প্রযুক্তি

১৮ মার্চ থেকে মেটার কমিউনিটি নোটস—ফ্যাক্টচেকারের জায়গায় ব্যবহারকারী; কী বদলাচ্ছে, কী নয়, আর তালিকায় বাংলা কেন নেই

১৮ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও থ্রেডসে এক্স-ধাঁচের কমিউনিটি নোটসের পরীক্ষা শুরু—পেশাদার ফ্যাক্টচেকিং বাদ দেওয়ার মেটার সিদ্ধান্তের প্রথম বাস্তব ধাপ। নোট লিখতে আবেদন করেছেন ২ লাখ মানুষ; শুরুতে কোনোটি প্রকাশ্যে দেখানো হবে না; ছয়টি ভাষা, বাংলা নেই। ব্যবস্থাটি কী, সিদ্ধান্ত নেয় কীভাবে, আর এখানে এর মানে কী।

১৮ মার্চ থেকে মেটার কমিউনিটি নোটস—ফ্যাক্টচেকারের জায়গায় ব্যবহারকারী; কী বদলাচ্ছে, কী নয়, আর তালিকায় বাংলা কেন নেই

হালনাগাদ, অক্টোবর ২০২৬ — কমিউনিটি নোটস বর্ণনা অনুযায়ীই চালু হয়েছে এবং এরপর ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও থ্রেডসে ছড়িয়েছে। এই লেখায় যে দুর্বলতার কথা বলা হয়েছিল — মেরুকৃত বিষয়ে ঐকমত্য তৈরিই হয় না, তাই কোনো নোটও দেখা যায় না — তা এখন আর পূর্বাভাস নয়, পরিমাপ করা তথ্য। সংখ্যাগুলো কী বলছে, আর অ্যালগরিদম কীভাবে নকশার জোরেই এই ফল তৈরি করে — মূল লেখার পরেই।

জানুয়ারিতে মেটা ঘোষণা করে, মিথ্যা পোস্টে লেবেল দিতে স্বাধীন ফ্যাক্টচেকারদের অর্থ দেওয়া বন্ধ করবে—২০১৬ সালে শুরু করা কর্মসূচিটিকে বলে আস্থার ব্যর্থতা। ১৮ মার্চ বিকল্পটি চালু হচ্ছে: ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও থ্রেডসে কমিউনিটি নোটস, শুরু যুক্তরাষ্ট্রে পরীক্ষা হিসেবে। ধারণাটি খোলাখুলি ধার করা এক্স থেকে, যেখানে এটি ২০২২ সাল থেকে চলছে: সাধারণ ব্যবহারকারীরা পোস্টে প্রেক্ষাপট যোগ করে ছোট নোট লেখেন, অন্য ব্যবহারকারীরা নোটে রেটিং দেন, আর নোট দেখানো হয় কেবল তখনই, যখন সাধারণত পরস্পরের সঙ্গে দ্বিমত করা মানুষেরা দুই পক্ষই একে সহায়ক বলে রেটিং দেন।

প্রথম পর্ব যেভাবে চলবে

  • তিন অ্যাপ মিলিয়ে প্রায় ২ লাখ মানুষ কন্ট্রিবিউটর হতে আবেদন করেছেন। তাঁদের ঢোকানো হবে ধাপে ধাপে, একসঙ্গে নয়।
  • কন্ট্রিবিউটররা নোট লিখতে ও অন্যের নোটে রেটিং দিতে পারবেন, তবে শুরুতে কোনো নোট জনসাধারণকে দেখানো হবে না। মেটা বলছে, কেউ ফল দেখার আগে রেটিং অ্যালগরিদম ঠিকঠাক করতে চায়।
  • শুরুর ভাষা ইংরেজি, স্প্যানিশ, চীনা, ভিয়েতনামি, ফরাসি ও পর্তুগিজ। বাংলা নেই, আর অন্য ভাষা বা দেশের সময়সূচি মেটা দেয়নি।
  • এই পর্বে নোট কোনো পোস্ট সরায় না, তার পৌঁছানো কমায় না। নিচে প্রেক্ষাপট যোগ করে।

মেটার যুক্তি

‘২০১৬ সালে স্বাধীন ফ্যাক্টচেকিং কর্মসূচি চালুর সময় আমরা খুব স্পষ্ট ছিলাম যে সত্যের বিচারক হতে চাই না,’ কোম্পানি লিখেছে। বিশেষজ্ঞদেরও, তাদের মতে, ‘নিজস্ব পক্ষপাত ও দৃষ্টিভঙ্গি আছে’, আর যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসূচিটি প্রত্যাশামতো কাজ করেনি। কমিউনিটি নোটসকে দেখানো হচ্ছে ন্যায্যতর হিসেবে, কারণ কোনো একক প্রতিষ্ঠান সিদ্ধান্ত নেয় না; অ্যালগরিদম কেবল দলনিরপেক্ষ ঐকমত্যের নোট তোলে।

বিপক্ষের যুক্তি

একই নকশার একটি পরিচিত দুর্বলতা এক্সে দেখা গেছে: দ্রুত বদলানো বা তীব্র মেরুকৃত ঘটনায় ঐকমত্য কখনো গড়ে ওঠে না, কোনো নোট আসে না—ঠিক যখন সবচেয়ে দরকার। গবেষকেরা এও দেখেছেন, এক্সে প্রস্তাবিত নোটের বেশির ভাগ কখনো দেখানো হয় না। মেটা দুটো সমস্যাই উত্তরাধিকারে পাচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য এর মানে

আপাতত এখানে কিছু বদলায় না। বাংলাদেশে মেটার তৃতীয় পক্ষের ফ্যাক্টচেকিং অংশীদারেরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, কারণ সেই কর্মসূচি বন্ধ আপাতত শুধু যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু দিকটি স্পষ্ট, আর বাংলাদেশ—যেখানে রাজনৈতিক গুজব, সাম্প্রদায়িক উসকানি ও আর্থিক প্রতারণার প্রধান পথ ফেসবুক, আর বাংলা ভাষায় মডারেশন বরাবরই পাতলা—সবচেয়ে বেশি হারাবে, যদি ফ্যাক্টচেকারদের জায়গা একসময় নেয় এমন ব্যবস্থা, যা এখনো ভাষাটিই বলে না। মেটাকে করার প্রশ্ন কমিউনিটি নোটস ভালো ধারণা কি না, তা নয়; বরং বাংলায় এটি কবে থাকবে, আর কাদের তা লিখতে দেওয়া হবে।

সূত্র: দ্য ভার্জ, প্রথম আলোর বরাতে।

সংখ্যাগুলো কী বলছে

ব্যবস্থাটি ঘোষণা অনুযায়ীই চালু হয় এবং তিনটি অ্যাপেই ছড়িয়েছে। শুরুর প্রকাশিত হিসাব বিনয়ী: ৭০ হাজারের বেশি অবদানকারী প্রায় ১৫ হাজার নোট লিখেছেন, যার মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে প্রায় ৬ শতাংশ।

এই অনুপাতটিই আসল খবর, আর এটি বাস্তবায়নের ব্যর্থতা নয়। নকশাটি এ কাজই করে।

এক্স-এ, যেখানে ব্যবস্থাটি ২০২২ সাল থেকে চলছে এবং পরীক্ষা করার মতো দীর্ঘ ইতিহাস আছে, গবেষণায় একই ধরন আরও বড় পরিসরে দেখা গেছে। সেন্টার ফর কাউন্টারিং ডিজিটাল হেট জানিয়েছে, রাজনৈতিক বিষয়ে লেখা ৭৩ শতাংশ নোট কখনোই দেখানো হয়নি — যেগুলো নির্ভুল প্রেক্ষাপট দিয়েছিল সেগুলোসহ। সেন্টার ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড টেকনোলজি দেখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী অপতথ্য নিয়ে লেখা ৭০ শতাংশের বেশি নির্ভুল নোট ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছায়নি; সঙ্গে তারা আরও দুটি সমস্যার কথা তুলেছে, যা মেটা সরাসরি উত্তরাধিকারসূত্রে পাচ্ছে: মডেলটি লেখার জন্য তৈরি, আর রিলসের ছোট ভিডিও কিংবা ফেসবুকের ব্যক্তিগত গ্রুপে ঘোরা দাবি — যেখানে প্রকাশ্য কোনো নোট জোড়াই যায় না — এর কোনো স্পষ্ট উত্তর তার নেই।

অ্যালগরিদম এভাবে কাজ করে কেন

কার্যপ্রণালি নিয়ে নির্ভুল হওয়া দরকার, কারণ “ব্যবহারকারীরা নোটে রেটিং দেন” শুনলে মনে হয় এটি ভোট — তা নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট হলে বড় পক্ষ কেবল ছোট পক্ষের পোস্টেই লেবেল সেঁটে দিত।

এর বদলে ব্যবস্থাটি ব্যবহার করে যাকে সাধারণত বলা হয় ব্রিজিং অ্যালগরিদম। সবার আগের রেটিং থেকে এটি প্রত্যেক রেটারের জন্য একটি সুপ্ত অক্ষে একটি অবস্থান অনুমান করে — বাস্তবে মোটামুটি, তিনি সাধারণত কোন পক্ষে থাকেন। এরপর কোনো নোট প্রকাশ পায় কেবল তখনই, যখন ওই অক্ষের বিপরীত দিকে থাকা মানুষেরা একে সহায়ক বলে রেটিং দেন। যাঁরা আর সবকিছুতেই একমত, তাঁদের মধ্যকার ঐকমত্যের মূল্য সামান্য; বিভাজন পেরিয়ে আসা ঐকমত্যের মূল্য বিপুল।

রেফারি কে হবে — এই সমস্যার এটি সত্যিই চতুর উত্তর, আর এর এমন একটি ফল আছে যা প্রকৌশল দিয়ে সরানো যায় না। নোট তখনই দেখা যায়, যখন সংশোধনটি নিজেই বিতর্কিত নয়। সরল কোনো জালিয়াতির ক্ষেত্রে — কারসাজি করা ছবি, ভুল ক্যাপশন দেওয়া ভিডিও, বানানো উদ্ধৃতি — দুই পক্ষের ঐকমত্য সহজ, আর ব্যবস্থাটি ভালো কাজ করে। কিন্তু যেসব দাবিতে তথ্য কোনো পরিচয়ের সঙ্গে জুড়ে গেছে, সেখানে ঐকমত্য তৈরিই হয় না, কিছুই প্রকাশ পায় না, আর পোস্টটি টীকাহীন থেকে যায়।

কাজেই ব্যর্থতা জমা হয় ঠিক সেখানেই যেখানে ক্ষতি: যে বিষয়বস্তু সংশোধন করা সবচেয়ে জরুরি, সেটিই সংশোধিত হওয়ার সম্ভাবনায় সবচেয়ে পিছিয়ে। আর এর সঙ্গে যোগ হয় দ্বিতীয় একটি সীমা। নোটের সময় লাগে — লেখা হতে, রেটিং পেতে, আর দুই পক্ষেরই যথেষ্টসংখ্যক মানুষের রেটিং পেতে। অপতথ্য তার বেশির ভাগ পথ পাড়ি দেয় প্রথম কয়েক ঘণ্টাতেই। শেষ পর্যন্ত প্রকাশ পাওয়া নোটও সাধারণত পৌঁছায় দর্শক সরে যাওয়ার পর।

কী বদলে এটি এল, আর বিনিময়টি আসলে কী

পেশাদার ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের সত্যিকারের দুর্বলতা ছিল: ধীর, পোস্টের ক্ষুদ্র ভগ্নাংশেই সীমাবদ্ধ, ব্যয়বহুল, আর যাচাইকারীদের নিয়োগ কে দিল — এই প্রশ্নের জবাব কারও কাছেই সন্তোষজনক ছিল না। মেটার বলা আপত্তি — বিশেষজ্ঞদেরও নিজস্ব পক্ষপাত আছে, আর কোম্পানি সত্যের বিচারক হতে চায় না — উপরিতলে অযৌক্তিক নয়।

কিন্তু দুটি ব্যবস্থা ব্যর্থ হয় ভিন্ন ভিন্নভাবে, আর সেই পার্থক্যটিই গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যাক্ট-চেকিং কর্মসূচি ব্যর্থ হয় খুব ধীর ও খুব ছোট হয়ে। ব্রিজিং অ্যালগরিদম ব্যর্থ হয় মেরুকৃত দাবির ক্ষেত্রে কাঠামোগতভাবে নীরব থেকে। প্রথমটি এমন ফাঁক রাখে, যা বেশি সম্পদ দিলে ছোট হয়। দ্বিতীয়টি এমন ফাঁক রাখে, যাতে বেশি অবদানকারী দিলেও হাত পড়বে না — কারণ বাধাটি সামর্থ্য নয়, ঐকমত্য।

ভাষার প্রশ্ন অপরিবর্তিত

এই লেখা যে প্রশ্নে শেষ হয়েছিল, তা একচুলও নড়েনি। কমিউনিটি নোটস চালু হয়েছিল ইংরেজি, স্প্যানিশ, চীনা, ভিয়েতনামি, ফরাসি ও পর্তুগিজে — বাংলা তাতে ছিল না।

নির্ভরশীলতাটি খুলে বলা দরকার। ব্রিজিং অ্যালগরিদম যে অক্ষের ওপর দাঁড়ায় তা অনুমান করতে প্রতিটি ভাষায় বড় ও রাজনৈতিকভাবে বৈচিত্র্যময় রেটারের দল লাগে, আর লাগে অবিরামভাবে, কারণ অক্ষটি সরে যায়। যে ভাষায় অবদানকারী কম, সেখানে নোট প্রকাশ পেতেই পারে না — সফটওয়্যার নেই বলে নয়, পরিসংখ্যানই নেই বলে। পেশাদার ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের ঠিক উল্টো, যা নিয়োগ দিয়ে বাড়ানো যায়: বিশজন বাংলা ফ্যাক্ট-চেকার একটি বাজেট খাত, কিন্তু সেতু গড়ার মতো যথেষ্ট বড় ও বৈচিত্র্যময় বাংলা রেটারের দল কোম্পানি চাইলেই কিনে ফেলতে পারে না।

কাজেই যেসব বাজারে প্ল্যাটফর্ম এমন ভাষায় রাজনৈতিক গুজব, সাম্প্রদায়িক উসকানি ও আর্থিক প্রতারণা বহন করে যে ভাষায় মডারেশন বরাবরই পাতলা, সেখানে প্রশ্নটি ২০২৫ সালেরটিই — এখন সঙ্গে প্রমাণ জুড়ে: কমিউনিটি নোটস ভালো ভাবনা কি না তা নয়, বরং যে বছরগুলোতে রেটারের দলটি থাকবেই না, সেই সময়ে ওই ভাষাগুলোর দায়িত্ব কে নেবে — আর প্রতিস্থাপকটি সেখানে কাজ করতে পারার আগেই ফ্যাক্ট-চেকিং কর্মসূচি তুলে নেওয়া হচ্ছে কি না।

সূত্র: Meta, Center for Countering Digital Hate, Center for Democracy and Technology, Tech BD archive (March 2025), updated October 2026

লিখেছেন

Mahbub Rabbani

টেক বিডিতে ভোক্তা প্রযুক্তি নিয়ে লেখেন মাহবুব রব্বানী — ফোন, অ্যাপ, অপারেটিং সিস্টেম আর দেশের বেশির ভাগ মানুষের প্রতিদিনের প্ল্যাটফর্ম। সাইটের কীভাবে-করবেন নির্দেশিকাগুলো তাঁর লেখা; কোনো পণ্যকে তিনি মাপেন কেনার খরচ দিয়ে নয়, ব্যবহারের খরচ দিয়ে।