নিজের দুই বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান টেসলা ও স্পেসএক্স একীভূত করার কথা সক্রিয়ভাবে ভাবছেন ইলন মাস্ক। মঙ্গলবার স্পেসএক্সের সর্বশেষ ফলাফল নিয়ে আর্থিক বিশ্লেষকদের সঙ্গে এক আলাপে তিনি বলেন, ‘আমি কি মনে করি এটি ভালো ভাবনা? হ্যাঁ।’
এখন কোথায় দাঁড়িয়ে
বিষয়টি পরীক্ষা করতে দুই প্রতিষ্ঠানেই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। মাস্ক বলেন, ‘বিশেষ কমিটিগুলো কোনো লেনদেনের শর্ত নিয়ে একমত হয়নি, আর হবেই এমন নিশ্চয়তাও নেই। তবে আমি মনে করি একীভূত হওয়ায় অনেক যুক্তি আছে, আর পাওয়ারও অনেক কিছু আছে।’
টেসলার মূল্য প্রায় ১.৫ ট্রিলিয়ন আর স্পেসএক্সের ২ ট্রিলিয়ন ডলার ধরলে এ একীভবন হবে ইতিহাসের বৃহত্তমগুলোর একটি। মাস্ক কোনো কমিটিতেই নেই; দুই প্রতিষ্ঠানেরই প্রধান নির্বাহী হিসেবে নিজেকে তিনি ‘স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ’ বলেছেন। বিষয়টি নিয়ে কথা বলাকেই তিনি তুলনা করেছেন ‘মাইনফিল্ডের ওপর ট্যাপ নাচের’ সঙ্গে।
সিদ্ধান্ত নেবেন শেয়ারহোল্ডাররা। টেসলার অন্তত ৫০ শতাংশ শেয়ারহোল্ডারের অনুমোদন লাগবে, যাকে মাস্ক বলেছেন ‘বেশ উঁচু বাধা’। তাঁরা আগেও তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন: গত বছর সংখ্যাগরিষ্ঠ বিনিয়োগকারী প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ অনুমোদন করেছিলেন।

শিরোনামের চেয়ে দামি সংখ্যাটি
একই ফলাফলে লুকিয়ে আছে এমন একটি সংখ্যা, যা স্পেসএক্স আসলে কী হয়ে উঠেছে তা বেশি বলে। ৩০ সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়া তিন মাসে স্টারলিংকের আয় বেড়ে হয়েছে ৫২০ কোটি ডলার, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩০০ কোটি—শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি। কিন্তু অন্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাছে ক্লাউড কম্পিউট সক্ষমতা বিক্রির ব্যবসা থেকে—যাদের মধ্যে অ্যানথ্রপিক ও গুগলও আছে—একই তিন মাসে স্পেসএক্সের আয় ৭৫০ কোটি ডলার, আগের বছর যা ছিল ৮১ কোটি ৩০ লাখ।
একটি রকেট প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় একক আয়ের খাত এখন হিসাবশক্তি ভাড়া দেওয়া। এক বছরে প্রায় নয় গুণ—আর এতেই একীভবনের যুক্তি সমন্বয়সাধন নিয়ে যেকোনো বিবৃতির চেয়ে পরিষ্কার হয়: এআইয়ের বিস্তারে দরকার বিদ্যুৎ ও জায়গা, আর যে প্রতিষ্ঠান জিনিস উৎক্ষেপণ করে ও উপগ্রহ চালায়, দুটিতেই তার নাগাল অস্বাভাবিক রকম ভালো।
যে অংশটি প্রশ্নের মুখে
স্পেসএক্স স্টারশিল্ডও চালায়—যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন সরকারের জন্য সুরক্ষিত একটি উপগ্রহ নেটওয়ার্ক। ওই নেটওয়ার্কে ইউক্রেনের প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠায় ব্যবসাটি এখন প্রশ্নের মুখে, যার ফলে দেশটি রুশ হামলার সামনে অরক্ষিত হয়ে পড়েছিল বলে দাবি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অস্বীকার করেছেন যে তিনি বা মাস্ক কেউ গতি কমানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন; মাস্ক ইঙ্গিত দিয়েছেন, বিধিনিষেধের পেছনে মার্কিন সরকার থাকতে পারে।
বাংলাদেশের নজর দেওয়া দরকার কেন
কারণ বাংলাদেশের আকাশের উপগ্রহ নেটওয়ার্কটির মালিকানা বদলে যাবে। বাংলালিংক এখানে চালু করছে স্টারলিংকের ডিরেক্ট-টু-সেল, অর্থাৎ একটি দেশি অপারেটরের কাভারেজের প্রতিশ্রুতি এখন নির্ভর করছে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাঠামোর ওপর। একীভবনে উপগ্রহ বদলায় না, কিন্তু বদলায় কে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করে, একীভূত প্রতিষ্ঠানের অগ্রাধিকার কী, আর বাজার ছোট হলে ক্ষতি কোন বিভাগ বহন করে।
ইউক্রেনের বিরোধটি অস্বস্তিকর নজির। এর তথ্য শেষ পর্যন্ত যা-ই দাঁড়াক, অভিযোগটি নিজেই সেই প্রশ্নটি তৈরি করে, যা একটিমাত্র উপগ্রহ সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরশীল যেকোনো দেশকে করতে হয়: সরবরাহকারীর মালিকের যদি কোনো কারণ থাকে—বাণিজ্যিক বা রাজনৈতিক—আমাদের প্রবেশাধিকারের কী হবে? এটি উপগ্রহ সেবা প্রত্যাখ্যানের যুক্তি নয়, একাধিক অপারেটরকে লাইসেন্স দেওয়ার যুক্তি।
একীভবনের কথা উঠছে কেন
কৌশলগত যুক্তিটি বোঝা কঠিন নয়। টেসলার আছে উৎপাদনের পরিসর, ব্যাটারির দক্ষতা আর নগদ আয় করা গাড়ির ব্যবসা; স্পেসএক্সের আছে উৎক্ষেপণ সক্ষমতা, কক্ষপথের অবকাঠামো আর এখন দ্রুত বাড়তে থাকা একটি কম্পিউট ব্যবসা, যাতে বিপুল বিদ্যুৎ ও যন্ত্রপাতি লাগে। দুটিকে মেলালে বিদ্যুৎ সঞ্চয়, উৎপাদন আর ডেটা সেন্টারের চাহিদা—সব একই হিসাবের খাতায় আসে।
বিপরীত যুক্তিটি সুশাসনের। টেসলা তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান, যার সাধারণ শেয়ারহোল্ডার আছেন; স্পেসএক্সের মালিকানা অনেক বেশি কেন্দ্রীভূত। একীভূত হওয়া মানে টেসলার বিনিয়োগকারীদের এমন এক ব্যবসার ঝুঁকি নেওয়া, যার সবচেয়ে বড় গ্রাহকসম্পর্ক সরকারি আর যার ঝুঁকির তালিকায় আছে পররাষ্ট্রনীতিও। বিশেষ কমিটি গঠনের কারণ এটিই, আর মাস্কের কোনোটিতে না থাকারও।




