বাংলাদেশের মানচিত্র শেষ হয় পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধায়, যেখানে পরিষ্কার সকালে কাঞ্চনজঙ্ঘার জেগে ওঠা দেখা যায়। সেখানেই বড় হয়েছেন সেলিম হোসেন, আর সেখানেই বেশ সাধারণ কিছু স্বপ্ন — ঢাকায় যাওয়া, একটা স্থায়ী চাকরি — রূপ নিয়েছে শিশুদের একটি ইউটিউব চ্যানেলে। মুভকিডজ-এর সাবস্ক্রাইবার কুড়ি লাখের কাছাকাছি, আর একে নিয়মিতই বলা হয় বাংলাদেশের কোকোমেলন।
জৌলুসহীন মাঝপথ
শুরুর গল্পটি কোনো গ্যারেজ আর ল্যাপটপের নয়। পরিবার চেয়েছিল সেলিম সেনাবাহিনীতে যান, আর তিনি নিয়োগের দরজা পর্যন্ত গিয়ে ফিরে এসেছিলেন। ২০০৯ সালে ঢাকায় আসেন, যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চেয়েছিলেন তাতে হয়নি, ভর্তি হন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সরকারি তিতুমীর কলেজে — আর খরচ চালিয়েছেন টিউশনি করে, ত্রিশেরও বেশি ব্যাচ পড়িয়ে। বন্ধুরা তখন বিসিএস আর ব্যাংকের চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
মোড় ঘোরে এক রুমমেটের সূত্রে, যিনি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে ভিডিওগ্রাফার ছিলেন। তাঁর সঙ্গে শুটিংয়ে ঘোরা থেকে মিডিয়ায় আগ্রহ জন্মায়; সম্পাদনা দেখতে দেখতে তা নেশায় দাঁড়ায়।
ক্রিয়েটিভ আইটি ইনস্টিটিউট তখন সবে চালু, প্রতিষ্ঠাতা নিজেই ক্লাস নেন — সেখানেই তিনি ভর্তি হন মায়ের জমানো টাকায়, পরিবারের আপত্তি সত্ত্বেও। এরপর শিক্ষার্থীর অভাবে ভিডিও সম্পাদনার ব্যাচটিই আটকে যায়। তাঁকে হারাতে না চেয়ে প্রতিষ্ঠাতা আগে গ্রাফিক ডিজাইনে সরিয়ে দেন — আর সেই ঘুরপথই পরে তাঁর সম্পাদনার মেরুদণ্ড হয়ে ওঠে বলে তিনি জানান। আজ তিনি ওই প্রতিষ্ঠানেরই ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের প্রধান, যা শিল্পটি এখনো কত ছোট তার পরিপাটি উদাহরণ।
সংখ্যাটি, আর তা ছোট দেখায় কেন
মুভকিডজের আয় মাসে প্রায় ২.৫ থেকে ৩ লাখ টাকা, আর এতে কাজ করেন সাতজন। কুড়ি লাখ সাবস্ক্রাইবারের পাশে রাখলে একে সামান্য মনে হতে পারে। তা নয় — আর কারণটি ব্যর্থতা নয়, একটি নিয়ম।
শিশুদের গোপনীয়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে একটি নিয়ন্ত্রক নিষ্পত্তির পর ২০২০ সাল থেকে ইউটিউব প্রতিটি ভিডিওকে “শিশুদের জন্য তৈরি” কি না তা চিহ্নিত করতে বাধ্য করে — আর শিশুদের জন্য চিহ্নিত কনটেন্টে ব্যক্তিগতকৃত বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেয়। বিজ্ঞাপন তখন দেখানো হয় কেবল প্রসঙ্গ দেখে, দর্শকের কোনো প্রোফাইল ছাড়াই।
টাকাটা থাকে ব্যক্তিগতকৃত বিজ্ঞাপনেই। সেটি সরিয়ে দিলে প্রতি হাজার ভিউয়ে বিজ্ঞাপনদাতার দেওয়া হার সাধারণ দর্শকের কনটেন্টের ভগ্নাংশে নেমে আসে; আর একই চিহ্নিতকরণ বন্ধ করে দেয় মন্তব্য, নোটিফিকেশন বেল, এন্ড স্ক্রিন, প্লেলিস্টে সংরক্ষণ ও লাইভ চ্যাট — অর্থাৎ অন্য নির্মাতারা দর্শক গড়তে ও অন্য আয়ের দিকে পাঠাতে যে সরঞ্জামগুলো ব্যবহার করেন তার বেশির ভাগই।
কাজেই শিশুদের চ্যানেল ইচ্ছে করেই কঠিনতর একটি ব্যবসা চালাচ্ছে: প্ল্যাটফর্মের সর্বনিম্ন বিজ্ঞাপন হার, কমিউনিটি-সুবিধার কিছুই নেই, আর প্রকৃত দর্শককে — যাঁর বয়স তিন — লক্ষ্য করে স্পনসরশিপ, অ্যাফিলিয়েট বা পণ্যের কোনো বাস্তব পথও নেই। এই সীমাবদ্ধতায় মাসে ৩ লাখ টাকা ছোট ফল নয়। এটি ইউটিউবের সবচেয়ে বিধিনিষিদ্ধ শ্রেণিতে অর্জিত ফল।
তবু ছড়াই কেন
তিনটি কাঠামোগত সুবিধা ওই সীমাবদ্ধতার দাম মিটিয়ে দেয়, আর একসঙ্গে সেগুলোই ব্যাখ্যা করে কেন প্রতিটি দেশেই এই ধাঁচটি আছে।
দর্শক নিজেকেই প্রতিস্থাপন করে। ফোন উন্মোচনের ভিডিও দুই বছরে মূল্যহীন। গোনার ছড়া নয় — সব সময়ই নতুন একটি তিন বছরের শিশু থাকে, আর পুরোনো ভান্ডার অনির্দিষ্টকাল আয় করতে থাকে। সম্পদটি লাইব্রেরি, কোনো একক আপলোড নয়।
এটি ভাষা পেরোয়। সুর, রং ও পুনরাবৃত্তির ওপর গড়া কনটেন্ট প্রায় কোনো অনুবাদ ছাড়াই চলে যায় — এ কারণেই ঢাকায় বানানো চ্যানেল এমন বাজার থেকে ভিউ পায় যেগুলোর কথা নির্মাতা কখনো ভাবেননি।
সেশন লম্বা। প্রাপ্তবয়স্ক একটি ভিডিও দেখে চলে যান। অভিভাবক একটি প্লেলিস্ট চালু করে ফোনটি নামিয়ে রাখেন, আর অটোপ্লে চলে এক ঘণ্টা। এতে কোনো একক ভিডিওর ভাইরাল হওয়ার চেয়ে উৎপাদনের পরিমাণই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে — যা হিটের পেছনে ছোটা একক নির্মাতার চেয়ে সময়সূচি মেনে চলা সাতজনের স্টুডিওর সঙ্গে অনেক ভালো মানায়।
সাফল্যের গল্পে যে ঝুঁকিটি কেউ লেখে না
গোটা ব্যবসাটি দাঁড়িয়ে আছে একটিমাত্র প্ল্যাটফর্মের নীতির ওপর, আর সেই নীতি ইতিমধ্যেই একবার এমনভাবে বদলেছে যে রাতারাতি গোটা শ্রেণির আয় কমে গেছে। আজ যাঁরা শিশুদের চ্যানেল চালান, তাঁরা সবাই চলছেন ২০২০ সালে এক নিয়ন্ত্রকের জবাবে লেখা নিয়মে — আর সেগুলোই শেষ নিয়ম ধরে নেওয়ার কোনো কারণ নেই।
বেশির ভাগ নির্মাতার তুলনায় এটি কঠিনতর নির্ভরশীলতা, কারণ চেনা রক্ষাকবচগুলো এখানে বন্ধ। প্রযুক্তির চ্যানেল একটি কোর্স বেচতে পারে, নিউজলেটার চালাতে পারে, স্পনসরশিপ নিতে পারে। যে চ্যানেলের দর্শকের বয়স তিন, তার সঙ্গে ওই দর্শকের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই এবং তাঁকে কিছু বেচাও যায় না। বাস্তব রক্ষাকবচগুলো নীরস: একই ভান্ডার অন্য প্ল্যাটফর্মে ছড়ানো, তা লাইসেন্স দেওয়া, আর প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানটিকে নিজের কাজের পাশাপাশি ক্লায়েন্টের কাজ করার সক্ষম রাখা।
পরবর্তী সেলিমের জন্য তিনটি শিক্ষা
- এমন বিষয় বাছুন যেখানে বৈশ্বিক চাহিদা আছে আর স্থানীয় জোগান কম। বাংলা ও ইংরেজিতে শিশুদের অ্যানিমেশনে গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা ছিল হাতে গোনা; যেকোনো অ্যালগরিদম কৌশলের চেয়ে ওই ফাঁকটিই বেশি কাজে এসেছে।
- দক্ষতা পাশাপাশি জমা হয়। পরিস্থিতির চাপে শেখা গ্রাফিক ডিজাইনই ভিডিওগুলোকে পরিপাটি দেখায় — আর যে শ্রেণিতে কেউ আপনার মন্তব্য পড়ে না, সেখানে পরিপাটি দেখানোই প্রতিযোগিতার বেশির ভাগ।
- শুরু থেকেই একে প্রতিষ্ঠান ভাবুন। একটি শখ নয়, সাতজনের বেতনই একটি চ্যানেলকে এমন কিছুতে পরিণত করে যা একটি খারাপ মাস, একটি নীতি পরিবর্তন কিংবা প্রতিষ্ঠাতার ছুটি সামলে টিকে যায়।




