পৃথিবীর প্রাকৃতিক জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ ও বৃষ্টিপাত চক্র বজায় রাখার ক্ষেত্রে আমাজন বনের গুরুত্ব তার আয়তনের তুলনায় অনেক বেশি। আমাজন কনজারভেশনের মনিটরিং অব দ্য আন্দিজ আমাজন প্রোগ্রামের (এমএএপি) এক প্রতিবেদন এর কতটা হারিয়েছে, তার একটি সংখ্যা দিচ্ছে।
ধ্বংস হয়ে গেছে ২৪ কোটি একর প্রাথমিক বনাঞ্চল—যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ও ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের মোট আয়তনের সমান।
এটি আমাজন অববাহিকার নয়টি দেশজুড়ে থাকা মোট প্রাথমিক বনাঞ্চলের প্রায় ১৫ শতাংশ, যা চিরতরে হারিয়ে গেছে। ২০২১ সালের প্রতিবেদনে এই হার বলা হয়েছিল ১৩ দশমিক ২ শতাংশ। কাগজে-কলমে ব্যবধান সামান্য মনে হলেও বাস্তবে এটি এক বিশাল এলাকাজুড়ে পরিবেশ বিপর্যয়।
কোথায় ঘটেছে
ধ্বংসের ৭৯ দশমিক ৪ শতাংশই ঘটেছে ব্রাজিলে। এরপর বলিভিয়ায় ৬ দশমিক ২ শতাংশ, পেরুতে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং কলম্বিয়ায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে আরও ৩ কোটি ২২ লাখ একর বনাঞ্চল ধ্বংস হয়েছে—যা ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কের আয়তনের প্রায় ১৫ গুণ। ২০২৩ সালের শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে ২০২৪ সালে রেকর্ড পরিমাণ বনভূমি দাবানলে ভস্মীভূত হয়।
কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে দুটি: মানুষের জমি দখলের তীব্র প্রবণতা আর দাবানলের ধ্বংসযজ্ঞ।

যে প্রক্রিয়াটি বোঝা দরকার
এই অংশটিই আমাজনকে সাধারণ বন-ধ্বংসের খবর থেকে আলাদা করে।
আমাজনের বিশাল সব গাছ মাটি থেকে পানি টেনে নিয়ে বাষ্প আকারে বায়ুমণ্ডলে ছেড়ে দেয়। বাতাস সেই জলীয় বাষ্পকে মহাদেশজুড়ে ছড়িয়ে দেয়—বিজ্ঞানীরা একে বলেন উড়ন্ত নদী। এই প্রক্রিয়ায় আমাজন তার নিজের বৃষ্টিপাতের প্রায় অর্ধেক নিজেই তৈরি করে, আর এই পানি চলার পথে কয়েকবার ব্যবহৃত হয়।
অর্থাৎ বনটি কেবল আঞ্চলিক জলবায়ুর সুবিধাভোগী নয়। সেটি তৈরি করার যন্ত্রেরই একটি বড় অংশ। যথেষ্ট গাছ সরিয়ে ফেললে আপনি কেবল গাছ হারান না—বাকি গাছেরা যে বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে, তা-ও কমিয়ে ফেলেন।
বিজ্ঞানীরা সীমা ধরেছেন ২৫ শতাংশে: আমাজনের এক-চতুর্থাংশ বন ধ্বংস হলে পুরো অববাহিকা স্থায়ীভাবে বদলে যাবে।
গবেষকেরা যে সংশোধনটি চান
এটি সাধারণত যেভাবে পরিবেশিত হয়, সে বিষয়ে একটি সরাসরি মন্তব্য করেছেন গবেষক ম্যাট ফিনার। তিনি বলছেন, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রায়ই বলা হয় আমাজন এক বিপজ্জনক মোড়ের কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছে।
প্রকৃত তথ্য হলো, বনাঞ্চল উচ্ছেদ ও দাবানলে আমাজনের ১৫ শতাংশ ইতিমধ্যেই ধ্বংস হয়ে গেছে। এর মাধ্যমে রেইনফরেস্ট টিকিয়ে রাখা জলবিজ্ঞান চক্রটি চিরতরে ব্যাহত হতে পারে।
পার্থক্যটি শুনতে যতটা, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সামনে আসা একটি বিপজ্জনক মোড় তর্ক করার কারণ। আর ১৫ শতাংশ ইতিমধ্যেই চলে যাওয়া, পানিচক্রে প্রভাব পড়তে শুরু করা—এটি বর্তমানের বর্ণনা, আর এটি সেই স্বস্তিটি কেড়ে নেয় যে এটি ভবিষ্যতের সমস্যা, আসার আগেই কেউ সামলে নেবে।
ফিনার বলছেন, যে অংশ আগে থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত, সেখানেই প্রভাব পড়বে সবচেয়ে দ্রুত। পেরু ও বলিভিয়ার যেসব কৃষক ও সাধারণ মানুষ বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল, তাঁদের কাছে প্রশ্নটি আর বিমূর্ত নয়। দূরবর্তী কোনো পরিবেশ সংকটের চেয়ে আকাশে বৃষ্টিবাহী মেঘ আসার অনিশ্চয়তাই তাঁদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
বাংলাদেশ থেকে এটি পড়ার কারণ
দুটি কারণ, আর কোনোটিই দূরের কোনো বন নিয়ে আবেগ নয়।
প্রথমটি প্রক্রিয়া। যে ব্যবস্থা নিজের টিকে থাকার শর্তগুলো নিজেই তৈরি করে, আর যার যথেষ্ট অংশ সরিয়ে ফেললে সে ভেঙে পড়তে থাকে—তা কেবল আমাজনেরই নয়। সুন্দরবন এখানে কাঠামোগতভাবে তুলনীয় ভূমিকা রাখে—বৃষ্টি তৈরি নয়, জলোচ্ছ্বাস শুষে নেওয়া—আর একই যুক্তি খাটে: সুরক্ষাটি বিস্তৃতির ওপর নির্ভরশীল, আর বিস্তৃতি হারানোর পরিণতি সরলরৈখিক নয়।
দ্বিতীয়টি হলো এই সংখ্যাটি আমরা কীভাবে পেলাম। এমএএপি একটি স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি। কেউ আমাজন অববাহিকা হেঁটে মাপেননি। ক্ষয়টি মাপা গেছে, কারণ কেউ নয়টি দেশজুড়ে বছরের পর বছর ধরে অবিরাম মাপার একটি ব্যবস্থা বানিয়েছিলেন—এ কারণেই ২০২৬ সালের সংখ্যার সঙ্গে মেলানোর মতো ২০২১ সালের একটি সংখ্যা আছে। সেই ভিত্তি না থাকলে ১৫ শতাংশ হতো একটি দাবি, পরিমাপ নয়।
আরও পড়ুন: দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ যা খুঁজে পায়।




