কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে কর্মদিবসের পুরোটা সময় একটি মুঠোফোন বাঁধা থাকে বাঁশের ডগায়। এটি কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়। এটিই ফজলে এলাহীর অফিসের নেটওয়ার্ক, আর বছরের পর বছর তা-ই।
মহামারি যা কেড়ে নিল
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষে একটি বেসরকারি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছিলেন এলাহী। করোনার মহামারিতে সেই চাকরি চলে যায়। পকেটে টাকা নেই, পরিবারকে দেখানোর মতো সম্বলও নেই—এ অবস্থায় ঢাকায় রাতে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে নিরাপত্তাপ্রহরীর কাজ নেন, আর দিনে ইস্কাটনের একটি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানে চিঠি বিলি ও ডেটা এন্ট্রির কাজ করতেন।
প্রথম আলোকে তিনি বলেছেন, ‘খুব কষ্ট করে চলতে হতো। হাঁপিয়ে উঠতাম। কিন্তু পরিবারের কথা মনে করে নিজেকে সামলে কাজ করে যেতাম।’ পরিস্থিতি আরও কঠিন হলে সব ছেড়ে কুড়িগ্রামের গ্রামের বাড়িতে ফেরেন—টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ আর সামনে কী, তার কোনো হদিস নেই।
যে ১,৯৫০ টাকায় শুরু
ফেসবুকের একটি বিজ্ঞাপন থেকে চোখে পড়ে ফেসবুক অ্যাডসের একটি কোর্স। ফি ১ হাজার ৯৫০ টাকা, যা তাঁর ছিল না। ফ্রিল্যান্সিং কমিউনিটি ও সরকারি প্রকল্পের সূত্রে পরিচয় হওয়া বয়সে বড় এক নারীকে তিনি ‘আপু’ ডাকতেন। সংকোচ কাটিয়ে সমস্যাটি বলতেই তিনি টাকাটি দেন, একটি শর্তে—এলাহীকে যা শেখানো হবে, তার কিছুটা যেন তাঁকেও শেখানো হয়।

বাঁশের ডগা
টিনের ঘরের ভেতরে মোবাইল নেটওয়ার্ক ছিল না বললেই চলে। ব্রডব্যান্ড তো দূরের কথা, ল্যাপটপের ওয়াই-ফাইয়ের মানেই থাকে না তা ছাড়া। ভরসা কেবল ফোনের হটস্পট—তাই ফোনটি তিনি রাখতেন জানালার বাইরে, কিংবা বেঁধে দিতেন বাঁশের ডগায়, আর ঘরের ভেতরে ল্যাপটপ যুক্ত করে চলত কাজ। ক্লাসের ভিডিও দেখা, অ্যাসাইনমেন্ট আর ফাইভআর-আপওয়ার্কে একের পর এক চেষ্টা—সবই ওই সংযোগ দিয়ে।
প্রথম কাজটি পেতে লেগেছিল নয় মাস। কাজটির মূল্য ছিল ৩৫ ডলার। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত সবকিছু চলেছে ওই একই হটস্পটে।
প্রতিবেশীরা যা বলতেন
সারা দিন ল্যাপটপে আঙুল চালানো তরুণটিকে নিয়ে গ্রামের মানুষ কী ভাববেন, বুঝে উঠতে পারতেন না। তাঁর মনে আছে কথাগুলো—‘সারা দিন ঘরে কী করে? কবে ঢাকা যাবে? গার্মেন্টসে চাকরি করলেও তো কিছু টাকা আসত!’ মা উৎকণ্ঠায় থাকতেন। তিনি থামেননি।
এখন কোথায় দাঁড়িয়ে
ফাইভআর ও আপওয়ার্ক—দুটিতেই এলাহী এখন টপ রেটেড সেলার। গুগল অ্যাডস, ওয়েব অ্যানালিটিকস ও ফেসবুক কনভার্সনের কাজ করেন মার্কেটপ্লেস ও বিভিন্ন এজেন্সির সঙ্গে। ওই গ্রামে বসেই মাসে আয় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ডলার, অর্থাৎ ২ লাখ টাকার বেশি। একটি প্রতিষ্ঠানে মেন্টর হিসেবে তরুণদের পথ দেখান, আর আয়ের কিছু অংশ দেন এলাকার ছোটখাটো উন্নয়নের কাজে।
যে জায়গাটি নিয়ে তর্ক হওয়া দরকার
একে অনুপ্রেরণার গল্প বলে সরে যাওয়া সহজ। বেশি কাজের পাঠটি হলো, সাফল্যটি এসেছে অবকাঠামোর কারণে নয়, বরং তা সত্ত্বেও। বাংলাদেশ বছরে কয়েক শ মিলিয়ন ডলারের ফ্রিল্যান্স শ্রম রপ্তানি করে, আর তার উল্লেখযোগ্য অংশের কাজ হয় মোবাইল ডেটায়—এমন সব জায়গায়, যেখানে একটি টিনের চালই সংযোগ কেটে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কাভারেজের মানচিত্রে কোনো গ্রাম তখনই ‘সেবার আওতায়’, যখন সংকেত সেখানে পৌঁছায়; সংকেতটি ঘরের ভেতরে পৌঁছায় কি না, মানচিত্র তা জিজ্ঞাসা করে না।
এই ফাঁকটিই পূরণের দাবি করে স্যাটেলাইট সেবা, আর এ কারণেই বাংলালিংকের স্টারলিংক ডিরেক্ট-টু-সেল চালু করা ঢাকার চেয়ে উলিপুরে বেশি গুরুত্বপূর্ণ—যদিও এখনকার ঘোষণা অনুযায়ী তাতে বার্তা চলবে, পুরো দিনের আপলোড নয়। যত দিন তেমন কিছু না আসে, বাঁশের ডগাটি দাঁড়িয়েই থাকবে।
আরেকটি কথাও বলা দরকার, কারণ এ ধরনের গল্পে তা প্রায়ই চাপা পড়ে যায়: এলাহীর শুরুর পুঁজি ছিল ধার করা ১ হাজার ৯৫০ টাকা আর একজন মানুষের ভরসা। প্রশিক্ষণের ঘোষণা কিংবা তহবিলের সংখ্যা যত বড়ই হোক, একজন তরুণের সামনে আসল বাধাগুলো প্রায়ই এ রকম ছোট—কোর্সের একটি ফি, একটি ল্যাপটপ, কিংবা ঘরের ভেতরে নেটওয়ার্কের এক দাগ। বড় কর্মসূচি এই ছোট বাধাগুলো ধরতে পারে না বলেই ‘আপু’র মতো কাউকে দরকার হয়ে পড়ে।
সম্পর্কিত: মধুপুরের উঠান থেকে দশ বছরে নকরেক আইটি।




