প্রযুক্তি

নেটওয়ার্ক ছাড়াই স্যাটেলাইটে ছবি — আজ লেখা কেন যায় আর ছবি কেন যায় না, আর আপনার দেশ তালিকায় না থাকার নিয়ন্ত্রক কারণ

ফোনের অ্যানটেনা ছোট আর প্রেরণক্ষমতা এক ওয়াটেরও ভগ্নাংশ। এই একটিমাত্র তথ্যই ব্যাখ্যা করে আকাশের দিকে তাক করা, অপেক্ষা করা আর ১৬০ অক্ষরের সীমা — আর কী বদলালে কী হবে।

নেটওয়ার্ক ছাড়াই স্যাটেলাইটে ছবি — আজ লেখা কেন যায় আর ছবি কেন যায় না, আর আপনার দেশ তালিকায় না থাকার নিয়ন্ত্রক কারণ

আইফোন ১৪ থেকে অ্যাপলের ফোন এমন কিছু করতে পারে যা শুনতে কল্পবিজ্ঞানের মতো: কোনো সিগন্যাল না থাকলেও ফোনটি আকাশের দিকে তাক করে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে জরুরি বার্তা পাঠানো। সুবিধাটি সীমিত — কেবল লেখা, কেবল জরুরি অবস্থা, আর কেবল সেসব দেশে যেখানে অ্যাপল এটি চালু করেছে; বাংলাদেশ তাতে নেই। এখন খবর বলছে, অ্যাপল এটি বাড়িয়ে ছবি ও অবস্থানের মানচিত্র পর্যন্ত নিতে চায়।

দাবিটি কী, আর খবরটি টিকে আছে কেন

গুজব অনুযায়ী সম্প্রসারণটি আইফোনকে স্যাটেলাইটে ছবি পাঠাতে ও নেটওয়ার্ক চলে গেলে মানচিত্র ব্যবহার করতে দেবে — কেবল সত্যিকারের জরুরি অবস্থায় নয়, নেটওয়ার্ক নিছক উধাও হয়ে যাওয়ার দৈনন্দিন ক্ষেত্রেও।

অ্যাপল কিছুই বলেনি। খবরটি টিকে আছে একটি করপোরেট কারণে: খবরে বলা হচ্ছে, অ্যামাজন গ্লোবালস্টার অধিগ্রহণের পথে — যে প্রতিষ্ঠানটি এখন আইফোনের জরুরি সেবা বহন করে। চুক্তিটি হলে অ্যাপল অ্যামাজনের লো-আর্থ-অরবিট নক্ষত্রপুঞ্জে প্রবেশাধিকার পেতে পারে — ভালো কভারেজ, দ্রুততর সংযোগ, আর ছোট বার্তার বদলে একটি ছবি সরাতে যে ধারণক্ষমতা আসলে দরকার তা-ও। বিশ্লেষকেরা সুবিধাটিকে সময়সূচিতে থাকা পণ্য নয়, ওই অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল সম্ভাবনা হিসেবেই দেখছেন।

যে একটিমাত্র তথ্য সবকিছু ব্যাখ্যা করে

মোবাইল নেটওয়ার্ক যে বার্তা তাৎক্ষণিক পৌঁছে দেয়, তার জন্য ফোন আকাশের দিকে তাক করে স্থির হয়ে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করতে হয় কেন? সফটওয়্যার নয়। পদার্থবিদ্যা — আর নির্দিষ্ট করে বললে, লিংক বাজেট।

মোবাইল ফোনের অ্যানটেনা কয়েক সেন্টিমিটার লম্বা আর এটি পাঠায় এক ওয়াটেরও ভগ্নাংশ শক্তিতে। মোবাইল টাওয়ার কয়েক কিলোমিটার দূরে। আজকের জরুরি বার্তা বহনকারী স্যাটেলাইট অনেক উঁচু কক্ষপথে, আর সংকেত দুর্বল হয় দূরত্বের বর্গের অনুপাতে — কাজেই ওই ভগ্নাংশ ওয়াট যখন স্যাটেলাইটে পৌঁছায়, তা অবিশ্বাস্য রকম ক্ষীণ, মহাবিশ্বের নিজস্ব গোলমালের কাছাকাছি।

ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতার সবকিছুই আসে ওই সরু প্রান্তে কাজ করা থেকে। ফোনটি তাক করতে হয়, কারণ অ্যানটেনার যেটুকু দিকনির্দেশনা আছে তা পেতে একে স্যাটেলাইটের দিকে মুখ করতে হয়। স্থির থাকতে হয়, কারণ নড়লে সংযোগ ভেঙে যায়। কয়েক মিনিট লাগে, কারণ এত গভীর গোলমালের ভেতর থেকে সংকেত টেনে বের করার একমাত্র উপায় খুব সামান্য তথ্য খুব ধীরে পাঠানো আর তা বারবার পাঠানো।

এ কারণেই সীমাটি লেখা। ১৬০ অক্ষরের বার্তা কয়েক শ বাইট। সংকুচিত একটি ছবি কয়েক লাখ বাইট — মোটামুটি দশ হাজার গুণ বেশি। আজ হাতে ধরা ফোন থেকে স্যাটেলাইটে যে গতিতে তথ্য যায়, তাতে এটি ধীরগতির ছবি নয়; এটি এমন একটি স্থানান্তর যা শেষ করার মতো ধৈর্য কারও হবে না।

কী বদলালে সম্ভব

স্যাটেলাইটকে কাছে আনুন। লো-আর্থ-অরবিটের স্যাটেলাইট কয়েক হাজার নয়, কয়েক শ কিলোমিটার ওপরে থাকে, আর ওই দূরত্বে সংকেতের ক্ষয় নাটকীয়ভাবে কমে — অ্যামাজনের কুইপার বা স্পেসএক্সের স্টারলিংকের মতো নক্ষত্রপুঞ্জ ওই কক্ষপথে থাকার গোটা কারণ এটিই।

খরচটি হলো, নিচু স্যাটেলাইট ভূপৃষ্ঠের ছোট একটি টুকরো ঢাকে আর আকাশ জুড়ে দ্রুত সরে যায়; কাজেই নিরবচ্ছিন্ন সেবার জন্য শত শত বা হাজার হাজার স্যাটেলাইট লাগে, যারা একে অন্যের হাতে দায়িত্ব তুলে দেয়। এ কারণেই এই ব্যবস্থাগুলো বাস্তবসম্মত হতে এত সময় নিল: পদার্থবিদ্যা নিয়ে কখনো সন্দেহ ছিল না, উৎক্ষেপণের অর্থনীতি নিয়ে ছিল।

যাওয়া-আসার বিলম্বও কমে — দূরবর্তী কক্ষপথ যে সেকেন্ডের ভগ্নাংশ চাপিয়ে দেয়, তা নেমে আসে স্বাভাবিক সংযোগের কাছাকাছি। বার্তার জন্য এটি কম গুরুত্বপূর্ণ, কলের জন্য বিপুল।

দুটি ভিন্ন পদ্ধতি, যেগুলো নিয়মিতই গুলিয়ে ফেলা হয়

কোন ফোন কোথায় কাজ করবে তা এই পার্থক্যই ঠিক করে, আর প্রায় কোনো প্রতিবেদনই এটি বলে না।

ডেডিকেটেড স্যাটেলাইট মেসেজিং আইফোন এখন যা করে। এটি ব্যবহার করে স্যাটেলাইট অপারেটরের লাইসেন্স করা স্পেকট্রাম, আর ফোনে ওই নির্দিষ্ট ব্যান্ডের জন্য বানানো হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার লাগে। এটি কেবল সমর্থিত মডেলেই চলে, আর সুবিধার তালিকাটি যা অপারেটর ও ফোন নির্মাতা ঠিক করেছেন তা-ই।

ডাইরেক্ট-টু-সেল অন্য পদ্ধতি, আর বেশি কৌতূহলোদ্দীপক। এতে স্যাটেলাইট কক্ষপথে বসা একটি মোবাইল টাওয়ারের মতো আচরণ করে, সাধারণ মোবাইল ব্যান্ডেই সম্প্রচার করে — কাজেই অপরিবর্তিত ফোনও যুক্ত হতে পারে, স্যাটেলাইট জড়িত আছে তা না জেনেই। অপারেটরদের সঙ্গে স্টারলিংকের সেবা এভাবেই চলে।

গেরোটি কারিগরি নয়, নিয়ন্ত্রক — আর আপনার দেশ কারও তালিকায় না থাকার উত্তরও এটিই। মোবাইল স্পেকট্রামের লাইসেন্স দেওয়া হয় জাতীয়ভাবে, জাতীয় অপারেটরদের। কোনো স্যাটেলাইট চাইলেই কোনো দেশের ওপর ওই কম্পাঙ্কে সম্প্রচার করতে পারে না — তার জন্য ওই দেশের লাইসেন্সধারী অপারেটরের সঙ্গে ব্যবস্থা আর ওই দেশের নিয়ন্ত্রকের অনুমতি লাগে। কাজেই ডাইরেক্ট-টু-সেল ছড়ায় একটি করে দেশ আর একটি করে অপারেটর চুক্তি ধরে, আর বাধাটি কক্ষপথ নয়, কাগজপত্র।

যেখানে কভারেজ সবচেয়ে খারাপ, সেখানে এর মানে

বাংলাদেশে জনবসতিপূর্ণ বেশির ভাগ এলাকাতেই মোবাইল কভারেজ মোটামুটি ভালো, আর ঠিক যেখানে সবচেয়ে বেশি দরকার সেখানেই খারাপ: সুন্দরবন, বন্যার সময়ের হাওর, পার্বত্য জেলা আর সাগর। ঠিক সেসব জায়গাতেই আপনি কোথায় আছেন তার একটি ছবি বর্ণনার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান হতো।

ভোক্তা পর্যায়ের স্যাটেলাইট-টু-ফোন সেবার জন্য এখনো কোনো কাঠামো নেই, আর অ্যাপলের বিদ্যমান এসওএস সুবিধাও চালু নয়। নক্ষত্রপুঞ্জ যথেষ্ট ঘন হলে বঙ্গোপসাগরের মাছ ধরার নৌকা থেকে যেকোনো ফোনে ছবি পাঠানোর ভবিষ্যৎ কারিগরিভাবে কল্পনা করা যায়। সেটি আসবে কি না তা নির্ভর করছে প্রকৌশলের চেয়ে একটি লাইসেন্সিং আলোচনার ওপর — উত্তরটি কম রোমাঞ্চকর, আর এটিই সঠিক।

অ্যান্ড্রয়েডও থেমে নেই: গুগল ও স্যামসাং স্যাটেলাইট মেসেজিং এনেছে, আর ডাইরেক্ট-টু-সেল অপারেটরদের সঙ্গে পরীক্ষাধীন। যুক্তিসংগত প্রত্যাশা হলো, স্যাটেলাইটে ছবি কোথাও সাধারণ হয়ে ওঠার অনেক আগেই মধ্যম দামের ফোনে স্যাটেলাইটে লেখা পাঠানো সাধারণ হয়ে যাবে।

সূত্র: Satellite link budget fundamentals, direct-to-cell industry practice, spectrum regulation, Techlusive

লিখেছেন

Mahbub Rabbani

টেক বিডিতে ভোক্তা প্রযুক্তি নিয়ে লেখেন মাহবুব রব্বানী — ফোন, অ্যাপ, অপারেটিং সিস্টেম আর দেশের বেশির ভাগ মানুষের প্রতিদিনের প্ল্যাটফর্ম। সাইটের কীভাবে-করবেন নির্দেশিকাগুলো তাঁর লেখা; কোনো পণ্যকে তিনি মাপেন কেনার খরচ দিয়ে নয়, ব্যবহারের খরচ দিয়ে।