মিতু আক্তারের বাড়ি মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার বেজগাঁও গ্রামে। বাবা পেশায় ছিলেন সার্ভেয়ার; চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট, একমাত্র মেয়ে। ২০১৬ সালের নভেম্বরে তাঁর বিয়ে হয়, পরের বছর জন্ম নেয় ছেলে। ২০১৯ সালে বিয়েটি ভেঙে যায়, আর কোলে শিশু, উচ্চশিক্ষার সনদ নেই, পরিবারের যথেষ্ট সমর্থনও নেই—সঙ্গে প্রতিবেশীদের নানা মন্তব্য।
যে ল্যাপটপ দুবার ভেঙেছে
ঘরে বসে করা যায় এমন সম্মানজনক কাজের খোঁজে ২০২০ সালের শেষ দিকে ভাইয়ের পুরোনো ভাঙা ল্যাপটপটি চেয়ে নেন তিনি। অনেক কষ্টে সেটি মেরামত করে গ্রাফিক ডিজাইন শেখা শুরু করেন। এরপর বিচ্ছেদের পর শ্বশুরবাড়ি থেকে আনার পথে ল্যাপটপটি আবার ভেঙে যায়।
এ ধরনের গল্পে সাধারণত যে অংশটি অনালোচিত থাকে, এটিই সেটি। বাধাটি সামর্থ্য বা ইচ্ছার ছিল না। বাধাটি ছিল একটি সচল যন্ত্র—দুবার।

ফি, আর তা এল কোথা থেকে
প্রথম আলোকে তিনি বলেছেন, ‘আমার আর যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না। কী করব, বুঝে উঠতে পারছিলাম না। মাকে বোঝালাম যে আমাকে কোনোভাবে টাকার ব্যবস্থা করে দিলে আমি ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের একটি কোর্স করব।’
তাঁর মা কাউকে কিছু না জানিয়ে নিজের কানের দুল বিক্রি করে দেন, আর টাকাটি মেয়ের হাতে তুলে দিয়ে বলেন একটি বাক্য: ‘যেদিন আয় করবে, সেদিন আমাকে আবার বানিয়ে দিয়ো।’
এরপর তিনি মন দিয়ে এসইও ও ডিজিটাল মার্কেটিং শেখা শুরু করেন, ভর্তি হন ক্রিয়েটিভ আইটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে। ল্যাপটপের ত্রুটি আর চরম আর্থিক সংকটের মধ্যেও তিনি হাল ছাড়েননি।
যেখানে গিয়ে দাঁড়াল
ফাইভআরে তাঁর প্রথম কাজটি আসে এক ইতালীয় ক্লায়েন্টের কাছ থেকে, মূল্য ১২০ ডলার। এরপর কাজের পরিধি বাড়তে থাকে। এখন তিনি ফাইভআরে লেভেল ২ আর আপওয়ার্কে টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার, আর ফেলে দেওয়া একটি ল্যাপটপ থেকে শুরু করে গড়ে তুলেছেন একটি এজেন্সি। তাঁর সঙ্গে এখন কাজ করেন ১০ জন তরুণ-তরুণী।
আগের গল্পটি যা বলেনি, এটি তা বলে
তিন দিন আগে আমরা প্রকাশ করেছিলাম কুড়িগ্রামের সেই ফ্রিল্যান্সারের গল্প, যিনি সংকেত ধরে রাখতে বাঁশের ডগায় ফোন বেঁধে রাখেন। দুটি পাশাপাশি রাখলে বাধার পার্থক্যটি চোখে পড়ার মতো। তাঁর বাধা ছিল অবকাঠামোর—নেটওয়ার্ক ঘরের ভেতরে পৌঁছাত না। তাঁর বাধা ছিল পুঁজির: একটি যন্ত্র আর একটি কোর্সের ফি, যার কোনোটির বিকল্প জেদ দিয়ে হয় না।
প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গড়তে বাংলাদেশ এক দশক ব্যয় করেছে, আর প্রশিক্ষণই সেই অংশ যেখানে অর্থ আছে। মানুষ আটকে যায় প্রায়ই আরও ছোট ও সাদামাটা কিছুতে: কোর্সের ১ হাজার ৯৫০ টাকা, কিংবা একটি সচল ল্যাপটপ। প্রশিক্ষণে ভর্তির বিপরীতে সংস্কার করা যন্ত্র ধার দেওয়ার একটি জেলাভিত্তিক ব্যবস্থায় খরচ হবে সামান্য, আর তাতেই সরে যাবে ঠিক সেই বাধাটি, যা এই দুই বিবরণেই আছে।
আর কার ক্ষেত্রে এসব ঘটে, সে কথাও বলা দরকার। বিবাহবিচ্ছেদের পর সনদহীন, ছোট সন্তানসহ, প্রতিবেশীদের মন্তব্য শুনতে থাকা একজন নারী এমন একটি বোঝা বহন করেন, যা কোনো আয়ের হিসাবে আসে না। এ গল্প থেকে মনে রাখার সংখ্যাটি ফাইভআরের লেভেল নয়। সংখ্যাটি এক জোড়া কানের দুল।
আরেকটি বিষয়ে নজর দেওয়া দরকার, কারণ এখানেই প্রভাবটি গুণিতক হয়। এখন তাঁর সঙ্গে কাজ করেন ১০ জন। ভালো আয় করা একজন ফ্রিল্যান্সার ব্যক্তিগত অর্জন; একটি এজেন্সি স্থানীয় নিয়োগকর্তা—আর লৌহজংয়ের একটি গ্রামে সেটি ভিন্ন ধরনের ঘটনা। নীতির প্রশ্নটি তাই আরও বেশি ফ্রিল্যান্সার তৈরি করা নয়। প্রশ্নটি হলো, তাঁদের কতজন এতটা দূর যেতে পারেন যে পরের দশজনকে কাজ দিতে পারেন।
এ জায়গাটিতে সহায়তার ধরনও বদলায়। শুরুর দিকে দরকার হয় প্রশিক্ষণ আর একটি যন্ত্র; এজেন্সি হওয়ার পর দরকার হয় ভিন্ন জিনিস—ব্যবসার নিবন্ধন, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের সহজ পথ, চুক্তি ও করের বোঝাপড়া। দ্বিতীয় ধাপটির জন্য কর্মসূচি কার্যত নেই, অথচ কর্মসংস্থান তৈরি হয় ঠিক সেখানেই।




