দক্ষিণ ওয়েলসের নিউপোর্টে এম৪ মহাসড়কের পাশে এক ধাতব ভবনে ওভারঅল পরা প্রকৌশলীরা বানান সেই ওয়েফার, যা শেষ পর্যন্ত ঢোকে এআই যন্ত্রপাতির ভেতরে। প্রতিষ্ঠানটির নাম আইকিউই, উৎপাদনে আছে ১৯৮৮ সাল থেকে; আর এর প্রধান নির্বাহীর একটি কথা যাচাই করার মতো: "আমরা এআইয়ের ওপর ভিত্তি করে আর এআইকে সহায়তা করে দারুণ সব চাকরি বাড়াচ্ছি—এআই দিয়ে চাকরি ধ্বংস করার একেবারে উল্টো।"
কথাটি এমন এক সপ্তাহে এল, যখন এআই নিয়ে উল্টো ধরনের শিরোনামই সর্বত্র। প্রযুক্তিটিকে ঘিরে নিজেকে নতুন করে সাজাতে গিয়ে ওরাকল বিশ্বজুড়ে ২১ হাজার পদ ছাঁটাই করেছে; অ্যামাজন আর মেটাও এতে বিপুল বিনিয়োগ করতে করতে আরও কয়েক হাজার চাকরি কমিয়েছে।
আইকিউই আসলে কী বানায়
পার্থক্যটাই পুরো গল্প। আইকিউইর চিপ সেই অ্যালগরিদম নয়, যার সঙ্গে আপনি কথা বলেন। এগুলো কম্পাউন্ড সেমিকন্ডাক্টর—ডেটা সেন্টারের ভৌত কাঠামোর অংশ, বাকি সবকিছুর নিচে যে যন্ত্রপাতি সংকেত বহন ও বদল করে, তার ভেতরে বসে। এআইয়ের জোয়ার যখন নির্মাণের জোয়ারে বদলে গেল, ওই যন্ত্রপাতির চাহিদাও বাড়ল।
শুরুটা অবশ্য মসৃণ ছিল না। "গত ১৮ মাস বেশ ঝাঁকুনির ছিল," স্বীকার করেন প্রধান নির্বাহী; বিনিয়োগকারীদের মনোযোগ ধরে রাখতে আইকিউইকে লড়তে হয়েছে। এ বছরের শুরুতে ডেটা সেন্টারের গণনাক্ষমতায় তাদের ভূমিকা স্বীকৃতি পায়, শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়ে, প্রতিষ্ঠানটি ঋণ শোধ করে আবার নিয়োগ শুরু করে। "আমরা সত্যিই ভাগ্যবান যে এই এবড়োখেবড়ো পথে আমাদের সঙ্গে থেকে যাওয়া একটি নিবেদিত কর্মীবাহিনী আছে," বলেন তিনি। "আইকিউইর জন্য মেধাই সবচেয়ে বড় সম্পদগুলোর একটি।"
ক্লাস্টারের হিসাব
আইকিউইর মতো প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে নিউপোর্টে গড়ে উঠেছে সেমিকন্ডাক্টর ক্লাস্টার। সিএসকানেক্টেডের জন্য কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েলশ ইকোনমি রিসার্চ ইউনিটের স্বাধীন প্রতিবেদন বলছে, দক্ষিণ ওয়েলসের কম্পাউন্ড সেমিকন্ডাক্টর খাত ২০২৫ সালে ওয়েলসজুড়ে ৩,১৪০টি চাকরি টিকিয়ে রেখেছে, আগের বছর যা ছিল ২,৭৪৮—১৪ শতাংশ বৃদ্ধি। এর মধ্যে ১,৯১৪টি সরাসরি শিল্পের চাকরি, কেন্দ্রীভূত নিউপোর্ট ও এম৪ করিডরে। খাতটির গড় বেতন প্রায় ৬৬ হাজার পাউন্ড। তুলনায়, অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিকসের হিসাবে আগস্টে যুক্তরাজ্যের মধ্যমা বেতন ছিল মাসে ২,৬৫৭ পাউন্ড, বছরে প্রায় ৩১ হাজার ৮৮৪ পাউন্ড।
যুক্তরাজ্যের এআই মন্ত্রী কনিষ্ক নারায়ণ বলেন, এআইয়ের ভবিষ্যতের জন্য ওয়েলসকে "নিজেকে পুনঃশিল্পায়িত" করতে হবে, পাশাপাশি এই পরিবর্তনে "ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেককে সহায়তা" দিতে হবে।
শুরু ১৫ বছরেই
কারখানা থেকে দুই মাইল দূরে বাসালেগ স্কুল যুক্তরাজ্যের প্রথম কয়েকটি স্কুলের একটি, যারা সেমিকন্ডাক্টরের সনদ কোর্স দিচ্ছে। প্রধান শিক্ষক ভিক্টোরিয়া ল্যাম্ব বলেন, এতে শিক্ষার্থীরা "একেবারে দোরগোড়ার" এক শিল্প সম্পর্কে জানতে পারে, আর "শিক্ষার্থীদের এমন সুযোগ দিতে নিজেদের সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করা" জরুরি। ১৫ বছরের গ্রেসের কথা আরও সোজা: "সত্যিই দারুণ মজা। আমরা হাতেকলমে কাজ করছি, আর কোর্সের আগে আমি ভাবতাম সেমিকন্ডাক্টর মানেই কম্পিউটারের ভেতরের জিনিস।"
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা
বাংলাদেশে এআই নিয়ে আলোচনা প্রায় পুরোটাই ওপরের স্তর নিয়ে—প্রম্পট, চ্যাটবট, কনটেন্ট আর এসবের ওপর দাঁড়ানো ফ্রিল্যান্সিং। এই স্তরেই ঢোকা সবচেয়ে সহজ, আর ঠিক এ কারণেই মডেল উন্নত হলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতেও পড়ে এই স্তরটাই। নিউপোর্ট মনে করিয়ে দেয়, এআই অর্থনীতির একটা ভৌত মেঝেও আছে—আর সেখানকার চাকরিগুলোই দেশের মধ্যমা আয়ের দ্বিগুণ দিচ্ছে।
বাংলাদেশ শিগগির গ্যালিয়াম আর্সেনাইড ওয়েফার বানাবে না। কিন্তু স্থানান্তরযোগ্য জিনিসটা কারখানা নয়, ক্রমটা: একটি নির্দিষ্ট কাজ করা প্রতিষ্ঠানের ক্লাস্টার, তা সৎভাবে মাপা একটি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিট, আর দুই মাইল দূরের একটি মাধ্যমিক স্কুল যা পনেরো বছরের শিক্ষার্থীদের বিষয়টি পড়ায়। টুকরোগুলো দেশে আছে—বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের পার্ক, উল্কাসেমিসহ গুটিকয় প্রতিষ্ঠানের চিপ ডিজাইন শিল্প, আর ইইই পড়ানো শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয়। যা নেই, তা হলো শ্রেণিকক্ষ থেকে নাম-ধরে-চেনা স্থানীয় নিয়োগদাতার কাছে পৌঁছানোর সেতুটি—বাসালেগ স্কুল ঠিক যেটি বানিয়েছে।




