রেল অপারেটর, গাড়ি নির্মাতা ও ডিসকাউন্ট শপসহ ২০-র বেশি বড় প্রতিষ্ঠানে একের পর এক সাইবার হামলার পর জাপান সরকার সাইবার স্পেসে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।
ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি হেডকোয়ার্টার্সের প্রধান মাসাকি তাইরা জানিয়েছেন, জাপান এখন সাইবার স্পেসে জরুরি অবস্থার মধ্যে আছে। সাইবার নিরাপত্তামন্ত্রী তোশিহারু ফুরুকাওয়া পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সংকটজনক বলেছেন। ডাকা হয়েছে জরুরি বৈঠক।
যা ফাঁস হয়েছে
রেল অপারেটর জেআর ইস্ট বলছে, তাদের বুকিং ব্যবস্থা থেকে ১৬ লাখ ৭০ হাজার গ্রাহকের ই-মেইল ঠিকানা ফাঁস হয়ে থাকতে পারে। সফটব্যাংকের সহযোগী ক্লাউড সেবাদাতা আইডিসি ফ্রন্টিয়ার র্যানসমওয়্যার হামলার শিকার হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর ফাঁসটি হয়তো সবচেয়ে নীরব। গাড়ি ভাড়া দেওয়া প্রতিষ্ঠান টাইমস কারের অ্যাপে আছে ড্রাইভিং লাইসেন্সের ডিজিটাল ছবির বিশাল ভান্ডার। ওই তথ্য ফাঁসের পর বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, ছবিগুলো ডার্ক ওয়েবে কম দামে বিক্রি হবে।
নিয়ন্ত্রকের সাড়াটিই অস্বাভাবিক অংশ
জাপানের আর্থিক সেবা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যাংকগুলোকে কঠোর সতর্কতা দিয়েছে: নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার সময় পরিচয়ের প্রমাণ হিসেবে ড্রাইভিং লাইসেন্স নেওয়া বন্ধ করতে হবে।
এটি লক্ষণীয় নির্দেশ, আর একটু থেমে ভাবার মতো। একটি সরকার সিদ্ধান্তে এসেছে যে জাতীয় একটি পরিচয়পত্র আর যাচাইয়ের জন্য নির্ভরযোগ্য নয়—নথিটি বদলেছে বলে নয়, বরং যথেষ্টসংখ্যক লাইসেন্সের যথেষ্ট ছবি এখন এমনভাবে ছড়িয়ে আছে যে ছবি থাকা আর কিছুই প্রমাণ করে না।
তথ্য ফাঁসের এই অংশটি সংবাদে আসে না, কারণ এর কোনো নাটকীয় মুহূর্ত নেই। ফাঁস একটি ঘটনা; পরিচয়পত্রের মূল্য হারানো স্থায়ী। জাতীয় পরিসরে লাইসেন্স ফেরত নিয়ে নতুন করে দেওয়া যায় না, তাই নিয়ন্ত্রক বরং নথিটিকেই প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশে এর মানে কী
একই ঝুঁকি এখানেও আছে, আরও ঘনীভূত রূপে—আর প্রায় কেউই একে নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখেন না।
জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি নিয়মিতই আপলোড করা হয় মোবাইল সিম নিতে, এমএফএস অ্যাকাউন্ট খুলতে, ফ্ল্যাট ভাড়া নিতে, জিমে ভর্তি হতে বা কোনো মার্কেটপ্লেসে নিবন্ধন করতে। এগুলোর অনেক গ্রহীতাই ছোট প্রতিষ্ঠান, যাদের নিরাপত্তাকর্মী নেই। আর এনআইডি ড্রাইভিং লাইসেন্সের চেয়ে বদলানো কঠিন এবং ব্যবহৃত হয় আরও বেশি কাজে।
বাস্তব পাঠটি ‘এনআইডি শেয়ার করা বন্ধ করুন’ নয়—বেশির ভাগ মানুষের সে সুযোগ নেই। পাঠটি সংকীর্ণ। যেখানে কপি দিতেই হয়, সেখানে প্রাপকের নাম ও তারিখ লেখা একটি আড়াআড়ি জলছাপ চুরি যাওয়া ছবিটিকে অন্যত্র অনেক কম ব্যবহারযোগ্য করে। আর যে সেবা এনআইডির ছবি চায় অথচ অন্য উপায়ে যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখে না, সেটি আপনার ঝুঁকি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে—নিজেদেরটি নিয়ে নয়।
বাংলাদেশেও আগে জাতীয় সাইবার সতর্কতা জারি হয়েছে, যা নিয়ে লেখা হয়েছিল সার্টের ডিডস হামলার সতর্কবার্তায়। জাপানের ঘটনাটি ভিন্ন ও বেশি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির—ব্যবস্থা অফলাইনে চলে যাওয়া নয়, বরং একটি নথির অর্থ নীরবে হারিয়ে যাওয়া।
পরিচয়পত্র কেন মেরামত করা যায় না
সফটওয়্যারের ভাঙন সারানো যায়। পরিচয়ের ভাঙন শুষে নিতে হয়—আর পার্থক্যটি বলা দরকার, কারণ এটিই ঠিক করে দেয় সাড়া হিসেবে কী করা আদৌ সম্ভব।
ফাঁস হওয়া পাসওয়ার্ড সেকেন্ডে বদলানো যায়। ফাঁস হওয়া কার্ড কয়েক দিনে নতুন করে দেওয়া যায়। ফাঁস হওয়া পরিচয়পত্র ভিন্ন ধরনের: নম্বর বদলায় না, ছবি বদলায় না, আর ধারক নিজে তা বাতিল করতে পারেন না। জাপানে ড্রাইভিং লাইসেন্সধারীর সংখ্যা প্রায় আট কোটি, আর তথ্য ফাঁসের কারণে ওই পরিসরে নতুন করে লাইসেন্স দেওয়া কোনো সরকারের হাতে থাকা বিকল্প নয়।
তাই বাকি থাকে একটিমাত্র হাতিয়ার, যা নিয়ন্ত্রক ব্যবহার করেছেন—নথিটির ওপর নির্ভর করা বন্ধ করা। এ কারণেই ফাঁসের চেয়ে ব্যাংকগুলোর প্রতি নির্দেশটিই আসল খবর। এটি একটি সরকারের স্বীকার করে নেওয়া যে যাচাইয়ের একটি পদ্ধতি স্থায়ীভাবে দুর্বল হয়ে গেছে, আর ক্ষতিটি না সারিয়ে ব্যবস্থাটিকে নীরবে তার পাশ কাটিয়ে নেওয়া।
সূত্র: প্রথম আলো।




