প্রযুক্তি

‘প্রেগন্যান্সি’ শব্দটির জন্য সরিয়ে দেওয়া হলো তাঁদের বিজ্ঞাপন — দশ মাস পর ফিরল, ততক্ষণে ক্ষতি হয়ে গেছে

স্বয়ংক্রিয় মডারেশন এমন বিষয়বস্তু আটকাচ্ছে, যা আটকানোর কথা ছিল না—আর আপিলও প্রায়ই স্বয়ংক্রিয়। মূল্য দিচ্ছে ছোট ব্যবসা, বাংলাদেশে যার বেশির ভাগই নারীদের ফেসবুক পেজ।

‘প্রেগন্যান্সি’ শব্দটির জন্য সরিয়ে দেওয়া হলো তাঁদের বিজ্ঞাপন — দশ মাস পর ফিরল, ততক্ষণে ক্ষতি হয়ে গেছে

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আইরিন ব্রিন জানতে পারেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানের গর্ভাবস্থার বালিশের বিজ্ঞাপন সরিয়ে নিচ্ছে ইনস্টাগ্রাম। পরে মেটার সঙ্গে এক ফোনালাপে তাঁকে বলা হয়, সমস্যাটি ‘প্রেগন্যান্সি’ শব্দটি।

ঠিক করতে কী খরচ হলো

বিবিসিকে ব্রিন বলেছেন, ‘পুরো ওয়েবসাইট থেকে, এমনকি পণ্যের নাম থেকেও শব্দটি মুছে ফেলতে হয়েছিল। যেসব ইউআরএলে প্রেগন্যান্সি ছিল, সব সরিয়ে নতুন নাম দিতে হয়েছে।’ বিধিনিষেধ শেষ পর্যন্ত উঠে যায়, তবে মেটার সঙ্গে দশ মাস কথাবার্তার পর—ততক্ষণে ব্যবসাটির উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতি হয়ে গেছে।

মেটা বলছে, সুস্থতা, যৌনস্বাস্থ্য ও প্রজননসংক্রান্ত পণ্য ও সেবার বিজ্ঞাপন দেওয়া যায়; তবে বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির ব্যবহারকারীদের বাজে অভিজ্ঞতা এড়াতে কিছু বিধিনিষেধ আছে। বিবিসির প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র যোগ করেন, তাঁদের প্ল্যাটফর্মে ‘প্রেগন্যান্সি’ শব্দটি ব্যবহার করা যায় না—এ কথা ঠিক নয়, পোস্টে শব্দটি অবাধেই ব্যবহার করা যায়।

৯৬ শতাংশই বিধিনিষেধে পড়েছেন
সেন্সহারশিপের জরিপে ছিলেন প্রায় ২০০ জন নির্মাতা, চিকিৎসক ও দাতব্য সংস্থা। এক বছরে আত্মসেন্সরশিপ ৫৩ থেকে ৬৫ শতাংশে। গ্রাফিক: টেক বিডি।

কেবল বিজ্ঞাপনদাতারা নন

স্বাস্থ্যবিষয়ক কনটেন্ট নির্মাতা ও দাতব্য সংস্থাগুলো বলছে, তাঁদের পোস্ট সরিয়ে দেওয়া হয়, সংবেদনশীলতার ফিল্টার বসে, কিংবা নাগাল কমিয়ে দেওয়া হয়—যাকে বলা হয় শ্যাডোব্যান। প্রচারাভিযান সংগঠন সেন্সহারশিপ প্রায় ২০০ জন নির্মাতা, চিকিৎসাসেবাদাতা, স্বাস্থ্য ব্র্যান্ড, দাতব্য সংস্থা ও শিক্ষকের ওপর জরিপ চালিয়ে দেখেছে, ৯৬ শতাংশই কোনো না কোনো বিধিনিষেধে পড়েছেন।

স্ত্রীরোগ-ক্যানসারবিষয়ক দাতব্য সংস্থা ইভ অ্যাপিলের প্রধান নির্বাহী অ্যাথিনা ল্যামনিসোস বলেন, কিছু হ্যাশট্যাগ ইনস্টাগ্রামে আসেই না—‘অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, তার একটি ছিল #vaginalcancer।’ কী কী পরিবর্তন খেয়াল করতে হবে তা বোঝাতে দেওয়া একটি লেবেলসহ শারীরবৃত্তীয় চিত্র সরিয়ে দেওয়া হয়; আপিল প্রথমে নাকচ হয়, কয়েক সপ্তাহ পর পোস্টটি ফেরে সংবেদনশীলতার ফিল্টারের আড়ালে—যে ফিল্টার সাধারণত রাখা হয় রক্তাক্ত বা নগ্ন ছবির জন্য। তাঁর ভাষায়, জীবন বাঁচাতে পারে এমন স্বাস্থ্যতথ্য যাঁদের সবচেয়ে বেশি দরকার তাঁদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না—কথাটি অতিরঞ্জন নয়।

প্রজননস্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রতিষ্ঠান হার্টিলিটির ডেয়ারড্রে ও’নিল বলেন, একটি ভিডিওতে এক নারী কেবল তাঁর এন্ডোমেট্রিওসিসের যন্ত্রণার বর্ণনা দিচ্ছিলেন—কোনো পণ্য বিক্রির কথা নেই, প্রতিষ্ঠানের নামও নেই। ভিডিওটি সরিয়ে দেওয়া হয় এবং একে রাজনৈতিক বিষয়বস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এমনটি বারবার হয় কেন

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের ডিজিটাল ক্রিমিনোলজিস্ট ড. ক্যারোলিনা আরে বলছেন, নির্দেশিকা ভাঙতে পারে এমন পোস্ট চিহ্নিত করতে ব্যাপকভাবে এআই ব্যবহৃত হয়। ব্যবস্থাটি ভুল শনাক্ত করে, সেই সিদ্ধান্ত জমা রাখে, আর পরে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে। আপিলও প্রায়ই স্বয়ংক্রিয়, ফলে প্রশ্নটি কাউকে করার সুযোগই থাকে না।

এর ফল আত্মসেন্সরশিপ। সেন্সহারশিপের জরিপে নিজেদের ভাষা আড়াল করা উত্তরদাতার হার ২০২৫ সালের ৫৩ শতাংশ থেকে এ বছর ৬৫ শতাংশে উঠেছে—শব্দ ভেঙে লেখা, তারকাচিহ্ন বা ইমোজি বসানো, কিংবা প্রসঙ্গটিই বাদ দেওয়া। সহপ্রতিষ্ঠাতা ক্লিও উড একে ক্ষতিকর বলছেন, কারণ নারীস্বাস্থ্য বরাবরই লজ্জা ও অপরাধবোধে ঘেরা থেকেছে, আর এতে সেটিই আরও পোক্ত হয়।

বাংলাদেশে আঘাতটি বেশি কেন

ফেসবুককেন্দ্রিক খুচরা ব্যবসার সবচেয়ে বড় বাজারগুলোর একটি বাংলাদেশে। হাজার হাজার এফ-কমার্স পেজে বিক্রি হয় মাতৃত্বকালীন পোশাক, মা ও শিশুর পণ্য, স্যানিটারি সামগ্রী, শিশুখাদ্য আর ঘরে বানানো খাবার—আর এসব পেজের বেশির ভাগই চালান নারীরা, যাঁদের অনেকেরই ওয়েবসাইট নেই, দোকান নেই, পেমেন্ট গেটওয়েও নেই। পেজটিই ব্যবসা।

একটি মার্কিন ব্র্যান্ড দশ মাস ই-মেইল চালাচালি করে যে স্বয়ংক্রিয় বিধিনিষেধ সামলে নেয়, ঢাকার একজন বিক্রেতার জন্য সেটিই নাগাল ফুরিয়ে যাওয়া—ফোন করার মতো কোনো অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার নেই, ইংরেজিতে লেখা আপিল কেউ পড়েন না, আর বিকল্প কোনো চ্যানেলও নেই। তা ছাড়া নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরি হয়েছে ইংরেজি ধরে, ফলে বাংলায় লেখা পণ্যের বর্ণনার বিচার করে এমন ব্যবস্থা, যার পেছনে প্রশিক্ষণ অনেক কম—যা দুদিকেই কাটে: ভুলভাবে সরানো, কিংবা ভুলভাবে রেখে দেওয়া।

এখনই গড়ে নেওয়ার মতো দুটি অভ্যাস আছে। নিজের হাতে থাকে এমন একটি ক্রেতাতালিকা রাখুন—ফোন নম্বর, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, যেকোনো কিছু, যা প্ল্যাটফর্মের ফলোয়ার সংখ্যা নয়—যাতে নাগাল কমে গেলেও ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ ছিঁড়ে না যায়। আর প্রতিটি অপসারণ ও আপিলের হিসাব রাখুন, তারিখ আর স্ক্রিনশটসহ; কারণ শেষ পর্যন্ত যেসব ঘটনার মীমাংসা হয়, সেগুলোর নথি কারও কাছে থাকে।

সম্পর্কিত: প্রিয় শিল্পীকেই অ্যালগরিদম থেকে লুকিয়ে রাখা ভক্তরা।

সূত্র: BBC

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি ঢাকাভিত্তিক একটি স্বাধীন প্রযুক্তি প্রকাশনা, প্রকাশিত হয় বাংলা ও ইংরেজিতে। লেখাগুলো আলাদা লেখকের নামে নয়, প্রকাশনার নামেই প্রকাশিত হয়; সংশোধন বা সূত্র নিয়ে প্রশ্ন পাঠানো যায় info@tech-bd.com ঠিকানায়।