বিশ্ব

অ্যানথ্রপিকের ৩৩৫ পৃষ্ঠার নথি: বিনিয়োগকারীর দুশ্চিন্তার কারণ লোকসান নয়, বরং পাঁচ গ্রাহকেই ব্যবসার এক-চতুর্থাংশ

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হতে পারে এমন শেয়ার তালিকাভুক্তির কাগজপত্র প্রকাশ্যে এসেছে। অস্তিত্বের ঝুঁকির ভাষা সেপ্টেম্বর থেকেই ছিল। গ্রাহক-কেন্দ্রীভবনের তথ্যটি ছিল না।

অ্যানথ্রপিকের ৩৩৫ পৃষ্ঠার নথি: বিনিয়োগকারীর দুশ্চিন্তার কারণ লোকসান নয়, বরং পাঁচ গ্রাহকেই ব্যবসার এক-চতুর্থাংশ

যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার আগে যে কাগজপত্র জমা দিতে হয়, অ্যানথ্রপিক তা প্রকাশ করেছে—৩৩৫ পৃষ্ঠার নথি। ধারণা করা হচ্ছে, বাজারমূল্য ২ ট্রিলিয়ন ডলার বা তার বেশি নিয়ে যাত্রা শুরু করবে প্রতিষ্ঠানটি, যা হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শেয়ার তালিকাভুক্তি।

বেশির ভাগ সংবাদে শিরোনাম হয়েছে একটি বাক্য: ‘পর্যাপ্ত উন্নত এআই ব্যবস্থা যথাযথ রক্ষাকবচ, নজরদারি ও নিরাপত্তা ছাড়া তৈরি ও পরিচালিত হলে তা গোটা মানবজাতির সামনে বিপর্যয়কর কিংবা অস্তিত্বগত ঝুঁকি হাজির করতে পারে।’

কথাটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নতুন নয়। এই প্রসপেক্টাসের একটি সংস্করণ এক মাস আগেই রয়টার্সের হাতে এসেছিল, আমরা তখনই লিখেছিলাম: ব্যবসার বর্ণনায় ৪৮ পৃষ্ঠা, আর কী কী ভুল হতে পারে তাতে ৮০ পৃষ্ঠা—যার মধ্যে ছিল ‘বন্ধ করার চেষ্টায় বাধা দেয়’ এমন মডেলের কথাও। যে প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর বলে আসছে এআই বিপদের, আইনি ঝুঁকির তালিকায় সে কথা বাদ দেওয়ার উপায় তার নেই।

সত্যিকার নতুন তথ্যগুলো আর্থিক। আর যে সংখ্যাটি নিয়ে ভাবা দরকার, সেটি লোকসান নয়।

পাঁচ গ্রাহক, আয়ের এক-চতুর্থাংশ

অ্যানথ্রপিকের ব্যবসার বড় অংশ আসে মোটামুটি ২৫০টি বড় করপোরেট গ্রাহক থেকে, যাদের প্রত্যেকে গত এক বছরে দিয়েছে কমপক্ষে ১ কোটি ডলার। এই দলের ভেতরে মাত্র পাঁচটি গ্রাহক থেকে আসে বর্তমান ব্যবসার প্রায় এক-চতুর্থাংশ।

ফাউন্ডার ইটিএফের পোর্টফোলিও ম্যানেজার মাইকেল মোনাহান আসল কথাটি বলেছেন: ‘অ্যানথ্রপিকের শীর্ষ গ্রাহকদের অনেকেরই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নেই।’ অর্থাৎ দুই ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিষ্ঠানের আয়ের এক-চতুর্থাংশ চুক্তি নবায়নের সময় উঠে চলে যেতে পারে।

পাঁচ গ্রাহকেই এক-চতুর্থাংশ
অ্যানথ্রপিকের বর্তমান ব্যবসার প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসে মাত্র পাঁচটি করপোরেট গ্রাহক থেকে, আর ২৫০টি গ্রাহক বছরে দেয় কমপক্ষে ১ কোটি ডলার। অধিকাংশেরই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নেই। গ্রাফিক: টেক বিডি।

এর আরেকটি দিক আছে। গুগল ও অ্যামাজনের সঙ্গে অ্যানথ্রপিকের করপোরেট সম্পর্ক আছে, আর দুটি প্রতিষ্ঠানই একই সঙ্গে অ্যানথ্রপিকের বিনিয়োগকারী এবং—মোনাহানের ভাষায়—প্রতিযোগীও। একসঙ্গে তিনটি ভূমিকা: গ্রাহক, শেয়ারহোল্ডার, প্রতিদ্বন্দ্বী। নথিতে কথাটি স্বীকার করা হয়েছে।

তার বিপরীতে বৃদ্ধিটা বাস্তব: করপোরেট গ্রাহকের সংখ্যা গত বছরের প্রায় ১,৫০০ থেকে এ বছর বেড়ে হয়েছে প্রায় ১২,০০০। কৌশল ছিল ক্লদ আগে বিনা মূল্যে দেওয়া, পরে ব্যবহারকারীকে অর্থ দেওয়া গ্রাহকে পরিণত করা। প্রতিষ্ঠানের দাবি, এটি ‘ইতিহাসে যেকোনো প্রযুক্তির দ্রুততম করপোরেট গ্রহণ’।

লোকসান, আর যে নগদ তা ঢাকে

এ বছরের প্রথম ছয় মাসে অ্যানথ্রপিকের লোকসান ৮,০৭০ কোটি ডলার—পুরো ২০২৫ সালের লোকসানের দ্বিগুণ। একই ছয় মাসে আয় ১,৬২০ কোটি ডলার।

এই হিসাবটি বিনিয়োগকারীদের ব্যক্তিগতভাবে জানানো তথ্যের পাশে রাখা দরকার। অক্টোবরে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, সেপ্টেম্বর শেষের তিন মাসে আয় দাঁড়িয়েছে ১,৬৮০ কোটি ডলার—প্রথম প্রান্তিকে ৪৭০ কোটি ও দ্বিতীয়তে ১,১৬০ কোটির পর। নথির ছয় মাসের সংখ্যাটি এই প্রান্তিকগুলোর সঙ্গে মেলে; ১,৬৮০ কোটি ডলারের প্রান্তিকটি নথির আওতার বাইরে। শিরোনাম মিলিয়ে পড়লে এটি অসংগতি নয়, দুটি আলাদা সময়কাল।

প্রতিষ্ঠানের হাতে নগদও আছে প্রচুর: ১৩,১৬০ কোটি ডলার, যার প্রায় সবটাই চলতি মূলধন হিসেবে চিহ্নিত, অর্থাৎ দৈনন্দিন কাজে খরচ করা যায়। নথি বলছে, মেটা ও গুগলের নগদ মিলিয়ে যা, তার চেয়েও বেশি।

খরচও সেই মাপেই। শুধু ডেটা সেন্টার ইজারা নিতে এ বছর এখন পর্যন্ত গেছে ৩২,১৪০ কোটি ডলার।

বিশ্লেষকেরা আসলে যা বলেছেন

মার্জারমার্কেটের ইকুইটি ক্যাপিটাল মার্কেটসের সহপ্রধান ট্রয় হুপার আয়ের বৃদ্ধিকে ‘ব্যতিক্রমী’ বলেছেন—এবং তারপর সমস্যাটি বলেছেন। নির্দিষ্ট কিছু ধরনের বিনিয়োগের সঙ্গে জড়িত বড় হিসাবরক্ষণ চার্জের কারণে অ্যানথ্রপিকের ঋণের ছবি অস্পষ্ট। ফলে, তাঁর কথায়, ‘অ্যানথ্রপিকের প্রকৃত লাভজনকতা, কিংবা ব্যবসা বড় হওয়ার সঙ্গে তার নগদ তৈরির হার যথেষ্ট কি না—বিনিয়োগকারীরা এখনো তা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন না।’

তাঁর আরেকটি পর্যবেক্ষণ মনে রাখার মতো। ভবিষ্যতের বড় রিটার্নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিনিয়োগকারীরা কয়েক মাস আগের তুলনায়ও এখন ‘কম সহনশীল’। মোনাহান একই কথা আরও সোজা করে বলেছেন: যাঁরা কিনবেন, তাঁরা ‘ভবিষ্যতের আধিপত্যের দাম দিচ্ছেন, আজকের অর্থনীতির নয়’।

যে অংশটি আদতে বিজ্ঞাপন

নথিতে সুফলের কথাও আছে, আর তা লেখা হয়েছে হিসাবনিকাশের ভাষায় নয়, মিশন-বিবৃতির ভাষায়: রোগভিত্তিক বিশেষায়িত চিকিৎসা, রোগ শনাক্তকরণের উন্নতি, ব্যক্তিভিত্তিক শিক্ষা, বিশেষজ্ঞ আর্থিক ও আইনি পরামর্শ, আরও কার্যকর বিদ্যুৎ গ্রিড ও ব্যাটারি, এবং ‘উন্নয়নশীল বিশ্বে’ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়তে সহায়তা। প্রতিষ্ঠানের ভাষ্যে, দশকের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি কয়েক বছরে নামিয়ে আনা সম্ভব।

এর কোনোটিই মাপা যায় না, কোনোটিই প্রতিশ্রুতিও নয়। বিপর্যয়কর ঝুঁকির সতর্কবার্তার সঙ্গে একই নথিতেই এগুলো আছে—এবং যে বাজি সামনে রাখা হচ্ছে, তার সৎ চেহারাটা ঠিক এটাই: প্রতিষ্ঠানটি চাইছে কী ঠেকাতে পারে আর কী সারাতে পারে, তার ভিত্তিতে তার মূল্য নির্ধারিত হোক; পাশাপাশি স্বীকার করছে, সে আজ যা আয় করে তার ভিত্তিতে এখন মূল্য নির্ধারণ করা যাচ্ছে না।

এ মাসের আরও একটি কাঠামোগত প্রতিশ্রুতিও এখন ছবির অংশ: অ্যানথ্রপিক বলেছিল, তারা শেয়ারের ৫ শতাংশ একটি ‘পাবলিক বেনিফিট ফান্ডে’ দেবে, আর বোর্ডের বিবেচনায় আরও ২ শতাংশ যেতে পারে।

নথিতে প্রসঙ্গক্রমে বলা হয়েছে, এক বছরেরও কম আগে চীনের পৃষ্ঠপোষকতায় চলে বলে প্রতিষ্ঠানের ধারণা—এমন একটি হ্যাকার দল ক্লদকে ‘কাজে লাগিয়ে’ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, রাসায়নিক কারখানা ও সরকারি সংস্থায় ঢুকে পড়েছিল। যে ব্যবসার পণ্যই মডেলের ওপর আস্থা, তার জন্য এই ঝুঁকি অস্তিত্বগত ঝুঁকির চেয়ে অনেক বেশি তাৎক্ষণিক।

সূত্র: বিবিসি

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি ঢাকাভিত্তিক একটি স্বাধীন প্রযুক্তি প্রকাশনা, প্রকাশিত হয় বাংলা ও ইংরেজিতে। লেখাগুলো আলাদা লেখকের নামে নয়, প্রকাশনার নামেই প্রকাশিত হয়; সংশোধন বা সূত্র নিয়ে প্রশ্ন পাঠানো যায় info@tech-bd.com ঠিকানায়।