পাসওয়ার্ডের বদলে পাসকি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাজ্যের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র (এনসিএসসি)। সংস্থাটি বলেছে, যেসব অ্যাপ ও ওয়েবসাইটে পাসকি ব্যবহারের সুযোগ আছে, সেখানে লগইনের জন্য পাসওয়ার্ডের বদলে পাসকি বেছে নেওয়া উচিত—কারণ সাইবার হামলার ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রচলিত পাসওয়ার্ড যথেষ্ট নিরাপদ নয়।
পাসকি কী
পাসকি হলো পাসওয়ার্ড ছাড়াই বিভিন্ন অ্যাপ ও ওয়েবসাইটে প্রবেশের একটি পদ্ধতি। এটি ব্যবহারকারীর নিজের যন্ত্রে সংরক্ষিত থাকে এবং নিরাপদে পরিচয় যাচাই করে অ্যাকাউন্টে ঢোকার সুযোগ দেয়। নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞরা একে ‘ডিজিটাল সিল’ হিসেবেও বর্ণনা করেন।
এটি ব্যবহার করতে আলাদা কোনো পাসওয়ার্ড মনে রাখতে হয় না। স্মার্টফোনের মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ, আঙুলের ছাপ কিংবা পিন নম্বর দিয়ে নিজের পরিচয় নিশ্চিত করলেই হয়; এরপর সংশ্লিষ্ট অ্যাপ বা ওয়েবসাইট নিশ্চিত করে যে সঠিক ব্যবহারকারীই প্রবেশের চেষ্টা করছেন।
ফিশিংয়ে কেন এটি টেকে
এই অংশটিই গুরুত্বপূর্ণ, আর এটি সতর্ক থাকার বিষয় নয়—কাঠামোগত।
ফিশিং হামলায় প্রতারকেরা ভুয়া ই-মেইল, বার্তা কিংবা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করে তাঁদের পাসওয়ার্ড ও অন্য লগইন তথ্য হাতিয়ে নেয়, যা পরে ডার্ক ওয়েবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পাসকি সাধারণ পাসওয়ার্ডের মতো কোনো তথ্যই নয়। পড়ে শোনানোর, বিশ্বাসযোগ্য ভুয়া পাতায় লিখে ফেলার কিংবা চ্যাটে পেস্ট করার কিছু এখানে নেই।
প্রতিটি অ্যাকাউন্টের জন্য আলাদা পাসকিও তৈরি হয়। একটি অ্যাকাউন্টের পাসকি দিয়ে অন্য অ্যাকাউন্টে ঢোকা যায় না। আর পাসকি ব্যবহার করে এমন কোনো অ্যাপ বা ওয়েবসাইটেই হামলা চালিয়ে তথ্য চুরি হলেও, সেই তথ্য দিয়ে আক্রমণকারীরা সহজে ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্টে ঢুকতে পারে না।

সব মিলিয়ে, মানুষ আসলে যে তিনভাবে অ্যাকাউন্ট হারায়, তার দুটি এতে বাদ পড়ে যায়: ফাঁদে পড়ে গোপন তথ্য বলে দেওয়া, আর এক গোপন তথ্য বহু সাইটে বারবার ব্যবহার করা। দুটি নিয়েই আমরা বারবার লিখেছি—অ্যাসোসের লাখো গ্রাহকের কাছে পাঠানো দখল করা পুশ নোটিফিকেশন, আর একটিমাত্র চুরি করা কর্মীর লগইন যা মেটার গিটহাব ভান্ডার খুলে দিয়েছিল।
সংস্থার নিজের যুক্তিটি সুবিধা নিয়ে
এনসিএসসির জ্যেষ্ঠ প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞ ডেভ চিসমনের মতে, পাসকি প্রযুক্তিগতভাবে জটিল হলেও ব্যবহারকারীদের জন্য এটি দ্রুত ও সহজ। পাসওয়ার্ড মনে রাখা কিংবা টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশনের একাধিক ধাপ পার হওয়ার বদলে সহজেই অ্যাকাউন্টে ঢোকা যায়। ফলে নিরাপত্তা বাড়ে, আর লগইনের প্রক্রিয়াও সহজ হয়।
এই সমন্বয়টি বিরল, আর গুরুত্ব দিয়ে নেওয়ার মতো। নিরাপত্তার বেশির ভাগ পরামর্শ মানুষকে বাড়তি ঝামেলা মেনে নিতে বলে—আর সে কারণেই নিরাপত্তার বেশির ভাগ পরামর্শ কেউ শোনে না।
যে কথাটি কেউ বলে না
পাসকি থাকে আপনার যন্ত্রে। তাই সোজা প্রশ্নটি—যা এই লেখা এবং আরও বেশির ভাগ ব্যাখ্যাই এড়িয়ে যায়—যন্ত্রটি হারিয়ে গেলে, চুরি হলে, পানিতে পড়লে বা মুছে ফেলা হলে কী হবে।
উত্তরটি নির্ভর করে পাসকিটি কোথায় রাখা তার ওপর। গুগল পাসওয়ার্ড ম্যানেজার, আইক্লাউড কিচেইন বা তৃতীয় পক্ষের কোনো ম্যানেজারে সিংক হলে নতুন ফোনে ওই অ্যাকাউন্টে লগইন করলেই সেটি ফিরে আসে, আর আপনার ঝুঁকি সরে যায় ওই একটি অ্যাকাউন্টে। কেবল যন্ত্রেই রাখা থাকলে যন্ত্র হারানো মানে সাইটটির দেওয়া যে উদ্ধার-পথ আছে তাতেই ফিরে যাওয়া—প্রায়ই একটি ই-মেইল লিংক বা এসএমএস কোড, অর্থাৎ যে দুর্বল পদ্ধতি ছেড়ে আসার চেষ্টা করছিলেন সেটিই।
তাই গুরুত্বপূর্ণ কিছু বদলানোর আগে তিনটি বিষয় নিষ্পত্তি করুন:
কোথায় সিংক হয়। আপনার পাসকি কোনো অ্যাকাউন্টে ব্যাকআপ হচ্ছে কি না দেখে নিন, আর সেই অ্যাকাউন্টটি ভালোভাবে সুরক্ষিত করুন—কারণ এখন সেটিই মাস্টার কি।
দ্বিতীয় একটি পদ্ধতি। একটির বেশি যন্ত্রে পাসকি নিবন্ধন করুন, কিংবা একটি বিকল্প পদ্ধতি চালু রাখুন—যাতে ফোন নষ্ট হওয়া মানে অ্যাকাউন্ট আটকে যাওয়া না হয়।
উদ্ধার-পথ কী। পাসকি ছাড়া সাইটটি আপনাকে কীভাবে ফিরতে দেয়, দেখে নিন। পাসকি যত শক্তই হোক, আপনার আসল নিরাপত্তার মাত্রা ওই পথটিই।
এখানকার পাঠকের জন্য আরও একটি ব্যবহারিক কথা। পাসকির জন্য দরকার তুলনামূলক আধুনিক একটি ফোন ও কাজ করা বায়োমেট্রিক সেন্সর, আর দেশের বেশির ভাগ ব্যাংকিং ও সরকারি সেবা এখনো এটি দেয় না—তাই নিকট ভবিষ্যতের বাস্তবতা হলো বড় আন্তর্জাতিক অ্যাকাউন্টে পাসকি, আর বাকি সব জায়গায় পাসওয়ার্ড ও টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন। আপনার উদ্ধার-পথ যদি এখনো এসএমএস কোড দিয়ে চলে, তবে আসল সুরক্ষার জিনিসটি আপনার সিম।
প্রতিবেদনটির জন্য প্রথম আলো দ্য গার্ডিয়ানকে সূত্র হিসেবে উল্লেখ করেছে।




