প্রযুক্তি

একটিমাত্র আইসোটোপে পারমাণবিক বর্জ্যের সমস্যা: আয়োডিন-১২৯ টেকে ১ কোটি ৫৭ লাখ বছর, আর যে সংখ্যাটি একে ভয়ংকর শোনায় সেটিই একে বৈধ করে

ফ্রান্স বছরে প্রায় ১৫৩ কেজি আই-১২৯ সাগরে ছাড়ে। ভরটি বড় ঠিক এ কারণেই যে অর্ধায়ু দীর্ঘ — আর এটিই গোটা সমস্যা, স্বস্তির কারণ নয়।

একটিমাত্র আইসোটোপে পারমাণবিক বর্জ্যের সমস্যা: আয়োডিন-১২৯ টেকে ১ কোটি ৫৭ লাখ বছর, আর যে সংখ্যাটি একে ভয়ংকর শোনায় সেটিই একে বৈধ করে

পারমাণবিক চুল্লি জ্বালানি থেকে শক্তি নিয়ে এমন পদার্থ রেখে যায়, যা বহুদিন তেজস্ক্রিয় থাকে। পারমাণবিক বর্জ্য নিয়ে তর্কের বেশির ভাগটাই এই “বহুদিন” নিয়ে, সাধারণভাবে। এমআইটি ও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি জাতীয় গবেষণাগারের গবেষণা একে সংকুচিত করে এনেছে একটিমাত্র পদার্থে, যা সমস্যাটিকে মূর্ত করে তোলে: আয়োডিন-১২৯।

এই আইসোটোপটিই কেন

আই-১২৯ একটি ফিশন প্রোডাক্ট — ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস ভাঙলে যে টুকরো থেকে যায় — আর এর অর্ধায়ু প্রায় ১ কোটি ৫৭ লাখ বছর। মানুষের কোনো সময়স্কেলেই এর অর্থপূর্ণ ক্ষয় হয় না। একে দেখা যায় না, গন্ধে বা স্পর্শে বোঝা যায় না।

আরও দুটি বৈশিষ্ট্য একে পরিকল্পনার নিয়ামক করে তোলে। ভারী বর্জ্য পদার্থ সাধারণত পাথরে আটকে এক জায়গায় থেকে যায়; আয়োডিন তা নয়, এটি গতিশীল: সহজে দ্রবীভূত হয় আর মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানির ভেতর দিয়ে চলে যায়। আর মানবদেহ সক্রিয়ভাবে আয়োডিন জমা করে থাইরয়েডে, কাজেই যেটুকু কোনো মানুষের শরীরে পৌঁছায় তা বেরিয়ে যায় না — ছোট একটি গ্রন্থিতে জমতে থাকে, আর এ কারণেই ঝুঁকিটি থাইরয়েড ক্যানসার।

গতিশীল, দীর্ঘায়ু আর জৈবিকভাবে লক্ষ্যভেদী — এই সমন্বয় অস্বাভাবিক, আর এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের ভান্ডার-পরিকল্পনায় আই-১২৯-কে প্রধান বিপদ ধরা হয় এবং পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা পানীয় জলে এর সীমা বেঁধেছে প্রতি লিটারে ৫.৬৬ ন্যানোগ্রাম — যেকোনো তেজস্ক্রিয় পদার্থের জন্য নির্ধারিত সর্বনিম্ন সীমা।

যে সংখ্যাটি দুদিকেই কাটে

ফ্রান্স ব্যবহৃত জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে এবং উৎপন্ন আই-১২৯ নিয়ন্ত্রক সীমার মধ্যে থেকে সাগরে ছেড়ে দেয় — বছরে প্রায় ১৫৩ কিলোগ্রাম। আয়োডিন উদ্বায়ী এবং রাসায়নিকভাবে ধরে রাখা কঠিন বলে পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের সময় জ্বালানিতে থাকা আই-১২৯-এর প্রায় ৯০ শতাংশই ধরা পড়ে না।

দেড় কোটি বছর টেকে এমন কিছুর ১৫৩ কিলোগ্রাম শুনলে একে স্পষ্ট কেলেঙ্কারি মনে হয়। ওই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে বোঝা দরকার ভরটি এত বড় কেন — কারণ ব্যাখ্যাটিই গোটা সমস্যার কেন্দ্র।

তেজস্ক্রিয়তা মানেই ক্ষয় ঘটতে থাকা। স্বল্পায়ু আইসোটোপ তীব্রভাবে তেজস্ক্রিয়, কারণ তার পরমাণুগুলো দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে — আর ঠিক একই কারণে সেটি দ্রুত ফুরিয়েও যায়। দীর্ঘায়ু আইসোটোপ এর আয়নাপ্রতিচ্ছবি: এর পরমাণু এত ধীরে ক্ষয় হয় যে এক গ্রাম থেকে তুলনামূলকভাবে সামান্যই বিকিরণ হয়, আর সেটি কার্যত চিরকাল টিকে থাকে। দীর্ঘ অর্ধায়ু আর গ্রামপ্রতি কম তেজস্ক্রিয়তা একই কথা।

কাজেই ১৫৩ কেজি আই-১২৯ ভরটি যতটা ইঙ্গিত দেয় তার চেয়ে অনেক কম তেজস্ক্রিয়তা বহন করে — আর ঠিক এ কারণেই এটি ছাড়ার অনুমতি আছে। আর এ কারণেই এটি সাগরে এবং সাগরের মধ্য দিয়ে চক্রাকারে ঘোরা সবকিছুতে রয়ে যাবে — আজ যারা এ নিয়ে তর্ক করছে সেই প্রতিটি প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার বহু পরেও। আইসোটোপটি বিপজ্জনক তীব্র তেজস্ক্রিয়তার কারণে নয়। এটি সমস্যা, কারণ এটি মৃদু তেজস্ক্রিয়, রাসায়নিকভাবে গতিশীল, জৈবিকভাবে লক্ষ্যভেদী এবং কার্যত স্থায়ী।

তীব্র বিপদের চেয়ে এ ধরনের বিপদ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন, কারণ প্রতিটি একক নিঃসরণ সত্যিই সামান্য আর পরিমাণটি কেবল জমতেই থাকে।

দেশগুলো যে তিনভাবে এটি সামলায়

নিঃসরণ। অনুমোদিত সীমার মধ্যে ছেড়ে দেওয়া, ওপরে যেমন। সস্তা, বৈধ এবং অপরিবর্তনীয়: একবার সাগরে গেলে তা ফিরিয়ে আনার কোনো ধাপ নেই।

গভীর ভূতাত্ত্বিক সমাধি। বর্জ্য পাত্রে সিল করে কয়েক শ মিটার নিচে এমন স্থিতিশীল পাথরে রাখা, যা প্রয়োজনীয় সময়কাল ধরে একে বিচ্ছিন্ন রাখবে। বিশেষজ্ঞরা সাধারণত এটিকেই সঠিক মনে করেন, আর প্রায় কেউই এটি সম্পন্ন করতে পারেনি — বাধাগুলো কারিগরি নয়, রাজনৈতিক ও প্রক্রিয়াগত, কারণ একটি জায়গা বাছতে হয়, অর্থাৎ কোনো জনগোষ্ঠীকে তা মেনে নিতে হয়। ব্যবহৃত জ্বালানির ভান্ডার নিয়ে ফিনল্যান্ড সবচেয়ে এগিয়ে; যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশকের চেষ্টার পরও বেসামরিক ক্ষেত্রে চালু কোনো সমতুল্য ভান্ডার পায়নি।

অগভীর সমাধি। ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি সংরক্ষণ, যা কয়েকটি দেশ আই-১২৯-বাহী বর্জ্যের জন্য ব্যবহার করে। গবেষণাটি স্পষ্ট ঝুঁকিটির কথা বলছে, আর এটির জন্য পরিকল্পনা করতে হওয়া নিজেই অদ্ভুত: শত শত বছর পরে এমন কেউ খুঁড়তে পারেন, যিনি জানেনই না সেখানে কী পোঁতা আছে। আজ প্রচলিত কোনো ভাষাই বলবেন না এমন মানুষের কাছে পাঠযোগ্য থাকে এমন সতর্কবার্তা নকশা করা একটি বাস্তব ও অমীমাংসিত গবেষণাক্ষেত্র।

গবেষকদের একজন হারুকো ওয়াইনরাইট বলেছেন, “আই-১২৯ সংরক্ষণ অপরিহার্য, আর কিছু দেশ পরিবেশে বিপুল পরিমাণে এটি ছাড়ছে।”

রূপপুরের জন্য এটি কী মীমাংসা করে

অন্য প্রতিটি চুল্লির মতোই রূপপুরে বাংলাদেশের প্রথম চুল্লিও আই-১২৯-যুক্ত ব্যবহৃত জ্বালানি তৈরি করবে। রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তিতে ব্যবহৃত জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণের জন্য রাশিয়ায় ফেরত পাঠানোর সংস্থান আছে।

বিষয়গত বিচারে এটি যুক্তিসংগত ব্যবস্থা, আর এর একটি সুনির্দিষ্ট কারণ বলা দরকার: ওপরের তিনটি বিকল্পের প্রতিটিরই এমন অবকাঠামো লাগে যা বাংলাদেশের নেই এবং গড়ে তোলাও কঠিন হতো। পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্প নেই, গভীর ভূতাত্ত্বিক ভান্ডার নেই, আর এমন ভান্ডারের জন্য স্পষ্ট কোনো জায়গাও নেই — ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি পানির স্তরসহ একটি বদ্বীপ হলো লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ভূগর্ভস্থ পানি থেকে একটি গতিশীল আইসোটোপ বিচ্ছিন্ন রাখার জন্য প্রায় সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ ভূতত্ত্ব। জ্বালানি ফেরত পাঠানো দায় এড়ানো নয়; এই ভূগোলের জন্য এটিই দায়িত্বশীল উত্তর।

তবে এর মানে দাঁড়ায়, গবেষণাটি যে প্রশ্নটি করছে — নিঃসরণ, গভীর না অগভীর — তার উত্তর বাংলাদেশের হয়ে দেওয়া হবে অন্যত্র, অন্য দেশের বিধিবিধানের অধীনে, বাংলাদেশের বয়সের চেয়েও দীর্ঘ একটি সময়ের জন্য। এটি ব্যবস্থাটির বিরুদ্ধে যুক্তি নয়। এটি যুক্তি এই জন্য যে, কোন উত্তরটি বেছে নেওয়া হচ্ছে তা জানা দরকার — আর জ্বালানি ফেরতের শর্তগুলো যেন কেউ-না-পড়া কোনো ধারা না থেকে প্রকাশ্য নথির অংশ হয়।

সূত্র: MIT and US national laboratory research, US EPA limits, IAEA practice, Prothom Alo

লিখেছেন

Tanmay Das

টেক বিডিতে বিজ্ঞান, মহাকাশ ও স্বাস্থ্য নিয়ে লেখেন তন্ময় দাস — গবেষণার ফল, মহাকাশ অভিযান আর চিকিৎসাবিজ্ঞানের খবর। কোনো গবেষণা আসলে কী মেপেছে, তিনি তা-ই পড়েন; আর লেখেন সংবাদ বিজ্ঞপ্তির জন্য নয়, ঢাকার পাঠকের জন্য তার মানে কী—তা নিয়ে।