। বাংলাদেশি কোনো দোকানের সাইটে "এসির দাম" খুঁজলে কয়েক সেকেন্ডে ফেসবুক জানে। সেটিংসে এর নাম অফ-ফেসবুক অ্যাকটিভিটি, আর তালিকাটা সাধারণত লম্বা।
  • ফোনের বিজ্ঞাপন আইডি। অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএস প্রতিটি ফোনকে একটি আইডি দেয়, যা অ্যাপগুলো বিজ্ঞাপন নেটওয়ার্কের সঙ্গে ভাগ করে; তাই শপিং অ্যাপের খোঁজ আপনার ফেসবুক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা যায়।
  • আপনার মতো মানুষ। সরাসরি কোনো সংকেত না থাকলেও ফেসবুক অনুমান করে: ঢাকার ৩৫ বছরের বেতনভুক পুরুষ, মে মাস, যাঁর বন্ধুরা এসি দেখছেন—তিনি এসির বিজ্ঞাপন পান। এটি "লুকঅ্যালাইক" টার্গেটিং, আর এতেই বিজ্ঞাপন মন পড়ার মতো লাগে।

জাহিদ প্রায় নিশ্চিতভাবেই কোনো দোকানের ওয়েবসাইটে গিয়েছিলেন বা চলতে চলতে এসির বিজ্ঞাপনে টোকা দিয়েছিলেন; ফেসবুক অ্যাপ যে কয়েক শ মেগাবাইট ক্যাশ চুপচাপ জমায়, তা-ই দেখায় আপনি না তাকালেও এটি কতটা আনে ও অনুসরণ করে।

বন্ধ করবেন যেভাবে

  1. ফেসবুক অ্যাপ: Settings → Your information → Off-Facebook Activity। ইতিহাস মুছুন, ভবিষ্যতের অ্যাকটিভিটি বন্ধ করুন।
  2. Settings → Ads: "ads based on data from partners" বন্ধ করুন, আগ্রহের বিভাগগুলো দেখে নিন।
  3. আইফোন: কোনো অ্যাপ ট্র্যাক করতে চাইলে Ask App Not to Track বেছে নিন। অ্যান্ড্রয়েড: Settings → Privacy → Ads-এ বিজ্ঞাপন আইডি মুছুন বা রিসেট করুন।
  4. কেনাকাটায় ট্র্যাকার আটকানো ব্রাউজার ব্যবহার করুন, আর সেই ব্রাউজারে ফেসবুক থেকে লগ আউট থাকুন।

এতে বিজ্ঞাপন থামে না; বোকা হয়। কারও কারও জন্য সেটিই লক্ষ্য।

অ্যাপল হস্তক্ষেপ করার পর যা বদলাল

ওপরে বর্ণিত নজরদারি নির্ভর করত অ্যাপগুলো অন্য অ্যাপ ও সাইটে আপনাকে অনুসরণ করতে পারছে কি না তার ওপর। ২০২১ সালের এপ্রিলে অ্যাপল অনুমতিটিকে স্পষ্ট করে দেয়: আইফোন সরল একটি বার্তায় জিজ্ঞাসা করতে শুরু করে, অন্য প্রতিষ্ঠানের অ্যাপে কোনো অ্যাপ আপনাকে অনুসরণ করতে পারবে কি না। বেশির ভাগ মানুষ না বলেছেন।

প্রভাবটি মাপা গেছে এমন মাত্রায়, গোপনীয়তার খুব কম পরিবর্তনই যেখানে পৌঁছায়। মেটা বিনিয়োগকারীদের জানায়, পরিবর্তনটিতে ২০২২ সালে তাদের আয় কমবে প্রায় ১,০০০ কোটি ডলার, আর খবরে শেয়ারের দাম পড়ে যায় ব্যাপকভাবে। অ্যান্ড্রয়েডে সমতুল্য নিয়ন্ত্রণ এসেছে ধীরে, আর এখনো তা দুর্বল। এই অসমতাই ব্যবহারিক কথা: একই অ্যাকাউন্ট দুটি ফোনে আলাদা পরিমাণ তথ্য ফাঁস করে—আর অ্যান্ড্রয়েড হ্যান্ডসেটে আগের অংশের সেটিংসগুলোকেই বেশি কাজ করতে হয়।

সূত্র: Prothom Alo

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি ঢাকাভিত্তিক একটি স্বাধীন প্রযুক্তি প্রকাশনা, প্রকাশিত হয় বাংলা ও ইংরেজিতে। লেখাগুলো আলাদা লেখকের নামে নয়, প্রকাশনার নামেই প্রকাশিত হয়; সংশোধন বা সূত্র নিয়ে প্রশ্ন পাঠানো যায় info@tech-bd.com ঠিকানায়।