তিন সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো ভারতীয় কার্টুনিস্ট সতীশ আচার্য দেখলেন, ইনস্টাগ্রামে তিনি কার্যত অদৃশ্য—নিজের দেশেই।
৫৫ বছর বয়সী এই শিল্পী মঙ্গলবার জানতে পারেন, ভারতে তাঁর অ্যাকাউন্ট আবারও কিছু সময়ের জন্য বন্ধ করা হয়েছে, আর মঞ্চটির পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা নেই। সেখানকার ব্যবহারকারীরা সার্চ করেও তাঁর প্রোফাইল পাচ্ছিলেন না, ওয়েব লিংক দিয়েও ঢুকতে পারছিলেন না। যাঁরা চেষ্টা করেছেন, তাঁরা দেখেছেন একটি বার্তা—ভারতের ইনফরমেশন টেকনোলজি রুলসের আওতায় এটি অনুপলভ্য।
প্রথম দফা চলেছিল ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত। দ্বিতীয় দফা এ সপ্তাহে, তিন দিন।
বিবিসির নিকিতা যাদবকে আচার্য বলেন, ‘মেটার মঞ্চগুলো কয়েক বছর ধরেই আমার কার্টুনের নাগাল কমিয়ে রাখছে। কিন্তু যখন ভারতে আমার পুরো প্রোফাইলই আটকে দেওয়া হলো, তখন একটু কষ্ট পেয়েছিলাম।’
তিনি মেটাকে লিখেছিলেন, উত্তর পাননি। আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, এমন সময় অক্টোবরের শুরুতে অ্যাকাউন্টটি নিজে থেকেই ফিরে আসে—তারপর আবার অন্ধকার।
তিনি একা নন
কয়েক সপ্তাহ আগে কার্টুনিস্ট মঞ্জুল দেখেন, ভোটার তালিকার বিতর্কিত সংশোধন নিয়ে ভারতের নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করা তাঁর একটি পোস্টে বিধিনিষেধ বসিয়েছে ইনস্টাগ্রাম। তাঁর প্রোফাইল চালু ছিল; পোস্টটি নয়।
মেটা বিবিসিকে জানিয়েছে, ভারতের আইটি রুলস মেনে চলতে তারা সাময়িকভাবে অ্যাকাউন্টে বিধিনিষেধ দিতে পারে, তবে কোনো ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট কারণ তারা ব্যাখ্যা করেনি।
এই বিধি কর্তৃপক্ষ ও আদালতকে মঞ্চগুলোকে কনটেন্ট সরানো বা আটকানোর আদেশ দেওয়ার সুযোগ দেয়। সরকার বলছে, এতে বেআইনি উপাদান সামলাতে সুবিধা হয়। শিল্পী ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষের মানুষেরা বলছেন, এটি রাজনৈতিক ব্যঙ্গের বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে।

যে সংখ্যাটি কেউ আশা করেনি
তথ্য অধিকার আবেদনের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য দিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগ পোর্টালের মাধ্যমে ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও ইউটিউবসহ বিভিন্ন মঞ্চে সরকারি সংস্থাগুলো পাঠিয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার নিষেধাজ্ঞা ও কনটেন্ট-বিধিনিষেধের আদেশ।
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায় না শেষ পর্যন্ত কতগুলো পোস্টে বিধিনিষেধ বসেছে বা সরানো হয়েছে, আর বিবিসি জানিয়েছে তারা মূল উত্তরটি দেখেনি। তবে কেবল সংখ্যাটিই সমস্যার চেহারা বদলে দেয়: এই মাত্রায় বিধিনিষেধ আর আলাদা আলাদা সিদ্ধান্তের সারি থাকে না, যা কেউ পুনর্বিবেচনা করতে পারে—তা হয়ে ওঠে একটি প্রক্রিয়া।
প্রযুক্তিনীতি বিশেষজ্ঞ প্রতীক ওয়াঘরে বলছেন, মঞ্চভেদে সাড়া আলাদা। তাঁর মতে মেটাকে ‘মেনে নিতে বেশি আগ্রহী’ মনে হয়, আর এক্স বরং পাল্টা দাঁড়াতে বেশি রাজি—যদিও প্রকাশ্য তথ্য কম থাকায় তুলনা কঠিন। তাঁর এই মূল্যায়ন নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি মেটা।
খবর অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ আরও এগিয়ে মেটাকে বলেছে, তাদের ব্যবস্থা যেন ব্যবহারকারীদের ‘একটিমাত্র বা সীমিত কিছু বয়ানের’ দিকে না ঠেলে, আর ‘জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে বা সহিংসতা উসকে দিতে পারে’ এমন কনটেন্টের ওপর যাচাই যেন জোরদার হয়। ভারতের আইটি মন্ত্রণালয় বিবিসিকে কোনো উত্তর দেয়নি।
কার্টুন কেন, আর এখনই কেন
ভারতে রাজনৈতিক ভিন্নমতের দৃশ্যমান অংশ হয়ে উঠেছে ব্যঙ্গ, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। জুলাইয়ে শিক্ষা ও চাকরি নিয়ে যে আন্দোলন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে গিয়ে শেষ হয়, তাতে জ্বালানি জুগিয়েছিল মিম ও জেন-জি রসিকতা। এরপর ১৩ কোটি নাম বাদ পড়া ভোটার তালিকার সংশোধন নিয়ে অনলাইনে তর্ক আরও বেড়েছে।
মঞ্চগুলোর রাজনৈতিক ওজন কারও অজানা নয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিজেপি মন্ত্রীদের অনলাইনে উপস্থিতি বাড়াতে ও তরুণ দর্শকের কাছে পৌঁছাতে বলেছে।
ধরনে এর কিছুই নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই ভারতীয় সাংবাদিকতার অঙ্গ কার্টুন—আর কে লক্ষ্মণের ‘কমন ম্যান’ তার অন্যতম পরিচিত সৃষ্টি। সত্তরের দশকের জরুরি অবস্থার সময় আবু আব্রাহাম আঁকা চালিয়ে গেছেন, আর তাঁর ডজনখানেক কার্টুনে সিল পড়েছে ‘সেন্সরে পাস হয়নি’। ২০১২ সালে সংবিধানকে বিদ্রুপের অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার হন কার্টুনিস্ট অসীম ত্রিবেদী; অভিযোগ পরে তুলে নেওয়া হয়।
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে ভারতের অবস্থান এখন ১৫৭তম। সরকার এ সমালোচনা মানে না, বলছে ভারতের সংবাদমাধ্যম স্বাধীন ও প্রাণবন্তই আছে। মোদিকে নিয়ে রসিকতার জন্য পরিচিত কৌতুকশিল্পী কুনাল কামরা মুখোমুখি হয়েছেন হুমকি, বাতিল হওয়া অনুষ্ঠান ও আইনি পদক্ষেপের।
কার্টুনিস্টরা এ নিয়ে যা বলছেন
ভারতের একটি শীর্ষ দৈনিকের কার্টুনিস্ট সন্দীপ অধ্বর্যু বলেন, ‘আমরা একরকম স্বাভাবিক বিরোধী দল।’ ‘এই কাজের ধর্মই হলো বিরোধিতা করা’—সাংবাদিকদের মতো কার্টুনিস্টদেরও ক্ষমতায় যে-ই থাকুন, তাঁকে প্রশ্ন করতে হবে।
নিজের অতীত দিয়েই একই কথা বলছেন আচার্য। ২০১৪ সালের আগে তাঁর অনেক কার্টুনের লক্ষ্য ছিল কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন সরকার, আর বিজেপি নেতারা সেগুলো শেয়ার করতেন।
যে অংশটি সীমানা পেরোয়
যেখানেই রাজনৈতিক তর্ক অন্য দেশের মালিকানার মঞ্চে উঠে গেছে—বাংলাদেশসহ—সেখানেই এই পদ্ধতিটি বোঝা দরকার। একটি আইনি আদেশ যায় একটি কোম্পানির কাছে। কোম্পানি তা মানে, বা আংশিক মানে। যাঁর ওপর প্রভাব পড়ল, তিনি জানতে পারেন নিজের কাজ উধাও হয়ে গেছে দেখে, আর তাঁকে কেবল জানানো হয় কোন বিধির কথা বলা হয়েছে।
এই নকশার একটি নির্দিষ্ট পরিণতি আছে: এমন কোনো মুহূর্তই থাকে না, যখন সিদ্ধান্তটি যে দুই পক্ষ নিয়েছে তারা ছাড়া আর কারও চোখে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত নির্মাতার হাতে যে প্রতিকার থাকে—মঞ্চকে লিখুন, উত্তর না পান, তারপর মামলার খরচের হিসাব করুন—তা দেশ নির্বিশেষে একই। এ কারণেই আদেশের সংখ্যাটি, যা প্রকাশ্যে এসেছে কেবল কারও তথ্য অধিকার আবেদনের কারণে, এই খবরের সবচেয়ে কাজের তথ্য।




