বিশ্ব

মাস্ককে ‘সত্যিকারের প্রতিভা’ বললেন পুতিন, জানালেন তাঁরা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগে আছেন—রুশ ও মার্কিন স্যাটেলাইট যাতে পরস্পরের পথে না পড়ে, তা নিয়ে

স্টারলিংকের কক্ষপথে আছে প্রায় ১৩ হাজার স্যাটেলাইট। রাসভেতের কুড়ি-পঁচিশটি। পুতিন যে যোগাযোগের কথা বলছেন, তা অত্যন্ত অসম দুই পক্ষের মধ্যে।

মাস্ককে ‘সত্যিকারের প্রতিভা’ বললেন পুতিন, জানালেন তাঁরা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগে আছেন—রুশ ও মার্কিন স্যাটেলাইট যাতে পরস্পরের পথে না পড়ে, তা নিয়ে

ইলন মাস্ক একজন ‘সত্যিকারের প্রতিভা’—বুধবার এ কথা বলেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, সেই সঙ্গে জানিয়েছেন স্যাটেলাইট প্রযুক্তি নিয়ে তাঁরা দুজন ‘ঘনিষ্ঠ’ যোগাযোগে আছেন।

মস্কোয় রাশিয়া-আফ্রিকা সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন, যেখানে আলোচনা হচ্ছিল রাশিয়ার নিজস্ব স্যাটেলাইট ইন্টারনেট প্রকল্প রাসভেত নিয়ে, যা কক্ষপথ থেকে ইন্টারনেট সংযোগ দেয়।

বিবিসির অনুবাদ অনুযায়ী মাস্ক সম্পর্কে পুতিন বলেন, ‘তিনি একজন প্রতিভা, সত্যিকারের প্রতিভা। আমরা আমাদের মার্কিন অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগে আছি, যার মধ্যে মিস্টার মাস্কও আছেন।’ স্টারলিংক মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের অংশ, যারা মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

ঘোষিত কারণটি কারিগরি

পুতিন বলেছেন, রাসভেত ও স্টারলিংকের স্যাটেলাইট যাতে ‘কক্ষপথে পরস্পরের পথে বাধা না হয়’, সে জন্য মাস্কের সঙ্গে রাশিয়ার যোগাযোগ থাকা জরুরি।

‘আমরা ও আমাদের মার্কিন অংশীদার—দুই পক্ষই এটিকে মূল্য দিই, আর সব রাজনৈতিক প্রশ্ন সত্ত্বেও আমরা কঠোর পরিশ্রম করছি,’ বলেন তিনি।

কক্ষপথে সমন্বয় সত্যিকারের প্রয়োজন, কূটনৈতিক বানানো কথা নয়। নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথে স্যাটেলাইটগুলোর পথ অহরহ একে অন্যকে কাটে, আর সংঘর্ষ এড়াতে পরিচালকদের অবস্থান ও গতিপথের তথ্য ভাগ করে নিতে হয়—তাদের সরকার পরস্পরকে যা-ই ভাবুক। রাজনৈতিক সম্পর্ক ভেঙে পড়লেও যে অল্প কয়েকটি ক্ষেত্রে সহযোগিতা টিকে থাকে, এটি তার একটি; কারণ বিকল্পটি হলো এমন ধ্বংসাবশেষ, যা দুই পক্ষের জন্যই কক্ষপথ নষ্ট করে দেয়।

কিন্তু দুটি ব্যবস্থা তুলনীয় নয়

প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, স্টারলিংক উৎক্ষেপণ করেছে প্রায় ১৩ হাজার স্যাটেলাইট। অনলাইন স্যাটেলাইট ট্র্যাকারের হিসাবে রাসভেতের কক্ষপথে আছে মাত্র কুড়ি-পঁচিশটি।

১৩ হাজারের বিপরীতে কুড়ি-পঁচিশটি
স্টারলিংক উৎক্ষেপণ করেছে প্রায় ১৩ হাজার স্যাটেলাইট। অনলাইন ট্র্যাকারের হিসাবে রাশিয়ার রাসভেতের কক্ষপথে আছে কুড়ি-পঁচিশটি। গ্রাফিক: টেক বিডি।

দক্ষিণ আফ্রিকায় রুশ দূতাবাস রাসভেতকে বলেছে ‘রাশিয়ার স্টারলিংক বিকল্প’, সঙ্গে যোগ করেছে যে এটি ‘এই ক্ষেত্রে দেশটির কেবল প্রথম পদক্ষেপ’, আর ‘মহাকাশ নিয়ে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখে, ইলন মাস্কসহ’।

বর্ণনাটি মনোযোগ দিয়ে পড়ার মতো। কুড়ি-পঁচিশটি স্যাটেলাইটের একটি নক্ষত্রপুঞ্জ বিশ্বজুড়ে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেয় না—দেয় বিক্ষিপ্ত কিছু পাস। ১৩ হাজার স্যাটেলাইটের নেটওয়ার্কের বিকল্প বলা সামর্থ্যের নয়, অভিপ্রায়ের ঘোষণা; আর দূতাবাসের নিজের ‘প্রথম পদক্ষেপ’ কথাটিই তা মেনে নিচ্ছে।

উদ্ধৃতিগুলোর প্রেক্ষাপট

পুতিনের মন্তব্য এসেছে এমন সময়ে, যখন ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের প্রায় পাঁচ বছরের মাথায় যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াকে কাছাকাছি আসতে দেখা যাচ্ছে।

রুশ বাহিনীকে ঠেকাতে ইউক্রেন নির্ভর করেছে স্টারলিংকের ওপর। কিন্তু গত সপ্তাহে দেশটির সেনাবাহিনী হঠাৎ স্টারলিংকের সংযোগ-সমস্যায় পড়ে—যা স্পেসএক্স ইচ্ছাকৃতভাবে করেছে বলে মাস্ক স্বীকার করেছেন। এই নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা নিয়ে এ মাসেই আমরা লিখেছি: ইউক্রেন স্টারলিংকের বিকল্প পাবে না, ইউরোপেরও উত্তর আসতে বছর লাগবে।

এর পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ মাসের শুরুতে বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে তেলের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় তা কমাতে ডিজেল আমদানির একটি চুক্তি তিনি রাশিয়ার সঙ্গে করেছেন। এরপর কার্যকর হতে যাওয়া কিছু নিষেধাজ্ঞা তিনি রাশিয়ার ওপর থেকে তুলে নেন। অল্প পরেই রুশ হেফাজত থেকে এক মার্কিন নাগরিক মুক্তি পান, আর মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ পুতিনকে ‘মানবিক’ বলে উল্লেখ করেন।

এটি কেবল রাজনীতির নয়, প্রযুক্তিরও খবর কেন

কারণ প্রশংসা পাচ্ছেন কে, আর কিসের জন্য।

মাস্কের জন্ম দক্ষিণ আফ্রিকায়, এরপর কানাডা হয়ে থিতু হন যুক্তরাষ্ট্রে। তাঁর সব উদ্যোগ—টেসলা, স্পেসএক্স, স্টারলিংক—মার্কিন প্রতিষ্ঠান, বেশির ভাগের কার্যক্রম ক্যালিফোর্নিয়া ও টেক্সাস থেকে। ট্রাম্প ও অন্যান্য রিপাবলিকান রাজনীতিকের অন্যতম বড় রাজনৈতিক মিত্র ও অর্থদাতা তিনি।

অর্থাৎ স্টারলিংক-নির্ভর প্রতিবেশীর সঙ্গে যুদ্ধে থাকা এক রাষ্ট্রপ্রধান প্রকাশ্যে প্রশংসা করছেন সেই ব্যক্তিগত মানুষটির, যিনি ওই নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রক—আর তা ওই ব্যক্তি নেটওয়ার্কটি সীমিত করার কথা স্বীকার করার কয়েক দিন পরেই। আর যা-ই হোক, এটি দেখিয়ে দেয় যে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট এখন এমন অবকাঠামো, যা চলে কোনো চুক্তির নয়, একটি প্রতিষ্ঠানের বিবেচনায়।

বাকিদের জন্য পরিণতি এখানেই। যেসব দেশ স্যাটেলাইট সেবার চুক্তি করছে—বাংলাদেশসহ, যেখানে বাংলালিংক স্টারলিংক ডাইরেক্ট-টু-সেল চালু করছে—তারা কিনছে এমন এক নেটওয়ার্ক থেকে, যার সেবা যে নিয়ন্ত্রণ করা যায় তা দেখা গেছে, আর যার মালিক এ ধরনের আলাপ চালান।

এমন চুক্তিতে সই করা যেকোনো সরকারের জন্য ব্যবহারিক প্রশ্নটি সেবাটি কাজ করে কি না, তা নয়। প্রশ্নটি হলো—কেউ যদি ঠিক করে যে এটি বন্ধ হওয়া উচিত, তখন কী হবে চুক্তিতে তা কী লেখা আছে, আর সেই ‘কেউ’টি কে।

সূত্র: বিবিসি

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি ঢাকাভিত্তিক একটি স্বাধীন প্রযুক্তি প্রকাশনা, প্রকাশিত হয় বাংলা ও ইংরেজিতে। লেখাগুলো আলাদা লেখকের নামে নয়, প্রকাশনার নামেই প্রকাশিত হয়; সংশোধন বা সূত্র নিয়ে প্রশ্ন পাঠানো যায় info@tech-bd.com ঠিকানায়।