প্রযুক্তি বাংলাদেশ

কিছু সস্তা অ্যান্ড্রয়েড ফোনে ফার্মওয়্যারেই আগে থেকে থাকে ম্যালওয়্যার — আর সেটি আনইনস্টল করা যায় না

কিছু কমদামি অ্যান্ড্রয়েড ফোনের ফার্মওয়্যারে “মিডনাইট মিমোসা” পেয়েছেন বিটডিফেন্ডারের গবেষকেরা; এটি সিস্টেম অ্যাপ হিসেবে চলে, অ্যাপ বসাতে-মুছতে আর কোড নামাতে পারে।

কিছু সস্তা অ্যান্ড্রয়েড ফোনে ফার্মওয়্যারেই আগে থেকে থাকে ম্যালওয়্যার — আর সেটি আনইনস্টল করা যায় না

অ্যান্ড্রয়েডে চলা কিছু কমদামি স্মার্টফোনে কারখানা থেকেই ম্যালওয়্যার বসানো থাকে—জানিয়েছেন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান বিটডিফেন্ডারের গবেষকেরা। মিডনাইট মিমোসা নামের এই ম্যালওয়্যারটি কিছু অ্যান্ড্রয়েড হ্যান্ডসেটের ফার্মওয়্যারের ভেতরেই যুক্ত থাকে।

ফার্মওয়্যার হলো ফোনের হার্ডওয়্যার চালানোর নিচের স্তরের সফটওয়্যার, কাজেই ফোন প্রথমবার চালু করার আগেই ম্যালওয়্যারটি সেখানে থাকে। সাধারণ অ্যাপের মতো আনইনস্টল করে একে মোছা যায় না। ফলে বাক্স থেকে ফোন বের করার মুহূর্ত থেকেই ক্রেতা ঝুঁকিতে।

বিটডিফেন্ডারের তথ্যমতে, মিডনাইট মিমোসা কাজ করে ফার্মওয়্যারে যুক্ত একটি স্থায়ী সিস্টেম অ্যাপের মাধ্যমে, যা একে ফোনের সিস্টেম পর্যায়ে প্রবেশাধিকার দেয়। সেই সুবিধায় এটি অ্যাপ বসাতে ও মুছতে পারে, দূরবর্তী সার্ভার থেকে বাড়তি কোড নামাতে পারে, আর অন্য অ্যাপকে অনুমতি দিতে পারে। গবেষকেরা এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত ৩২টি ছদ্মবেশী অ্যাপ পেয়েছেন, যেগুলো দিয়ে বিজ্ঞাপনের ভুয়া ভিউ তৈরি ও ক্লিক জালিয়াতি করা হয়—ফোনের মালিক কিছু না জেনেই যার উৎস হয়ে ওঠেন।

“সিস্টেম অ্যাপ” কথাটিই কেন গুরুত্বপূর্ণ

সাধারণ অ্যান্ড্রয়েড ম্যালওয়্যারকে আপনাকে দিয়ে ইনস্টল করাতে হয়, আর তারপর সেটি অন্য যেকোনো অ্যাপের মতোই সীমার মধ্যে থাকে। অ্যাপের তালিকায় আপনি সেটি দেখতে পান, অনুমতি তুলে নিতে পারেন, মুছে ফেলতে পারেন।

ফার্মওয়্যারে আসা জিনিস এসবের নিচে বসে। সেটি থাকে ফোনের নিজের বিল্ট-ইন সফটওয়্যারের মতো একই বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত স্তরে—অর্থাৎ নিরাপত্তা-কাঠামো আপনাকে এর থেকে রক্ষা করছে না; নিরাপত্তা-কাঠামো একে ফোনেরই অংশ মনে করছে। এ কারণেই একে আনইনস্টল করা যায় না, এ কারণেই এটি অনুমতি চাওয়ার বদলে অন্য অ্যাপকে অনুমতি দিতে পারে, আর এ কারণেই ফ্যাক্টরি রিসেটেও কাজ হয় না: রিসেট ফার্মওয়্যারই ফিরিয়ে আনে, এটিসহ।

বিজ্ঞাপন জালিয়াতি উপসর্গ, সীমা নয়। সিস্টেম প্রবেশাধিকার আর সার্ভার থেকে কোড নামানোর ক্ষমতা থাকা কোনো উপাদানকে পরে ভিন্ন কাজ দেওয়া যায়—মালিকের কিছু না করেই।

বাংলাদেশে এর ধাক্কা বেশি কেন

এটি এখানে দুর্লভ কোনো ঝুঁকি নয়। এটি বসে আছে ঠিক সেখানেই, যেখানে বাজারের বেশির ভাগ।

বাংলাদেশে বিক্রি হওয়া হ্যান্ডসেটের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠই বাজেট অ্যান্ড্রয়েড, প্রায়ই পাতলা সেবা-নেটওয়ার্কের ব্র্যান্ডের, কখনো দেশে সংযোজিত, আর প্রায়ই এমন দোকান থেকে কেনা যারা বলতে পারে না ফার্মওয়্যার ইমেজটি কে বানিয়েছে। ফোন যত সস্তা, সরবরাহ-শৃঙ্খল তত লম্বা আর সফটওয়্যারটি তত বেশি হাত ঘোরে—আর ফার্মওয়্যারেই কোনো চুক্তিভিত্তিক নির্মাতা বা মধ্যস্বত্বভোগী এমন কিছু ঢুকিয়ে দিতে পারেন, যা বাক্সের ব্র্যান্ডটিও হয়তো জানে না।

এটি এই সাইটে আগেই নথিভুক্ত একটি সমস্যাকেও বাড়িয়ে তোলে: একই ফোনগুলো সাধারণত আগেভাগেই নিরাপত্তা হালনাগাদ পাওয়া বন্ধ করে, ফলে সংক্রমিত নয় এমন বাজেট হ্যান্ডসেটও প্রায়ই চলে এমন সফটওয়্যারে, যা কেউ প্যাচ করছে না।

আসলে ঠকছে কে

ফোনের মালিকের দিক থেকে ক্লিক জালিয়াতিকে ক্ষতিহীন মনে হয়। টাকা আসছে বিজ্ঞাপনদাতার কাছ থেকে, ব্যবহারকারীর কাছ থেকে নয়, আর চোখে পড়ার মতো কিছু হারায় না।

তবু ব্যবহারকারী দাম দেন, তিনভাবে। ভুয়া ভিউ মোবাইল ডেটা খরচ করে, যা বাংলাদেশে ছোট প্যাকে কেনা হয় আর পরিবারের সত্যিকারের খরচ। এটি প্রসেসর চালায় আর ব্যাটারি শেষ করে—এমন একটি যন্ত্রে, যা বেছে নেওয়াই হয়েছিল সস্তা বলে। আর চুরি যাওয়া বিজ্ঞাপনের টাকা আসে এমন একটি তহবিল থেকে, যেটির জন্য বৈধ বাংলাদেশি প্রকাশক ও অ্যাপ নির্মাতারা প্রতিযোগিতা করছেন—কাজেই স্থানীয় ডিজিটাল অর্থনীতিও এতে অর্থ জোগাচ্ছে।

আগে থেকে বসানো ম্যালওয়্যারের নীরব অংশটি এটিই: এটি লাভজনক ঠিক এ কারণেই যে প্রতিটি আলাদা ক্ষতি এত ছোট যে কেউ তার পেছনে ছোটে না।

ক্রেতা আসলে কী করতে পারেন

আগে সৎ কথাটি: ফার্মওয়্যার একবার আপস হলে ব্যবহারকারী তা ঠিক করতে পারেন না। এখানে কাজের সবকিছুই ঘটে কেনার আগে, নয়তো যন্ত্রটির ওপর ভরসা না করার মধ্যে।

  1. সমান্তরাল আমদানি নয়, অনুমোদিত পরিবেশকের কাছ থেকে কিনুন। ব্র্যান্ডের চেয়ে বড় কথা, এতে থাকা সফটওয়্যার ইমেজের জন্য বাংলাদেশে কেউ দায়বদ্ধ কি না।
  2. অস্বাভাবিক সস্তা হ্যান্ডসেটকে অন্য কোথাও খরচ ধরুন। অবিশ্বাস্য দামের হার্ডওয়্যারে ভর্তুকি থাকে, আর ব্যবহারকারীর কাছ থেকে বিজ্ঞাপন-আয় সেই ভর্তুকির একটি পথ।
  3. উপসর্গ খেয়াল করুন: আপনি বসাননি এমন অ্যাপ আসা, ব্যাখ্যাহীন ডেটা খরচ, বসে থাকা অবস্থায় ব্যাটারি কমা, অ্যাপের বাইরে বিজ্ঞাপন।
  4. সন্দেহজনক ফোনে ব্যাংকিং বা এমএফএস ব্যবহার করবেন না। টাকা বাঁচায় একমাত্র এই পরামর্শই। যে ফোন পরিষ্কার করা যায় না, সেটিতে আপনার ওটিপি আসা উচিত নয়।

সম্পর্কিত: অ্যাকাউন্ট নিরাপত্তার তালিকা আর অ্যাসোসের অ্যাপে বিজ্ঞপ্তি হ্যাক।

সূত্র: Prothom Alo

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি সম্পাদকীয় দল।