বিশ্ব

চুরি করা সেন্ট আনিয়েসের ছবিতে ভেড়ার বদলে আঁকা হয়েছিল একটি স্ক্রল—বিশ বছর আর ৫০০ কিলোমিটার পরেও সফটওয়্যার মিলিয়ে ফেলল

এটি এমন এক এআই পুলিশিং যা কাজ করে, আর কারণটি শিক্ষণীয়: কাজটি সংকীর্ণ, উত্তরটি যাচাইযোগ্য, আর এরপর কী হবে তা ঠিক করেন একজন মানুষ।

চুরি করা সেন্ট আনিয়েসের ছবিতে ভেড়ার বদলে আঁকা হয়েছিল একটি স্ক্রল—বিশ বছর আর ৫০০ কিলোমিটার পরেও সফটওয়্যার মিলিয়ে ফেলল

২০২৪ সালের অক্টোবরে পারমার বার্ষিক প্রাচীন সামগ্রীর মেলায় নিয়মিত পরিদর্শনে গিয়ে ইতালির পুলিশ সদস্যরা স্টলের ফাঁকে ফাঁকে হেঁটে শিল্পকর্মের ছবি তুলছিলেন। এটি শিল্পরসিকতা ছিল না। ছবিগুলো সরাসরি চলে যাচ্ছিল একটি অভ্যন্তরীণ ডেটাবেজে।

কয়েক ঘণ্টা পরেই ব্যবস্থাটি একটি ছবিকে চিহ্নিত করে: অ্যাকুয়ামেরিন ও লাল পোশাকে এক তরুণীর চিত্র, হাতে অর্ধেক খোলা একটি পার্চমেন্ট স্ক্রল।

‘কিছু একটা খাপছাড়া লাগছিল,’ বলেন ইতালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষা পুলিশ ইউনিটের লেফটেন্যান্ট কর্নেল সালভাতোরে রাপিকাভোলি। পরদিনই কর্মকর্তারা ফিরে গিয়ে ছবিটি জব্দ করেন, যাতে তাঁদের শিল্প বিশেষজ্ঞরা দেখতে পারেন।

ছদ্মবেশ, আর কেন তা ব্যর্থ হলো

‘স্ক্রল হাতে নারীর ছবি’ লিখে হাতে খোঁজ করলে এটি কখনোই পাওয়া যেত না। বিশ বছর আগে চুরি যাওয়া কাজটিতে একই ফরসা তরুণীর হাতে ছিল ছোট একটি সাদা ভেড়া আর একটি খেজুর শাখা—স্ক্রল নয়। কেউ তাঁর হাত দুটি নতুন করে এঁকে দিয়েছিল।

তবু ব্যবস্থাটি মিলিয়ে ফেলল, কারণ সে শব্দ খুঁজছিল না। সে তুলনা করে লুকানো দৃশ্য-ছাপ: রঙের শেড, আবছা অবয়ব, বিন্যাসের সজ্জা। পরিবর্তন সত্ত্বেও লাখো নথির মধ্য থেকে সে ছবিটি চিহ্নিত করল; আর যে মূল ছবিটির সঙ্গে মিল আছে বলে সে মনে করেছিল, তা সামনে আসার পর সাদৃশ্যটি মানুষের চোখেই তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়ে গেল।

নিবিড় তদন্তে নিশ্চিত হয়: এটি সতেরো শতকের, এক মিটার উঁচু সেন্ট আনিয়েসের একটি চিত্রকর্ম, যা লুট হয়েছিল নেপলসের কাছে সুলমোনার ভির্গো পোতেন্স নামের ছোট গির্জা থেকে—যেখানে ছবিটি আবার দেখা গেল, তার থেকে ৫০০ কিলোমিটারের বেশি দূরে।

ব্যবস্থাটি কী

১৯৬৯ সাল থেকে ইতালির পুলিশ লুট হওয়া সাংস্কৃতিক সামগ্রীর একটি ডেটাবেজ রাখছে: রাতের আঁধারে গির্জার বেদি থেকে কেটে নেওয়া বিশাল তেলচিত্র থেকে অবৈধভাবে খুঁড়ে তোলা রোমান ও এট্রুস্কান সামগ্রী পর্যন্ত। এটিই বিশ্বের সবচেয়ে বড় এমন ডেটাবেজ, সাংস্কৃতিক পুলিশ ও শুল্ক বিভাগ থেকে নিয়মিত তথ্য যোগ হয়, আর এতে আছে দশ লাখেরও বেশি সামগ্রী। কেবল কিছু ভুক্তিতেই মূল সামগ্রীর ছবি আছে।

আগে কর্মকর্তারা মেলা, পুরোনো জিনিসের দোকান ও নিলামে গিয়ে যা দেখতেন তা ওই নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতেন—প্রথমে কাগজে, পরে অনলাইন ভান্ডারে কিওয়ার্ড লিখে। কাজটি ছিল ধীর ও অমার্জিত। শত শত ছবি স্ক্রল করতে গিয়ে জরুরি খুঁটিনাটি সহজেই চোখ এড়িয়ে যেত; আর তুলনার ছবিগুলো প্রায়ই দশকের পুরোনো, সাদাকালো, কারও খাওয়ার ঘরের দেয়াল থেকে দূর থেকে তোলা, আলোয় ধুয়ে যাওয়া বা অতিরিক্ত কনট্রাস্টে ভরা।

‘আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, প্রযুক্তি কীভাবে এই সমস্যাটি পাশ কাটাতে পারে,’ বলেন রাপিকাভোলি, যিনি পেশায় আইটি ইঞ্জিনিয়ার এবং ২০১৩ সালে চুরি যাওয়া শিল্পকর্মের দলে যোগ দিয়েছেন, ‘অন্তত বিপুল খোঁজা-ও-মেলানোর ধাপটিতে।’

২০২০ সালে তাঁর দল তৈরি করে স্টোলেন ওয়ার্কস অব আর্ট ডিটেকশন সিস্টেম, সংক্ষেপে সোয়াডস। ‘যন্ত্রের ক্লান্তি নেই,’ বলেন তিনি।

২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০.৩ কোটি ইউরো
একটি মিলিয়ে দেখার ব্যবস্থার সহায়তায় উদ্ধার হয়েছে ৩০০-র বেশি বড় চিত্রকর্ম ও মূর্তি, আর ১,৬৫,০০০-এর বেশি মুদ্রা, পদক, পাণ্ডুলিপি ও ধর্মীয় সামগ্রী। গ্রাফিক: টেক বিডি।

২০২৩ সালের নভেম্বরে চালুর পর থেকে এই ব্যবস্থার সহায়তায় উদ্ধার হয়েছে ৩০০-র বেশি বড় লুট হওয়া চিত্রকর্ম ও মূর্তি, আর ১,৬৫,০০০-এর বেশি ছোট মুদ্রা, পদক, চিঠি, পাণ্ডুলিপি, ধর্মীয় সামগ্রী, স্ট্যাম্প ও কার্ড—সব মিলিয়ে যার মূল্য ২০ কোটি ৩০ লাখ ইউরোর বেশি (১৭ কোটি পাউন্ড, ২২ কোটি ৬০ লাখ ডলার)। ‘মিলে যাওয়ার সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে,’ বলেন রাপিকাভোলি।

কেটে টুকরো করে নতুন করে সাজানো কাজও এটি ধরে ফেলে—বড় বেদিচিত্র আলাদা আলাদা ফালি করে বিক্রি হলে প্রায়ই যেমন হয়। ‘অর্থ দাঁড়ায় কি না তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়েই সে চিনে ফেলে, কারণ এটি চুরি যাওয়া একটি সম্পূর্ণ কাজের অংশ,’ বলেন তিনি। শিল্পকর্মের অর্থ সম্পর্কে কিছু না জেনেই সে মিলিয়ে দেয়।

এআই পুলিশিং প্রায়ই কাজ করে না, এটি কেন করে

দুই দিন আগে আমাদের একটি প্রতিবেদনের পাশে এটি রাখা দরকার: গবেষকেরা সতর্ক করেছিলেন, পুলিশিংয়ে এআই বৈষম্য আরও গভীর করার ঝুঁকি তৈরি করে, কারণ পুলিশ কোথায় গিয়েছিল তার নথি দিয়ে প্রশিক্ষিত পূর্বাভাস-ব্যবস্থা তাদের আবার সেখানেই পাঠায়।

দুটিই পুলিশের হাতে এআই। পার্থক্যটি কাঠামোগত, আর এর নাম বলা দরকার—কারণ যেকোনো এমন ব্যবস্থা বিচার করার মাপকাঠি এটিই।

কাজটি সংকীর্ণ। সোয়াডস একটি প্রশ্নের উত্তর দেয়—এই বস্তুটি চুরি যাওয়া পরিচিত কোনো বস্তুর মতো কি না; মানুষের আচরণের পূর্বাভাস সে দেয় না।

উত্তরটি যাচাইযোগ্য। মিলে গেলে একটি নির্দিষ্ট দাবি তৈরি হয়: এটি সেই গির্জা থেকে ওই তারিখে নেওয়া ছবি। বিশেষজ্ঞরা যাচাই করেন, উৎস-নথি থাকে, আর ভুল মিল সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমানভাবে ভেঙে পড়ে। পূর্বাভাসনির্ভর অপরাধের মানচিত্র এমন কোনো দাবিই করে না, যা কেউ ভুল প্রমাণ করতে পারে।

প্রশিক্ষণের তথ্য পুলিশের বিবেচনার নথি নয়। ডেটাবেজটি চুরি হয়েছে বলে জানানো জিনিসের তালিকা, পুলিশ কোন রাস্তায় টহল দিতে বেছে নিয়েছে তার তালিকা নয়। এর নিজের ঘাটতি আছে—কেবল কিছু ভুক্তিতে ছবি আছে, আর বহু চুরির খবরই কখনো জানানো হয় না—কিন্তু ব্যবস্থাটি ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঘাটতি চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ে না।

এরপর কী হবে, তা ঠিক করেন একজন মানুষ। চিহ্নিত হওয়ায় কর্মকর্তারা আবার গিয়ে দেখেছেন। ব্যবস্থাটি কিছু জব্দ করেনি, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগও তোলেনি।

কৌশলে ও নীতিতে ইতালির এই অগ্রগতি অন্যত্রও শিল্পকর্ম চুরির তদন্তে মেশিন লার্নিংয়ের পথ খুলে দিচ্ছে। এখানে যে প্রতিষ্ঠানই এমন যন্ত্রের কথা ভাবছে—শুল্ক বিভাগ, জাদুঘর কিংবা ভূমি নিবন্ধন দপ্তর—তাদের জন্য এই চারটি শর্ত যেকোনো বিক্রেতার নির্ভুলতার হিসাবের চেয়ে বেশি কাজের তালিকা।

সূত্র: বিবিসি

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি ঢাকাভিত্তিক একটি স্বাধীন প্রযুক্তি প্রকাশনা, প্রকাশিত হয় বাংলা ও ইংরেজিতে। লেখাগুলো আলাদা লেখকের নামে নয়, প্রকাশনার নামেই প্রকাশিত হয়; সংশোধন বা সূত্র নিয়ে প্রশ্ন পাঠানো যায় info@tech-bd.com ঠিকানায়।