কিলিন নামের সাইবার অপরাধী গোষ্ঠীর মূল সদস্যদের একজন সন্দেহে ২৮ বছর বয়সী এক রুশ নাগরিককে আটক করেছে জার্মান পুলিশ। জার্মান গোয়েন্দারা এখন তাঁদের তদন্তে যুক্ত করছেন লন্ডনের রক্ত পরীক্ষা প্রতিষ্ঠান সিনোভিসে ২০২৪ সালে চালানো হামলাটিও—ইতিহাসে এটিই প্রথম সাইবার হামলা, যা সরাসরি একটি মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত।
গ্রেপ্তার
জার্মান সংবাদমাধ্যমে ভ্লাদিমির কে. নামে উল্লেখ করা সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয় গত মে মাসে জাপানে। কর্মকর্তারা তাঁর ছুটির পরিকল্পনার খবর পেয়ে যান, আর দেশটিতে পৌঁছানোমাত্র জাপানি পুলিশ তাঁকে আটক করে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে একটি লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে তথ্য এনক্রিপ্ট করে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার ডলার ক্রিপ্টোকারেন্সি আদায়ের অভিযোগে তিনি জার্মানিতে ওয়ান্টেড ছিলেন। তাঁর প্রত্যর্পণের খবর প্রথম আসে অক্টোবরের শুরুতে; নতুন খবরটি হলো, তদন্তে সিনোভিসের ঘটনাটিও যুক্ত হচ্ছে।
২০২৪ সাল থেকে কিলিন ৪ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে ১৪ কোটি ডলারের বেশি আদায় করেছে বলে অভিযোগ—এর মধ্যে আছে স্কুল, হাসপাতাল, কোম্পানি, কাউন্সিল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান।

সিনোভিস হামলায় কী হয়েছিল
সিনোভিস একটি ডায়াগনস্টিক ও প্যাথলজি সেবা, যা লন্ডনের হাসপাতালগুলো ও জার্মান প্রতিষ্ঠান সিনল্যাবের যৌথ উদ্যোগে চলে। ২০২৪ সালের ৩ জুন কিলিন সেখানে হামলা চালায়। জারি করা হয় জরুরি অবস্থা: রক্ত সঞ্চালন সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, অস্ত্রোপচার বাতিল হয়, জরুরি রোগীদের অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়। সব মিলিয়ে ব্যাহত হয় ১০ হাজারের বেশি অ্যাপয়েন্টমেন্ট, আর ভোগান্তি চলে কয়েক সপ্তাহ।
এক বছর পর কিংস কলেজ হসপিটাল এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট নিশ্চিত করে, একজন রোগী ‘অপ্রত্যাশিতভাবে মারা গেছেন’। ট্রাস্টের একজন মুখপাত্র বলেন, রোগীর নিরাপত্তাবিষয়ক তদন্তে একাধিক কারণ চিহ্নিত হয়েছে, যার একটি ছিল ‘রক্ত পরীক্ষার ফলের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা’।
কোনো মুক্তিপণ দেওয়া হয়নি। হামলাকারীরা ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করে দেয়, আর বিবিসিকে বলে, হামলাটি কেবল টাকার জন্য নয়, ইউক্রেন প্রশ্নে ব্রিটেনের ভূমিকার প্রতিবাদেও—যে দাবি তখনই সাধারণ চাঁদাবাজিকে অন্য চেহারা দেওয়ার চেষ্টা বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়।
আইনি নজির কেন তৈরি হতে পারে
বিবিসি জেনেছে, ব্রিটিশ পুলিশ খতিয়ে দেখছে তাদের তদন্ত বেআইনি হত্যার মামলায় গড়াতে পারে কি না। সাইবার অপরাধে তা হবে বিশ্বে প্রথম, আর নজিরটি দুদিকেই কাটে। ২০২০ সালে জার্মানির ডুসেলডর্ফের একটি হাসপাতালে ভিন্ন একটি গোষ্ঠীর হামলার পর এক বয়স্ক রোগী মারা যান; অবহেলাজনিত হত্যার তদন্ত শুরু হয়ে পরে বন্ধ হয়ে যায়, কারণ চিকিৎসকেরা মত দেন রোগীর অবস্থা এমনিতেই এতটা খারাপ ছিল যে তিনি মারা যেতেনই, আর কৌঁসুলিরা হামলাকেই সরাসরি কারণ বলে প্রমাণ করতে পারেননি।
পুরো কঠিন জায়গাটি এখানেই। একটি এনক্রিপ্ট হওয়া সার্ভার থেকে একটি নির্দিষ্ট মৃত্যু পর্যন্ত শিকলটি প্রমাণ করতে দেখাতে হয়, নইলে কী হতো—আর হাসপাতাল এমন জায়গা, যেখানে মানুষ যে রোগ নিয়ে আসেন সেই রোগেই মারা যান। অভিযোগটি বোঝা সহজ, প্রমাণ করা ভীষণ কঠিন।
এ দেশে প্রশ্নটি কী দাঁড়ায়
বাংলাদেশে সিনোভিসের মতো কিছু নেই, আর এটি স্বস্তির খবর নয়। এখানে প্যাথলজি ছড়িয়ে আছে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক চেইন আর হাসপাতালের ল্যাবে। এতে একক কোনো হামলার বিস্তার সীমিত থাকে বটে, কিন্তু এর মানে এমন কোনো একক প্রতিষ্ঠানও নেই, যেটি অচল হলে জাতীয় পর্যায়ে সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হবে। বেশির ভাগ ল্যাব চলে বাণিজ্যিক ল্যাব-ইনফরমেশন সিস্টেমে, সাপোর্ট চুক্তি থাকে, ব্যাকআপের বয়স অনিশ্চিত, আর কিছু ঘটলে কাউকে জানানোর বাধ্যবাধকতাও নেই।
কোনো হাসপাতাল ব্যবস্থাপকের জন্য কাজের প্রশ্নটি এই নয় যে র্যানসমওয়্যার আসবে কি না। প্রশ্নটি আরও সরু: এই হাসপাতাল কত দিন কাগজে-কলমে রক্ত পরীক্ষার কাজ চালাতে পারবে, কাগজে ফেরার সিদ্ধান্ত কে নেবেন, আর কেউ কি কখনো তা করে দেখেছেন? ২০২৪ সালের জুনে লন্ডনের যে হাসপাতালগুলো সবচেয়ে ভালোভাবে সামলেছিল, দরকার পড়ার আগেই তাদের কাছে এ উত্তরগুলো ছিল।
সম্পর্কিত: সাইবার স্পেসে জাপানের জরুরি অবস্থা।




