বিশ্ব

আট মাস পর সামাজিক মাধ্যম আবার চালু করল গ্যাবন, যে দেশে ইন্টারনেট বন্ধ রাখা ছিল পুরোনো সরকারের অভ্যাস

২৫ লাখ মানুষের জন্য আবার খুলেছে ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রাম। মাঝের আট মাস জাতীয় পর্যায়ে কিছু বন্ধ রাখলে আসলে কী হয়, তার একটি সংক্ষিপ্ত পাঠ।

আট মাস পর সামাজিক মাধ্যম আবার চালু করল গ্যাবন, যে দেশে ইন্টারনেট বন্ধ রাখা ছিল পুরোনো সরকারের অভ্যাস

আট মাস আগে আরোপ করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে গ্যাবন। শনিবার টেলিভিশনে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই সিদ্ধান্ত বদলের কথা জানায় দেশটির হাই কমিউনিকেশন অথরিটি (এইচএসি); বিবিসি নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির মন্তব্য চেয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছিল ১৭ ফেব্রুয়ারি, আর এইচএসি বলেছিল অনলাইন কনটেন্ট সংঘাতে ইন্ধন জোগাচ্ছে ও বিভাজন গভীর করছে।

কী বন্ধ হলো, আর কাদের জন্য

প্রায় ২৫ লাখ মানুষের মধ্য আফ্রিকার এই দেশে সিদ্ধান্তটি এসেছিল ধাক্কার মতো, যেখানে ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রাম বিশেষভাবে জনপ্রিয় তরুণদের কাছে—বিনোদনের মতোই ব্যবসার জন্যও।

শেষ তথ্যটিই ধরে রাখার মতো। যে দেশে ছোট ব্যবসায়ীরা ফেসবুক ও টিকটকের মাধ্যমে ক্রেতার কাছে পৌঁছান, সেখানে সামাজিক মাধ্যম বন্ধ করা কেবল তর্কের ওপর বিধিনিষেধ নয়। তা আয়ের ওপর বিধিনিষেধ।

গ্যাবনের বহু মানুষ সাড়া দিয়েছেন যেভাবে জনসাধারণ সাধারণত দেন: তাঁরা ভিপিএন-এ চলে গিয়ে কাজ চালিয়ে গেছেন।

কারণসহ ঘোষণা, সিদ্ধান্ত ছাড়াই প্রত্যাহার
১৭ ফেব্রুয়ারি সামাজিক মাধ্যম বন্ধ করে আট মাস পর ফিরিয়ে দিল গ্যাবন। কাজ হয়েছিল কি না, তার প্রকাশিত মূল্যায়ন নেই। গ্রাফিক: টেক বিডি।

এর চারপাশের রাজনীতি

নিষেধাজ্ঞাটি আসে যখন প্রেসিডেন্ট ব্রিস ওলিগি এনগেমা সামাজিক অসন্তোষের ঢেউয়ের মুখে, নিজের নির্বাচনের এক বছরও পেরোয়নি। কম বেতন ও খারাপ কর্মপরিবেশের অভিযোগে ধর্মঘট করেছিলেন শিক্ষক ও সরকারি কর্মচারীরা।

বিরোধী পক্ষ এই স্থগিতাদেশকে বলেছে ক্ষমতার অপব্যবহার।

গত বছরের নির্বাচনে এনগেমা জেতেন ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে, তাঁর নেতৃত্বে হওয়া অভ্যুত্থান বঙ্গো পরিবারের পাঁচ দশকেরও বেশি শাসনের অবসান ঘটানোর দুই বছর পর। তখন তিনি গ্যাবনের সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—তেল ও কাঠে সমৃদ্ধ ছোট এই দেশে, যেখানে বিবিসির ভাষ্যমতে, আগের সরকারগুলো তথ্য নিয়ন্ত্রণ করতে ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট ব্যবহার করেছে।

এই বাক্যটিই আট মাসকে ওজন দেয়। বন্ধ রাখা কোনো নতুন উদ্ভাবন ছিল না। এটি ছিল আগের প্রশাসনের হাতিয়ার, যা ব্যবহার করল তাদের জায়গায় আসা সরকারই।

আট মাস বন্ধ রেখে কী হলো

প্রকাশ্য তথ্য কী দেখায় আর কী দেখায় না, তা সোজাসুজি বলা দরকার।

ঘোষিত লক্ষ্য ছিল অনলাইন কনটেন্টকে সংঘাত ও বিভাজনে ইন্ধন জোগানো থেকে ঠেকানো। নিষেধাজ্ঞার আগের ধর্মঘটগুলো ছিল বেতন ও কর্মপরিবেশ নিয়ে—এমন অভিযোগ, যার কোনো সুরাহা মঞ্চ বন্ধ করে হয় না। মঞ্চ সরিয়ে দিয়ে অসন্তোষ মিটেছে এমন খবর আসেনি, আর মঞ্চগুলো এখন ফিরেও এসেছে।

নিষেধাজ্ঞাটি নিশ্চিতভাবে যা তৈরি করেছে, তা হলো ভিপিএনের অভ্যাস। একটি জনগোষ্ঠী একবার বাধা এড়িয়ে চলা শিখে গেলে, বাধা উঠে গেলেই সে জ্ঞান মুছে যায় না। পরের বিধিনিষেধ গিয়ে পড়ে আরও প্রস্তুত এক জনসমষ্টির ওপর, আর যে ট্রাফিককে দৃশ্যমান করার কথা ছিল, তা দেখা আরও কঠিন হয়ে যায়।

এটি দূরের কোনো খবর নয় কেন

নেটওয়ার্কে বিধিনিষেধের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশেরও আছে, আর তার পক্ষে দেওয়া যুক্তিগুলো এইচএসির ব্যবহার করা যুক্তির কাছাকাছিই ছিল: অনলাইন কনটেন্ট একটি অস্থির পরিস্থিতিকে উসকে দিচ্ছে, আর ব্যবস্থাটি সাময়িক।

গ্যাবনের ঘটনাটি কাজের ঠিক এ কারণেই যে এটি এখন শেষ হয়েছে, ফলে পুরো বৃত্তটি একসঙ্গে পড়া যায়—মাঝখানে দাঁড়িয়ে তর্ক করতে হয় না। একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা জরুরি ব্যবস্থা ঘোষণা করল। ব্যবস্থাটি চলল আট মাস। মানুষ মানিয়ে নিল কয়েক দিনেই। ওই মঞ্চগুলোর ওপর নির্ভরশীল ব্যবসাগুলো হারাল এই সময়টুকু। আর সিদ্ধান্ত বদল যখন এল, তা এল টেলিভিশনের বিবৃতি হিসেবে—জিনিসটি আদৌ কাজ করেছিল কি না, তার প্রকাশিত কোনো মূল্যায়ন হিসেবে নয়।

আরেকটি দিকও আছে। আট মাস ধরে যে তরুণেরা ফেসবুক ও টিকটকে ক্রেতার কাছে পৌঁছাতেন, তাঁদের ক্ষতির কোনো হিসাব কোথাও নেই, আর ক্ষতিপূরণেরও প্রশ্ন ওঠেনি। নিষেধাজ্ঞার খরচ বহন করেন তাঁরা, যাঁদের নাম কোনো নথিতে থাকে না—ছোট ব্যবসায়ী, ফ্রিল্যান্সার, অনলাইনে পড়ানো শিক্ষক। আর ভিপিএন যাঁরা চালাতে শিখেছেন, তাঁদের তথ্য এখন যাচ্ছে এমন সব সেবার মধ্য দিয়ে, যেগুলোর মালিক কে তা তাঁরা জানেন না—অর্থাৎ নিরাপত্তার নামে নেওয়া পদক্ষেপ একটি নতুন নিরাপত্তাঝুঁকিও তৈরি করে যায়।

শেষ ফাঁকটিই লক্ষ করার মতো। বন্ধ করার ঘোষণা আসে কারণসহ, আর তুলে নেওয়া হয় কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই। এই চক্রের কোনো পর্যায়েই কাউকে দেখাতে হয় না যে আট মাসে কী পাওয়া গেল—এ কারণেই পরেরবার আদেশ দেওয়া আগের চেয়ে সহজ হয়।

আরও পড়ুন: ভারতের কার্টুনিস্ট ও তাঁদের সরিয়ে দেওয়া আদেশগুলো।

সূত্র: বিবিসি

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি ঢাকাভিত্তিক একটি স্বাধীন প্রযুক্তি প্রকাশনা, প্রকাশিত হয় বাংলা ও ইংরেজিতে। লেখাগুলো আলাদা লেখকের নামে নয়, প্রকাশনার নামেই প্রকাশিত হয়; সংশোধন বা সূত্র নিয়ে প্রশ্ন পাঠানো যায় info@tech-bd.com ঠিকানায়।