প্রযুক্তি

ডেলিভারি ড্রোনের শব্দে বাগানে বসা ছেড়ে দিয়েছেন তিনি—আর ড্রোন চুপ করানোর চেষ্টায় থাকা স্টার্টআপগুলো প্রথম ক্রেতা পেয়েছে সেনাবাহিনীতে

ড্রোনের শব্দ তার মাত্রার তুলনায় অনেক বেশি বিরক্ত করে, আর গবেষণা ব্যাখ্যা করে কেন। একই প্রযুক্তির বাজার আছে নজরদারি ও যুদ্ধে।

ডেলিভারি ড্রোনের শব্দে বাগানে বসা ছেড়ে দিয়েছেন তিনি—আর ড্রোন চুপ করানোর চেষ্টায় থাকা স্টার্টআপগুলো প্রথম ক্রেতা পেয়েছে সেনাবাহিনীতে

ডালাসের উপশহর নর্থ গারল্যান্ডে নিজের বাগানে আর বেশি সময় কাটান না অ্যাশলি শ্মিট। স্থানীয় যে পার্কগুলোতে সাইকেল চালিয়ে গিয়ে পোকামাকড়, গিরগিটি আর ব্যাঙের ক্লোজ-আপ ছবি তুলতেন, সেটিও ছেড়ে দিয়েছেন।

কারণ প্রতিবেশীদের অনলাইন অর্ডার নিয়ে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া ডেলিভারি ড্রোন। ‘এগুলো এমন একটা বিরক্তিকর ভনভন শব্দ ছাড়ে। আমার ফাইট-অর-ফ্লাইট প্রতিক্রিয়া জেগে ওঠে,’ বলেন ৪৪ বছর বয়সী এই প্রশাসনিক সহকারী। ‘ড্রোন আসার সময় শোনা যায়, ঠিক মাথার ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় ঘরের ভেতরেও শোনা যায়, আর তারপর চলে যাওয়ার সময়ও শোনা যায়।’

কত ড্রোনের কথা বলছি

ড্রোনে ডেলিভারি অল্পদিন আগেও ছিল চমক। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অংশে এটি এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ। অ্যামাজন প্রাইম এয়ার ছড়িয়ে পড়ছে প্রায় ৫০০ শহর ও জনপদে, পৌঁছে দিচ্ছে জুতার বাক্সের আকারের জায়গায় ঢোকে এমন জিনিস; ইংল্যান্ডের উত্তরে ডার্লিংটন ও আশপাশেও সেবা চালু করেছে। ওয়ালমার্ট চালাচ্ছে নিজের সেবা। ছোট অপারেটরও আসছে—যুক্তরাষ্ট্রের কিছু শহরে স্থানীয় পিৎজার দোকান বা আইসক্রিম পারলার থেকেও উড়ন্ত খাবার অর্ডার করা যায়।

শব্দটি মাত্রার তুলনায় কেন বেশি বিরক্ত করে

এটিই সত্যিকারের কৌতূহলোদ্দীপক অংশ, কারণ অভিযোগটি কেবল ডেসিবেলের নয়।

যানবাহনের নিয়মিত যাওয়া-আসা যেখানে পটভূমিতে মিশে যায়, ড্রোনের রোটরের আকস্মিক তীক্ষ্ণ শব্দ সেখানে দৈনন্দিন গুনগুনকে কেটে বসে। শব্দটি ‘বিশেষভাবে চোখে পড়ে, এমনকি সামগ্রিক শব্দমাত্রা তুলনামূলক কম থাকলেও,’ বলেন ইউনিভার্সিটি অব স্যালফোর্ডের শব্দ-প্রকৌশল ও সাইকোঅ্যাকোস্টিকসের অধ্যাপক আন্তোনিও তোরিহা মার্তিনেস।

বিমানের মতো নয়, ড্রোন ওড়ে কম উচ্চতায়, আর সরাসরি আবাসিক এলাকার ওপর দিয়েও যেতে পারে। ‘এগুলো এমন জনগোষ্ঠীকে শব্দের মুখে ফেলতে পারে, যাঁরা আগে উল্লেখযোগ্য উড়োজাহাজের শব্দ শোনেননি, আর তাই নিজেদের এলাকার শব্দচিত্রের পরিবর্তনে বেশি সংবেদনশীল হতে পারেন,’ বলেন তিনি।

তিনি এমন গবেষণার কথা বলেন, যা দেখায়—শব্দের উৎসকে ‘নতুন, অনুপ্রবেশকারী বা ঘন ঘন’ মনে হলে মানুষ জোরালো প্রতিক্রিয়া দেখায়। সঙ্গে যোগ করেন, ড্রোন ডেলিভারির সুবিধা যাঁরা পান, তাঁদের শব্দটি কম বিরক্ত করতে পারে। সমস্যার অস্বস্তিকর কেন্দ্রটি এটাই: বিরক্তি ছড়িয়ে পড়ে উড়াল-পথের নিচের সবার মধ্যে, আর সুবিধাটি পৌঁছে যায় একটিমাত্র দরজায়।

তাঁর প্রত্যাশা, অভিযোগ বাড়বে: ‘এই মুহূর্তে এসব সমস্যা কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ দেখছি, কিন্তু… ড্রোন খাত যত বিস্তৃত হবে, এ ধরনের অভিযোগ তত বেশি ঘটবে।’

যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্যিক ড্রোন নিয়ন্ত্রণ করে ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ), আর শব্দময় ডেলিভারি কার্যক্রমের অনুমতি দেওয়ায় তারা সমালোচিতও হয়েছে। এফএএ বলছে, এলাকাবাসীর উদ্বেগ সামলানোর মূল দায়িত্ব অপারেটর ও স্থানীয় নেতৃত্বের—অর্থাৎ নিয়ন্ত্রক সমস্যাটি রেখে দিয়েছে যে প্রতিষ্ঠান তা তৈরি করছে আর যে প্রতিবেশীরা তা সহ্য করছেন, তাঁদের হাতেই।

প্রকৌশলের উত্তর

লন্ডনভিত্তিক গ্রিনজেটস কাজে নেমেছিল ‘শব্দের মাত্রা ও সেই শব্দের কম্পাঙ্ক’—দুটিই সামলাতে, বলেন প্রতিষ্ঠানের ফিউচার টেকনোলজিস প্রধান ড্যারেন জেমস। সাধারণ ড্রোনে ঘুরন্ত প্রপেলার খোলা বাতাস কেটে এগোয়, তাতেই তৈরি হয় তীক্ষ্ণ ভনভন। গ্রিনজেটস ঘুরন্ত ব্লেডগুলো একটি পডের ভেতরে ঢেকে দেয়, যাতে শব্দ চাপা পড়ে আর মাটির দিক থেকে সরে যায়। সঙ্গে ব্যবহার করে ধীর রোটর-গতি আর কম্পনের শব্দ কমায় এমন উপাদান। প্রতিষ্ঠানের দাবি, ব্যবস্থাটি ড্রোনের শব্দ অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ কমায়।

পডে ঢুকিয়ে দুই-তৃতীয়াংশ শব্দ কম
গ্রিনজেটসের দাবি, ব্লেড ঢেকে দেওয়া, রোটরের গতি কমানো ও কম্পন প্রশমন মিলিয়ে ড্রোনের শব্দ অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ কমে। অ্যামাজন প্রাইম এয়ার ছড়াচ্ছে প্রায় ৫০০ শহরে। গ্রাফিক: টেক বিডি।

দ্বিতীয় পথটি ডেট্রয়েট থেকে। ২০১২ সালে গ্রেগ শ্যারো কঠিন একটি কোণ থেকে এক বেহালাবাদকের ভিডিও করতে চাইছিলেন; ড্রোনই একমাত্র উপায় ছিল, কিন্তু তাতে শব্দ হতো অনেক বেশি। ‘আমি জানতাম, ড্রোনের বেশির ভাগ শব্দ আসে প্রপেলার থেকে, মোটর থেকে নয়,’ বলেন তিনি—বিশেষ করে ব্লেডের আগা, যা বাতাস কেটে এগোয়। তাই তিনি প্রশ্ন করলেন, আগাবিহীন প্রপেলার দেখতে কেমন হবে; আর শ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিং এখন বানায় মোচড়ানো প্রপেলার, যা শব্দ কমায়।

আসলে কিনছে কে

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ডেলিভারি প্রতিষ্ঠান নয়। গ্রিনজেটসের কম-শব্দের প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে জার্মানির পুলিশ ও বন্দর নিরাপত্তা দল, আর আফ্রিকায় সংরক্ষণকর্মীদের সাহায্য করেছে ওপর থেকে অজান্তে চোরা শিকারিদের অনুসরণ করতে।

রণক্ষেত্রের ড্রোন চালকদের চুপ থাকার কারণ স্পষ্ট। ‘ড্রোনের শব্দ কমানোর কিছু চেষ্টা আছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল ফোর্সেস আগ্রহী, পরীক্ষামূলক পর্যায়ে,’ বলেন রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষণা ফেলো রবার্ট টলাস্ট।

তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অগ্রাধিকার নিয়ে তিনি স্পষ্ট—বড় ড্রোনে গোপনীয়তার চেয়ে গতিই এগিয়ে: ‘দ্রুত বানাও, কম শব্দের নয়—এটাই যেন পদ্ধতি।’ বড় মাত্রায় এই ব্যবহার নিয়ে আমরা লিখেছি, যার মধ্যে আছে এক সপ্তাহে ইয়ানডেক্সের পাঁচটি ডেটা সেন্টারের তিনটিতে ইউক্রেনের হামলা।

অর্থাৎ বাণিজ্যিক যুক্তিটি অভিযোগ থেকে যা মনে হয়, তার উল্টো। টেক্সাসের উপশহরবাসী বিরক্ত হচ্ছেন বলে যে প্রযুক্তি তৈরি হলো, তার প্রথম গুরুতর ক্রেতা হলেন সেই মানুষেরা, যাঁদের চাহিদা হলো শোনা না যাওয়া—আর অ্যামাজন, যারা বলছে তারা নিজেদের ড্রোনের শব্দ কমানোর কাজ করছে, নীরবতার দাম দিতে নজরদারি অপারেটরের চেয়ে কম চাপে আছে।

এখানে আসার আগে

বাংলাদেশে ড্রোন ডেলিভারি বড় মাত্রায় চলছে না—আর তাই এটি সেই বিরল ক্ষেত্র, যেখানে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি সমস্যা তৈরির পরে নয়, আগেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব।

মার্কিন অভিজ্ঞতার কাজের শিক্ষাটি হলো, শব্দকে পরে সামলানোর মতো খুঁটিনাটি ধরা হয়েছিল, আর এখন তা শত শত শহরে রাজনৈতিক বিষয়। আগেভাগে ঠিক করার মতো তিনটি জিনিস: শব্দের সর্বোচ্চ মাত্রা যন্ত্রের গায়ে নয়, মাটির স্তরে মাপা; প্রকাশিত উড়াল-পথের মানচিত্র, যাতে বাসিন্দারা জানেন তাঁদের ওপর দিয়ে কী উড়বে; আর অভিযোগ নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট একটি সংস্থা—কারণ এফএএর উত্তর, যে এটি অপারেটর ও স্থানীয় নেতৃত্বের মেটানোর বিষয়, শ্মিটের মতো কারও যাওয়ার জায়গা রাখে না।

সূত্র: বিবিসি

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি ঢাকাভিত্তিক একটি স্বাধীন প্রযুক্তি প্রকাশনা, প্রকাশিত হয় বাংলা ও ইংরেজিতে। লেখাগুলো আলাদা লেখকের নামে নয়, প্রকাশনার নামেই প্রকাশিত হয়; সংশোধন বা সূত্র নিয়ে প্রশ্ন পাঠানো যায় info@tech-bd.com ঠিকানায়।